বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন শুরু, এআই স্ক্যান থেকে ‘ট্রাইওন্ডা’ বল, ফুটবলে আসছে প্রযুক্তির বিপ্লব
কেমন প্রযুক্তির ব্যবহার হতে চলেছে আসন্ন বিশ্বকাপে?
এবারের বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহারেও আসছে বড়সড় পরিবর্তন। ভিএআর সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল ও দ্রুত করতে প্রতিটি ফুটবলারের থ্রি-ডি ডিজিটাল প্রতিরূপ তৈরি করতে চলেছে বিশ্বফুটবলের নিয়ামক সংস্থা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে খেলোয়াড়দের নড়াচড়া, শরীরের অবস্থান ও বলের গতিপথ আরও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে অফসাইড, ফাউল কিংবা বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রেফারিদের কাজ অনেকটাই সহজ হবে।
আরও পড়ুন:
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেবে ৪৮টি দল। প্রতিটি দলে থাকবেন ২৬ জন করে ফুটবলার। সেই হিসাবে মোট খেলোয়াড়ের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ১,২৪৮। প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্বকাপে প্রত্যেক ফুটবলারেরই আলাদা ডিজিটাল স্ক্যান তৈরি করা হবে। এআই-ভিত্তিক এই থ্রি-ডি প্রতিরূপ ম্যাচ পরিচালনা, ভিএআর বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন টেকনিক্যাল সিদ্ধান্তকে আরও নিখুঁত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
ফুটবলারদের শরীরে নিখুঁত মাপ নিয়ে এই ডিজিটাল স্ক্যান তৈরি হবে। এতে দ্রুত নাড়াচাড়া ধরা পড়বে। সহজেই সেই ফুটবলারকে চিহ্নিত করা যাবে। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রিপ্লেকে আরও নিখুঁত করে তোলাই এর লক্ষ্য। এর ফলে অফসাইড, ফাউল বা গোলসংক্রান্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ভুলের সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কীভাবে ফুটবলারদের ছবি তোলা হবে? প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ থাকবে একটা বিশেষ চেয়ার। স্ক্যান করার সময় সেখানে বসতে হবে। মাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে স্ক্যানের কাজ শেষ করতে হবে। একবারই হবে এই স্ক্যান। জানা গিয়েছে, বিশ্বকাপের আগে ফটোশুটের সময়েই সম্পন্ন হবে এই কাজ। এই স্ক্যানের ফলে দ্রুত মুভমেন্ট তো বটেই, বাধাগ্রস্ত অবস্থাতেও নির্ভুলভাবে তাঁদের গতিবিধি ধরা পড়বে।
আরও পড়ুন:
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত মেক্সিকো সিটির পরিবেশে খেলা সহজ নয়। এত উঁচুতে খেলা বলে এখানকার হাওয়ায় গতি, স্ট্যামিনা এবং বলের মুভমেন্ট - সব কিছুর উপরই প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবেশে খেলার অভিজ্ঞতা থাকায় মেক্সিকোর ফুটবলাররা অনেকটাই মানিয়ে নিতে পারবেন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলারদের জন্য শুরু থেকেই মানিয়ে নেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
কানাডা নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ অভিষেক ঘটাচ্ছে। মেক্সিকো এবং আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। গ্রুপ বি-তে তাদের সঙ্গে রয়েছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কাতার, সুইজারল্যান্ড। ১২ জুন টরন্টোতে কানাডা তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে। মোট ১৩টি ম্যাচ হবে কানাডায়। টরন্টো স্টেডিয়াম (বিএমও ফিল্ড) এবং ভ্যাঙ্কুভারের বচ প্লেসে খেলাগুলো হবে। এর আগে দেশটি ১৯৮৬ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল।
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ট্রাইওন্ডা’ তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। তিন আয়োজক দেশকে সম্মান জানিয়ে তৈরি এই ৪-প্যানেলের বলে রয়েছে ডিপ-সিম প্রযুক্তি ও ৫০০ হার্ৎজ মোশন সেন্সর। ভিএআর সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল করতে এই বলেরও ভূমিকা থাকবে। দ্রুত সিদ্ধান্তে সহায়তার পাশাপাশি বাতাসে বলের স্থিতিশীলতাও বাড়াবে ‘ট্রাইওন্ডা’। ফিফা ও অ্যাডিডাসের দাবি, দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার পরই এই প্রযুক্তি আনা হয়েছে।
আমেরিকার বিশ্বকাপে দর্শক উপস্থিতির নতুন রেকর্ড তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। যে স্টেডিয়ামগুলোয় ম্যাচ আয়োজিত হবে, সেখানকার গড় দর্শক ধারণক্ষমতা ৭০ হাজারের বেশি। ফলে গ্রুপ পর্বের অনেক ম্যাচেই ৮০ হাজারের বেশি দর্শক উপস্থিত থাকতে পারেন। এমন পরিবেশ সাধারণত বিশ্বকাপ ফাইনালেই দেখা যায়! যা এবার প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই মিলতে পারে।
আসন্ন বিশ্বকাপে দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘ ভ্রমণ। ভ্যাঙ্কুভার থেকে মেক্সিকো সিটি পর্যন্ত ১৬টি আয়োজক শহরে হবে ম্যাচগুলো। তাই গ্রুপ পর্বে প্রতি ৩-৪ দিন অন্তর দলগুলোকে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই দূরত্ব ৮ হাজার কিলোমিটারও ছাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্রমণজনিত ক্লান্তি খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও মাঠের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রবল গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বিশ্বকাপের ম্যাচ হবে। বিশেষ করে হার্ড রক স্টেডিয়ামে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত আর্দ্রতা খেলোয়াড়দের শারীরিক চাপ আরও বাড়াবে। ফলে দলগুলোকে ম্যাচের কৌশল নতুনভাবে সাজাতে হবে। ফুটবলারদের ক্লান্তি সামলাতে রোটেশন পদ্ধতির পথে হাঁটতে হতে পারেন কোচেরা।
রেফারিংয়ে বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। গোললাইন প্রযুক্তি, অফসাইড ট্র্যাকিংয়ে এআই-নির্ভর টেকনোলজি ‘ভিএআর’-এর সহায়ক হিসাবে কাজ করবে, যাতে রেফারিরা আরও দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নেবেন মাঠের রেফারিরাই। তবে পেনাল্টি এলাকায় জটিল পরিস্থিতিতে এআই পথ বাতলে দিতে পারে। সম্প্রচারের সময় এআই-সমৃদ্ধ বিশেষ ভিজ্যুয়াল ব্যবহৃত হতে পারে, যা দর্শকদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সহজে বুঝতে সাহায্য করবে।
জনসংখ্যার বিচারে এবারের বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট কুরাসাও। প্রায় ১ লক্ষ ৫৬ হাজার জনসংখ্যার এই ক্যারিবীয় দেশ প্রথমবারের মতো পুরুষদের ফিফা বিশ্বকাপে জায়গা করে ইতিহাস গড়েছে। অন্যদিকে, ৩৩ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে আমেরিকা টুর্নামেন্টের অন্যতম বৃহত্তম দেশ। দুই দেশের জনসংখ্যার এই বিশাল পার্থক্য বিশ্বকাপের বৈচিত্র্যকেই বাড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা কুরাসাওয়ের তুলনায় প্রায় ২,১১৫ গুণ বেশি।