বাইরে প্রহরায় কেন্দ্রীয় বাহিনী। ভিতরে তল্লাশি চালাচ্ছেন সিবিআই আধিকারিকরা। আচমকা একছুটে বাড়ির ছাদে চলে গেলেন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। নিজের সর্বক্ষণের ব্যবহার করা মোবাইল দু’টি নিমেষে ফেলে দিলেন পুকুরে! পিছনে পিছনে ছুটে এলেও ওই মোবাইলগুলি ‘বাঁচাতে’ পারেননি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা। অগত্যা পাম্প চালিয়ে, কাদা-জল ঘেঁটে দু’টি মোবাইল উদ্ধার করে সিবিআই। সে দৃশ্যপট টেলিভিশন সেটে দেখেছিল গোটা বাংলা। যে ভদ্রলোক ওই মোবাইল দু’টি ছুড়ে ফেলেছিলেন, তিনি জীবনকৃষ্ণ সাহা। আজকের প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় চরিত্র। মুর্শিদাবাদ জেলার বড়ঞা বিধানসভার নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় চরিত্র এখনও তিনিই।

আরও পড়ুন:
নবাবের জেলার নবাবি অনেক আগেই ফুরিয়েছে। এই মুহূর্তে রাজ্য তথা দেশের পিছিয়ে পড়া জেলাগুলির মধ্যে অন্যতম মুর্শিদাবাদ (Murshidabad)। সেই মুর্শিদাবাদেরও পিছিয়ে পড়া বিধানসভাগুলির মধ্যে অন্যতম বড়ঞা। পুরো কেন্দ্রটাই গ্রামীণ। কোনও পুরসভা নেই। এখানকার বাসিন্দাদের মূল পেশা কৃষি। কেউ কেউ ছুটকো-ছাটকা ব্যবসা, ছোটখাট চাকরি করেন। ছোট ছোট মাটির একতলা, দোতলা বাড়িতে বেশিরভাগ বাসিন্দার বাস। এই বসতবাড়িগুলি এমনিতে বেশ দৃষ্টিনন্দন। এমনিতে রাজ্য রাজনীতির মানচিত্রে কোনও কালেই বড়ঞার বিশেষ গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু ২০২৩ সালের পর জীবনকৃষ্ণর দৌলতে আচমকা যেন ঐশ্বর্যপ্রাপ্তি হয়েছে এই বিধানসভা কেন্দ্রের। ছাব্বিশের ভোটে (West Bengal Assembly Election 2026) তাই হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে বড়ঞা।
এমনিতে রাজ্য রাজনীতির মানচিত্রে কোনও কালেই বড়ঞার বিশেষ গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু ২০২৩ সালের পর জীবনকৃষ্ণর দৌলতে আচমকা যেন ঐশ্বর্যপ্রাপ্তি হয়েছে এই বিধানসভা কেন্দ্রের। ছাব্বিশের ভোটে তাই হটস্পট হয়ে দাঁড়িয়েছে বড়ঞা।
একটা সময় এই বড়ঞা ছিল বাম শরিক আরএসপির শক্ত ঘাঁটি। ক্রমে অধীর চৌধুরীর হাত ধরে কংগ্রেসের প্রভাব বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন আরএসপি এবং কংগ্রেসের মধ্যেই হাতবদল হয়েছে কেন্দ্রের। সেই সব অঙ্ক বদলে যায় একুশে। ভোটের মেরুকরণের অস্ত্রে ভর করে একুশে প্রথমবার জোড়াফুল ফোটে মুর্শিদাবাদের ওই কেন্দ্রে। ২৭৪৯ ভোটে জিতে বিধায়ক হন পেশায় শিক্ষক জীবনকৃষ্ণ সাহা। দ্বিতীয় হন বিজেপির অমিয় কুমার সাহা। প্রথম দু’বছর সব ঠিকঠাক ছিল। সবকিছুই এক ঝঞ্ঝায় বদলে গেল তেইশে। রাজ্যজুড়ে যে বিরাট নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, জীবনকৃষ্ণর দৌলতে সেটারই এপিসেন্টার হয়ে ওঠে বড়ঞা। ফলে যে বিজেপির মুর্শিদাবাদ জেলাতেই কোনওকালে কোনও প্রভাব ছিল না, সেই বিজেপিই ২৪-এর লোকসভায় হাজার পাঁচেক ভোটে লিড পায়।
বড়ঞা কেন্দ্রের মোট ভোটার ২ লক্ষ ১৭ হাজার ৫০০। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ হিন্দু। ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু। তফসিলি জাতির ভোটের পরিমাণ প্রায় ২০ শতাংশ। তবে এই কেন্দ্রটি তফসিলিদের জন্যই সংরক্ষিত। সাংগঠনিক দিক থেকে তৃণমূল এই কেন্দ্রে এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। মোট ১৩টি পঞ্চায়েতের ১১টিই তৃণমূলের দখলে। দু’টি বিজেপির হাতে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে পঞ্চায়েত সমিতির দখল রয়েছে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ অংশ, কংগ্রেস এবং সিপিএম জোটের। আসলে সংগঠনে যে আগের মতো বাঁধুনি দলে নেই সেটা মানছেন স্থানীয় নেতারা।
মোট ১৩টি পঞ্চায়েতের ১১টিই তৃণমূলের দখলে। দুটি বিজেপির হাতে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে পঞ্চায়েত সমিতির দখল রয়েছে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ অংশ, কংগ্রেস এবং সিপিএম জোটের।

দুর্নীতিতে অভিযুক্ত জীবনকৃষ্ণকে প্রত্যাশিতভাবেই এবার টিকিট দেয়নি তৃণমূল। ওই কেন্দ্রে শাসকদল এবার প্রার্থী করেছে কংগ্রেসের টিকিটে দু’বার বিধায়ক হওয়া প্রতিমা রজককে। এলাকায় সৎ, ‘কাছের মানুষ’ হিসাবে পরিচিত প্রতিমাদেবীর নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো আছে। ২০১১ থেকে ২০২১- টানা ১০ বছর বিধায়ক ছিলেন। ফলে এলাকা চেনেন হাতের তালুর মতো। মানুষের সঙ্গে পরিচিতি আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রাজ্যের অন্য প্রান্তে তৃণমূলের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে যে অসন্তোষের ছবি ধরা পড়েছে, সেটা বড়ঞায় চোখে পড়েনি। শাসকদলের মোটামুটি সবস্তরের নেতাই প্রতিমার পাশে। অন্যদিকে বিজেপি প্রার্থী করেছে সুখেন কুমার বাগদিকে। দীর্ঘদিনের গেরুয়া রাজনীতি করা লোক সুখেন ২০১১ সালেও বিজেপির টিকিটে লড়েন। সেবার মোটে সাড়ে ছয় শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এবারও তাঁর প্রার্থীপদ যে দলের সব স্তরের মানুষ চোখ বুজে মেনে নিয়েছেন, তেমনটা নয়। তাঁর প্রার্থীপদ নিয়ে এলাকায় বিক্ষোভও হয়েছে। মজার কথা হল একটা সময় এই কেন্দ্রে ‘রাজত্ব’ করা কংগ্রেস এবং আরএসপির প্রার্থীরা তুলনায় অপরিচিত। আরএসপির কোদাল বেলচা প্রতীকে লড়ছেন আনন্দ দাস। কংগ্রেস প্রার্থী সুজিত দাস।

মুর্শিদাবাদের অন্যান্য প্রান্তের মতো SIR-এর বিরাট প্রভাব এই কেন্দ্রে পড়েনি। সব মিলিয়ে নাম বাদ পড়েছে হাজার পাঁচেক। তবে বড়ঞার মতো লো মার্জিন আসনে ৫ হাজার সংখ্যাটা বড় কম নয়। শেষে ওই পাঁচ হাজার বাদ পড়া নাম ফ্যাক্টর হয়ে যেতেই পারে। এই কেন্দ্রের স্থানীয় সমস্যার মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাট, স্থানীয় স্তরে ‘দুর্নীতি’। ময়ূরাক্ষী নদীতে বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য এই এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাছাড়া যেভাবে টিভিতে জীবনকৃষ্ণের ‘দুর্নীতির প্রমাণ’ দেখা গিয়েছে, সেটা স্থানীয় ভোটারদের প্রভাবিত করবে। যদিও শাসকদলের দাবি, বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্যের ওই অভিযোগ নিতান্তই মিথ। তেমন কিছু এলাকায় হয় না। তাছাড়া জীবনকৃষ্ণকে টিকিট দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁর দুর্নীতিও ফ্যাক্টর নয়।
এই কেন্দ্রের স্থানীয় সমস্যার মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাট, স্থানীয় স্তরে ‘দুর্নীতি’। ময়ূরাক্ষী নদীতে বালি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য এই এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাছাড়া যেভাবে টিভিতে জীবনকৃষ্ণের ‘দুর্নীতির প্রমাণ’ দেখা গিয়েছে, সেটা স্থানীয় ভোটারদের প্রভাবিত করবে।

২০১৯ সালের সিএএ বিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক হিংসার জেরে মুর্শিদাবাদ জেলার যে যে প্রান্তে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বীজ রোপিত হয়েছিল সেগুলির মধ্যে বড়ঞা অন্যতম। সেই বীজ এখন ডালপালা মেলেছে। তাছাড়া বড়ঞার জনবিন্যাস বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য উর্বর ভূমি। একদিকে ৪০ শতাংশ মুসলিম, অন্যদিকে ৬০ শতাংশ হিন্দু। সেই হিন্দুদের মধ্যে আবার বড় অংশ তফসিলি। যাঁদের সমর্থন ইদানিং পেয়ে আসছে গেরুয়া শিবির। এবারও ভোটে মেরুকরণের চেষ্টাই মূল হাতিয়ার বিজেপির। উলটোদিকে তৃণমূল আত্মবিশ্বাসী। স্বচ্ছ্ব ভাবমূর্তির প্রার্থী, এলাকার সংগঠন, সংখ্যালঘুদের সমর্থন এবং অবশ্যই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) উন্নয়ন এবার তাঁদের ‘জীবন সংশয়’ কাটিয়ে দেবে। এখানেই ফ্যাক্টর হতে পারে কংগ্রেস এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। এই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক দলগুলি যদি সংখ্যালঘু ভোটে (West Bengal Assembly Election 2026) ভাগ বসায়, তাহলে বড়ঞায় পদ্মফোটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
আঞ্চলিক মিষ্টির জিআই ট্যাগ নিয়ে তৎপর বঙ্গ বিজেপি! ‘মিষ্টি হাব’ তৈরিরও পরিকল্পনা শমীকদের
-
এবার সপ্তাহে ৬ দিনই শান্তিনিকেতনে ‘হেরিটেজ ওয়াক’, দ্রুত টিকিট মিলবে অনলাইনেও
-
লরি চাপা পড়ে মাইকেল ক্লার্কের গাড়ি! আইপিএল শেষে বিমানবন্দর যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা
-
নিজের নিরাপত্তা দিতে চেয়েছিলেন মমতা! এবার এনআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার ‘মাছ চোর’ শওকত
-
সমাজকে আদর্শের আয়না দেখায় ‘গোর্কির মা’, কেমন হল? পড়ুন রিভিউ
নিবেদিত


