এক রাজ্যে একইসঙ্গে দুই মুখ্যমন্ত্রী! ভারতেই রয়েছে নজিরবিহীন উদাহরণ, কীভাবে সম্ভব?
সেবার মাত্র একদিনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন এক কংগ্রেস নেতা। জানেন এই ইতিহাস?
সালটা ১৯৯৮। ফেব্রুয়ারি মাসে দেশজুড়ে চলছে লোকসভা ভোট। উত্তরপ্রদেশেও সে মাসেই ভোট ছিল। জোরকদমে প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন রাজ্যের তৎকালীন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং। সেসময় রাজ্যজুড়ে প্রচার চালাচ্ছেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা এবং হবু প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। সেসময় কেন্দ্রের ইন্দ্রকুমার গুজরালের সরকার আন্দাজ করতে পারছিল লোকসভায় ভালো ফল হতে চলেছে বিজেপির। আর সেটার ভিত্তিভূমি হবে অবশ্যই উত্তরপ্রদেশ।
আরও পড়ুন:
তাই উত্তরপ্রদেশে রাজনৈতিকভাবে কোনও ভূমিকম্প ঘটাতে মরিয়া ছিলেন যুক্ত ফ্রন্টের ইন্দ্রকুমার গুজরালের সরকার। ভোটপ্রক্রিয়া চলাকালীনই আচমকা লখনউয়ের রাজনীতিতে উথালপাথাল পরিস্থিতির জন্ম। যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কংগ্রেস, বিজেপি, মায়াবতীর বিএসপি, নরেশ আগরওয়ালের লোকতান্ত্রিক কংগ্রেস। এবং এই নাটকে মূল চরিত্র রাজ্যপাল রমেশ ভাণ্ডারি।
১৯৯৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। একদিন বাদেই উত্তরপ্রদেশের দ্বিতীয় দফার নির্বাচন। সেসময় মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং লখনউয়ে ছিলেন না। সেসময় সরকার ছিল বিজেপি এবং বিএসপি জোটের। আচমকা সেদিন বিএসপির তৎকালীন সহ-সভাপতি তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী কল্যাণ সিং সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেন। কংগ্রেস, লোকতান্ত্রিক কংগ্রেস পার্টি এবং বিজেপির একাংশের সমর্থনে তিনি কংগ্রেস নেতা জগদম্বিকা পালকে মুখ্যমন্ত্রী করার প্রস্তাব দেন।
কল্যাণ সিংয়ের অনুপস্থিতিতে মায়াবতী-জগদম্বিকা পাল-সহ সেই বিদ্রোহী জোটের কয়েকজন নেতা লখনউয়ের রাজভবনে গিয়ে সরকার কল্যাণ সিং সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। ঠিক হয় কংগ্রেসের জগদম্বিকা পালের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের দাবি জানানো হবে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিজেপির একাংশও জগদম্বিকাকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেন।
আরও পড়ুন:
তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বুঝতে পেরে দ্রুত লখনউ ছুটে আসেন কল্যাণ সিং। এরপর শুরু রাজ্যপাল রমেশ ভাণ্ডারির খেলা। নিয়ম অনুযায়ী কোনও সরকারকে বরখাস্ত করতে হলে মুখ্যমন্ত্রীকে অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া উচিত। কল্যাণ সিংও রাজ্যপালের কাছে সেই সুযোগটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজ্যপাল সেই সুযোগ না দিয়েই কল্যাণ সিং সরকারকে বরখাস্ত করে দেন।
সেদিন রাতেই তড়িঘড়ি শপথবাক্য পাঠ করানো হয় জগদম্বিকা পালকে। বলা হয়, মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে কোনও আড়ম্বর ছাড়াই শপথ নেন জগদম্বিকা। এমনকী শপথের শেষে বিধিমতো জাতীয় সংগীতও গাওয়া হয়নি। রাজ্যপালের এই ভূমিকায় ক্ষুব্ধ কল্যাণ সিং সোজা চলে যান এলাহাবাদ হাই কোর্টে। হাই কোর্ট রাজ্যপালের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়ে কল্যাণকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। সেই সিদ্ধান্ত আবার মানতে পারেননি জগদম্বিকা। তিনি আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টে।
পরদিন সকাল ভোটগ্রহণ। সেদিনই লখনউয়ের সচিবালয়ে নাটক। একই সঙ্গে সেখানে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে হাজির কল্যাণ সিং- এবং জগদম্বিকা। দু'জনেরই দাবি, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে পাশাপাশি দুই ঘরে বসে দুই মুখ্যমন্ত্রী আমলাদের নির্দেশ দিচ্ছেন! কল্যাণের যুক্তি তাঁকে হাই কোর্ট মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার জগদম্বিকার দাবি, তাঁকে রাজ্যপাল শপথ বাক্য পাঠ করিয়েছেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি। স্পিকারের দুই পাশে দুই মুখ্যমন্ত্রী বসে। বিধায়করা ভোট দেন গোপন ব্যালটে। শেষ দেখা যায় ৪২৫ আসনের বিধানসভায় কল্যাণ সিং পান ২২৫ ভোট। এবং জগদম্বিকা পাল পান ১৯৬ ভোট। ফলে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন জগদম্বিকা। মাত্র একদিন (২১ ফেব্রুয়ারি-২২ ফেব্রুয়ারি) রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি। তার মধ্যে কয়েক ঘণ্টা আবার কল্যাণ সিংও নিজেকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দাবি করেন।