ওঁরা কেউ সুশীল। কেউ সাগর। কেউ শোভা। কেউ জেকব।
ওঁদের কারও পদবি রোখা। কারও তেসরা। কারও রোজারিও। কারও বা ডি’ক্রুজ।
আরও পড়ুন:
ওঁরা বাংলা বলেন পরিষ্কার। ঝরঝরে। বাংলা উচ্চারণের ক্ষেত্রে বন্দ্যোপাধ্যায়-মুখোপাধ্যায়-মিত্র-বসুদের সঙ্গে ওঁদের আলাদা করা যায় না মোটে। এত সাবলীল। এত জড়হীন। কিন্তু তার পরেও বাংলা ওঁদের মাতৃভাষা নয়। মায়ের ভাষা ওঁদের পর্তুগিজ। প্রাণের ভাষা। রক্তের ভাষা।
মহিষাদলের যে গ্রামে থাকেন ওঁরা, সেখানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো এক আরাধ্য দেবতার নাম! গ্রামের পাড়ায়-পাড়ায়, মোড়ে-মোড়ে যাঁর ছবি থাকে। লোকে যে যাঁর মতো গড় করে যায় আসা-যাওয়ার পথে। বিদ্যুতের টাওয়ারে বিশাল পর্তুগাল পতাকা ওড়ে! সিআর সেভেনের ছবিওয়ালা টি শার্ট পরে ঘোরে গ্রামের কঁচি-কাঁচারা। রাত জেগে খেলা দেখে পর্তুগালের। গোল করলে বাজি পোড়ায়, আবির খেলে! উঁহু, লিওনেল মেসি নামক আর এক ফুটবল-কুলদেবতার স্থান যে তল্লাটে নেই!

মিরপুরের নাম আছে একখানা গালভরা। পর্তুগিজ গ্রাম। কিন্তু বিশ্বকাপে পর্তুগাল বনাম স্পেন রাউন্ড অফ সিক্সটটিনের ম্যাচ দেখার পূর্বে সেখানে উপস্থিত হয়ে মনে হল, অনায়াসে গ্রামের নাম বদলে ফেলা যায়। পর্তুগিজ গ্রাম– এ নামটার আরও সহজ সরলীকরণ সম্ভব।
রোনাল্ডো-গ্রাম!
আর সে সরলীকরণ করব না কেন? পর্তুগাল-স্পেনের পূর্বলগ্নে গিয়ে পাওয়া গেল শোভা তেসরাকে। শুনলাম, পর্তুগিজ বংশোদ্ভূতদের মধ্যে বেশিরভাগই তেসরা পদবি ব্যবহার করেন। আবার ‘রোথা’, ‘পেরেরা’ কিংবা ‘লোবো’– এ ধরনের পদবিও রয়েছে। পেশায় শিক্ষিকা শোভা বলছিলেন, ‘‘পর্তুগালের খেলা থাকলে আমরা গোটা গ্রাম রাত জাগি। গোল হলে বাজি ফাটানো চলে। আবির খেলা হয়। জানি, আমরা কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষরা তো পর্তুগালের লোকই ছিলেন। তাই রক্তের টান একটা রয়েছে।’’
জানি এত পর্যন্ত পড়লে মনে হতে পারে, অলীক কল্পকাহিনি এ বুঝি, নির্ভেজাল গাঁজাখুরি নিশ্চয়! বাংলার বুকে পর্তুগিজদের আস্তানা নতুন কাহিনি নয়। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির ফরাসডাঙার কাহিনি এ বাংলায় শোনেনি, এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু তাই বলে পর্তুগিজভাষী তিনশো পরিবার নিয়ে একখানা আস্ত গ্রাম? অলিতে-গলিতে বিরাজমান সিআর সেভেন? ট্রফিতে পর্তুগাল অধিনায়কের ছবি বসিয়ে ফুটবল-পায়ে ছেলেপুলের নেমে পড়া? নির্দ্বিধায় বল পেটানো? স্রেফ বিশ্বকাপে রোনাল্ডোর জয়রথের ‘সারথি’ হতে?

অবশ্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দেশের সঙ্গে মহিষাদলের মিরপুর গ্রামের যোগসূত্র অনেক পুরাতন, টানের শিকড় আরও গভীরে। তা বুঝতে হলে, মিরপুরের ইতিহাস জানতে হবে। যা তিনশো বছরের পুরনো। শোনা যায়, বর্গীদের হাত থেকে মহিষাদল রাজপরিবারকে রক্ষা করতে গোয়া থেকে জনা বারো পর্তুগিজ গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে এসেছিলেন রানি জানকী। এবং সেই অসমসাহসী পর্তুগিজ রক্ষীদের অসীম যুদ্ধ-শৈলীর কারণে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পেয়েছিল মহিষাদল। যার পুরস্কারও সেই পর্তুগিজরা পান হাতেনাতে। স্বয়ং মহারানি রূপায়ণ নদীর মিলনস্থলের নিকবর্তী গেঁয়োখালির মিরপুরে তাঁদের একটা গোটা গ্রাম দিয়ে দেন! বিনামূল্যে! যার পর থেকে মিরপুর পর্তুগিজদের গ্রাম। এবং বিশ্বকাপের সময় পুরোদস্তুর রোনাল্ডো-গ্রাম।
আমেরিকা বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত দারুণ কিছু খেলেনি পর্তুগাল। একমাত্র উজবেকিস্তান ম্যাচ বাদ দিলে। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে রাউন্ড অফ থার্টি টু’র ম্যাচেও রক্তচাপ বাড়িয়ে ম্যাচ জিতেছেন রোনাল্ডোরা। কিন্তু মিরপুর তাতে বিন্দুমাত্র আমল দিলে তো? সাগর-সুনীলদের দৃঢ় বিশ্বাস, এবার পর্তুগালই চ্যাম্পিয়ন হবে। হবেই। সোমবারও সে আকাঙ্ক্ষার আর এক ধাপ অতিক্রমের আশা নিয়ে রাতে রোনাল্ডোর খেলা দেখতে বসবেন যাঁরা। একসঙ্গে। স্বপ্নের আতসবাজি সঙ্গে করে।

জানা নেই, পর্তুগাল শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ী হবে কি না? জানা নেই, বাংলার এই পর্তুগিজ গ্রামের কথা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো জানতে পারবেন কি না? জানলে ভালো। না জানলেও ক্ষতি নেই। তাঁর অর্বুদ উপাসকের তালিকায় না হয় বাংলার মিরপুর গ্রামের তিনশো পরিবার জুড়ে থাকবে। জুড়ে থাকবে সবার অলক্ষ্যে। চিরতরে। পর্তুগালের খেলা থাকলে, রোনাল্ডোর খেলা পড়লে, অর্বুদ কণ্ঠের সঙ্গে না হয় যুক্ত হয়ে যাবে আরও তিনশো পরিবারের স্বর। সমস্বরে যা সৃষ্টি করবে গায়ে কাঁটা দেওয়া ফুটবল-গির্জার সে অমোঘ ‘গং’।
সিইইইউউউ!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
লাল কার্ড তুলে নাও, ফিফাকে ফোন করে চাপ ট্রাম্পের! শাস্তি পুরোপুরি প্রত্যাহার মার্কিন তারকার
-
‘তোমার সবকিছুর প্রথম সাক্ষী’, দেব-শুভশ্রীর ‘আদুরে আলাপে’ জমজমাট ‘দাদাগিরি’
-
স্কুলের জমি হাতিয়ে টেনিস সেন্টার! দুনীর্তি তদন্তে সামনে দেবরাজের আরও কীর্তি
-
শ্যামাপ্রসাদের আত্মত্যাগ স্মরণ মোদি-শুভেন্দুর, ইকো পার্কে দিলীপ, মুরলীধর সেন লেনে শ্রদ্ধা শমীকের
-
বিক্ষোভকারীদের উপর ফের গুলিবৃষ্টি, পাক সেনার বর্বরতায় লাশ গুনছে অধিকৃত কাশ্মীর
