৩ আষাঢ়  ১৪২৬  মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০১৯ 

Menu Logo বিলেতে বিশ্বযুদ্ধ মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

অভিরূপ দাস: আশ্বিনের শুরু মানেই আকাশে বাতাসে পুজো পুজো গন্ধ। বারবারই মনে হয় এই তো মা আসছেন। আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। ষষ্ঠীর সকালে বোধন দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের পর্ব, বিসর্জন পর্যন্ত চলে সেই নিয়ম ও আচারবিচার৷ বাঙালির কাছে যিনি ‘মা দুর্গা’ নামে পূজিত হন, সারা ভারতে নানা নামে তাঁর আরাধনা চলে। কোথাও তিনি ‘কন্যাকুমারী’ নামে পূজিত হন তো কোথাও ‘অম্বিকা’, কোথাও ‘জয়দুর্গা’ তো কোথাও ‘হিঙ্গলাজ’। তবে, সকলের আরাধ্য ‘মহামায়া’ সম্পর্কে এমনও কিছু তথ্য রয়েছে যা অনেকেই অজানা৷ তাঁরই খোঁজ রইল এই প্রতিবেদনে৷

কে দেবী দুর্গা?

মার্কণ্ডেয় পুরাণ মতে, মহিষাসুর নামক অসুর স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়িত করে স্বর্গ অধিকার করলে দেবতারা ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা এর প্রতিকারের জন্য মহাদেব ও অন্য দেবতাদের নিয়ে বিষ্ণুর কাছে উপস্থিত হন। মহিষাসুর পুরুষের অবধ্য ছিলেন বলে বিষ্ণু দেবতাদের পরামর্শ দেন যে, ‘প্রত্যেক দেবতা নিজ নিজ তেজ ত্যাগ করে একটি নারীমূর্তি সৃষ্টি করবেন। এরপর সমবেত দেবতারা তেজ ত্যাগ করতে আরম্ভ করেন। একাধিক দেবতার তেজ থেকেই তৈরি হল দশভুজা দুর্গা। কোন দেবতার তেজ থেকে এই নারী মূর্তির শরীরের বিভিন্ন অংশ তৈরি হল তা দেখে নেওয়া যাক এবার। মহাদেবের তেজে মুখ, যমের তেজে চুল, বিষ্ণুর তেজে বাহু, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে কটিদেশ, বরুণের তেজে জঙ্ঘা ও উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল, সূর্যের তেজে পায়ের আঙুল, বসুগণের তেজে হাতের আঙুল, কুবেরের তেজে নাসিকা, প্রজাপতির তেজে দাঁত, অগ্নির তেজে ত্রিনয়ন, সন্ধ্যার তেজে ভ্রু, বায়ুর তেজে কান এবং অন্যান্য দেবতার তেজে শিবারূপী দুর্গার সৃষ্টি হল।

দেবী দুর্গার বাহন কী কী?

সিংহ৷ এই প্রশ্নের উত্তরে সকলেরই জানা। কিন্তু তা মোটেও নয়। দুর্গাপুজো সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ জ্ঞান থাকলেই জানা যায় ফি বছর দেবী স্বর্গ থেকে মর্তে আসেন কিছু নির্দিষ্ট বাহনে। দেবী দুর্গার এই বাহনগুলি তৎকালীন সময়োপযোগী। কথিত আছে রাজা রামচন্দ্র রাবণকে বধ করার জন্য যাত্রা শুরুর আগে আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার অকাল বোধন করেছিলেন। তবে থেকেই এই সময় প্রতিবছর দুর্গাপুজো করা হয়। যেহেতু দেবী তাঁর সন্তান সন্ততি নিয়ে স্বর্গ থেকে মর্তে আসবেন তাই বাহন তো প্রয়োজন। রাজা রামচন্দ্র যেহেতু এই পুজো শুরু করেন তাই সেই সময়কার কথা যদি আমরা চিন্তা করে থাকি তখন যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে রেলগাড়ি বা জাহাজ বা উড়োজাহাজ তো আর ছিল না, ছিল নৌকো, ঘোড়া, হাতি এবং পালকি। দেবী দুর্গাও এর মধ্যে থেকে একটি মাধ্যমে করেই প্রতি বছর মর্তে আসেন।

[দুর্গাপুজোয় কেন লাগে পতিতালয়ের মাটি?]

চালচিত্র কী ও কেন?

চালচিত্র হল সাবেকি দুর্গা প্রতিমার উপরিভাগে অঙ্কিত দেবদেবীর কাহিনিমূলক পটচিত্র, যা প্রধানত অর্ধগোলাকৃতি হয়। চালচিত্রে পঞ্চানন শিব, মহিষাসুর বধ, নন্দীভৃঙ্গী, শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ প্রভৃতি কাহিনি চিত্রের মাধ্যমে বর্ণিত থাকে। এই চিত্রকলার একটি নিজস্ব রূপরেখা ও শৈলীগত দৃঢ় বুনিয়াদ রয়েছে। চালচিত্র শব্দের ‘‘চাল’’ শব্দের অর্থ আচ্ছাদন। প্রতিমার চালির উপরে আঁকা হয় বলে এর নাম চালচিত্র। চালচিত্রের মূল বিষয়বস্তু হল শিবদুর্গা, কৈলাস, শিব অনুচর নন্দীভৃঙ্গী, মহিষাসুর বধ, দশাবতার ইত্যাদি। চালচিত্র তৈরির কিছু নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। প্রতিমার চালির উপরিভাগে অর্ধগোলাকৃতি বাঁশের খাঁচা করে তার উপর কাদালেপা এক প্রস্থ মোটা কাপড় টানটান করে লাগিয়ে কাপড়ের বাড়তি অংশ বাঁশের খাঁচার পিছন দিকে মুড়ে দেওয়া হয়। কাদালেপা কাপড়টি শুকিয়ে গেলে তার উপর খড়ি গোলার কয়েকটি আস্তরণ দেওয়া হয়। এর উপর পরিকল্পিত কাহিনিমূলক চিত্র আঁকা হয়।

দুর্গার লালচে বরণ কেন?

রুপোর গয়না, দামি জুয়েলারির নেকলেশ, সোনার শাড়ি মা দুর্গাকে সাজাতে আজকাল পুজো উদ্যোক্তারা নানারকম কারুকাজ করছেন। তা তো আসলে থিম আর মণ্ডপ সাজানোর জন্য। পুরাণ মতে মা দুর্গার পরনের শাড়ি লালচে অগ্নি বর্ণের। রাগ, শক্তি আর জয়ের প্রতীক এই শাড়ি। সমাজের সমস্ত পাপ খণ্ডন করে শুভ শক্তির জয়জয়কার ঘোষণা করে শাড়ির এই রং।।

কেন দেবী’র দশটা হাত?

কোনও মহিলা যখন একসঙ্গে হাজারও কাজ সামলান তাঁর সঙ্গে আমরা দুর্গার তুলনা টেনেই বলি ‘দশভুজা।’ কোনও দেবতারই যে দুর্গার মতো অত হাত নেই। স্রেফ অতগুলো হাতে অস্ত্র ধরার জন্য নয়, দুর্গার দশ হাত দশ দিক রক্ষা করারও প্রতীক। দশ দিক হল পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঈশান, বায়ু, অগ্নি, নৈর্ঋত, ঊর্ধ্ব এবং অধঃ। এই দশ প্রহরণ নিয়েই তিনি প্রতি আক্রমণ করেছেন মহিষাসুরকে। অনেকে বলেন মানবজাতির সকল অশুভ বিনাশ করার জন্যই তিনি দশপ্রহরণ ধারিণী।

[জানেন, কীভাবে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয় মহিষাসুরমর্দিনীর?]

কোন বাহনের কী মানে?

দেবী দুর্গার আগমন ও কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বাহন তিথি, নক্ষত্র এর বিচারে নির্দিষ্ট হয়। পুরাণ ও শাস্ত্র অনুযায়ী সোমবার ও রবিবার দেবীর আগমন বা প্রত্যাগমনের বাহন হিসেবে ব্যবহৃত হয় হাতি। শনি ও মঙ্গলে ব্যবহৃত হয় ঘোড়া। বুধে যান হিসেবে ব্যবহৃত হয় নৌকা এবং বৃহস্পতি এবং শুক্রে ব্যবহৃত হয় পালকি বা দোলা। এই প্রত্যেকটি বাহনের সাথে জড়িয়ে আছে কিছু শুভ ও অশুভ সংকেত। যেমন হস্তীতে গমন এবং আগমন দুটি ক্ষেত্রেই অত্যন্ত শুভ। এর দ্বারা বোঝা যায় যে আমাদের ধরা সুজলা সুফলা হয়ে উঠবে। নৌকো করে আগমনের দ্বারা বোঝানো হয় যে দেবী প্রচুর আশীর্বাদ, ধান, ধন সম্পত্তি নিয়ে মর্তে আসবেন । কিন্তু নৌকা করে ফেরত যাওয়া বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতিকে নির্দেশিত করে। ঘোড়ায় আগমন ও ফিরে যাওয়া দুটিই অত্যন্ত অশুভ। এতে মড়ক, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে। পালকি বাহনটিও ভূমিকম্প, মহামারী ইত্যাদি ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত বহন করে।

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং