Advertisement
Advertisement
WB Assembly Election 2026

‘সেফ’ সিট নয়, মালতিপুরের ‘মৌসম’ বদলে কংগ্রেসের বাধা হতে পারে বামেরা! কী বলছে ভোটঅঙ্ক?

সব কিছুকে ছাপিয়ে মালদহের ভোটে এবার মূল ইস্যু এসআইআর। স্রেফ মালতিপুরেই বাদ পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার ভোটারের নাম। স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্ষোভে ফুঁসছে। বিজেপির বিরুদ্ধে সেই ক্ষোভ কার ভোটব্যাঙ্কে পড়বে, তাতেই ঠিক হবে মালতিপুরের ভাগ্য।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১৯:৪৯

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০২৬, ১৯:৪৯

options
link
‘সেফ’ সিট নয়, মালতিপুরের ‘মৌসম’ বদলে কংগ্রেসের বাধা হতে পারে বামেরা! কী বলছে ভোটঅঙ্ক? zoom
হটস্পট মালতিপুর।

২০ বছর আগে এই এপ্রিলেই প্রয়াত হন মালদহের রূপকার এবিএ গণিখান চৌধুরী। এই দু’দশকে ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে বহু হিসাব ওলটপালট হয়েছে। বঙ্গ রাজনীতি পরিবর্তন দেখেছে, দিল্লির মসনদে নরেন্দ্র মোদির অভিষেক দেখেছে, মালদহের মাটি জোড়াফুলের দাপট দেখেছে, পদ্ম ও জোড়াফুলের দ্বিমুখী রাজনীতিতে কংগ্রেসের শূন্য হয়ে যাওয়া দেখেছে, জেলা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কোতোয়ালি ভবনের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া দেখেছে। কিন্তু এতকিছুর পরও যেটা বদলায়নি, সেটা হল গণিখানের প্রতি মালদহবাসীর শ্রদ্ধা। মালদহ, ইংলিশবাজারের মতো শহুরে এলাকা হোক কিংবা সুজাপুর, মানিকচকের প্রত্যন্ত গ্রাম, আজও গণিখান চৌধুরী নমস্য, আজও গণিখান চৌধুরী শ্রদ্ধেয়। এখনও গণিখানের নামে বহু মানুষ ইভিএমের বোতাম টেপেন। গণিখানের প্রতি সেই আবেগকে পাথেয় করেই ছাব্বিশের ভোট ময়দানে অবতীর্ণ হচ্ছেন তাঁর ভাগ্নি মৌসম বেনজির নূর। এবার তিনি মালতিপুর থেকে লড়বেন কংগ্রেসের টিকিটে।

এমনিতে এই সময় মালদাবাসীর মধ্যে ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ইতিমধ্যেই কিছু কিছু আমের আঁটি শক্ত হওয়া শুরু হয়েছে। এই সময় বাগানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। আমচাষীরা কালবৈশাখী নিয়ে চিন্তায়। হনুমান, পাখি এমনকী মানুষের নজর থেকে আম রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। অবশ্য মালতিপুর এসব থেকে খানিকটা দূরে। মালদহের অন্য প্রান্তের মতো আম চাষের রমরমা নেই মালতিপুরে। এই বিধানসভা কেন্দ্রটি পুরোপুরি কৃষিনির্ভর হলেও সেটা ধান-গম-পাটে সীমাবদ্ধ। পুরোপুরি গ্রামীণ এই বিধানসভায় অর্থনীতির ভিত-ভবিষ্যৎ সবই ওই কৃষি। কল-কারখানা নেই, কাজের অভাব, বা কাজ থাকলেও পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম। ফলে নগদের আশায় বহু মানুষ পাড়ি দেয় ভিনরাজ্যে।

Advertisement

এই বিধানসভা কেন্দ্রটি পুরোপুরি কৃষিনির্ভর। তবে সেটা প্রথাগত ধান-গম-পাটে সীমাবদ্ধ। পুরোপুরি গ্রামীণ এই বিধানসভায় অর্থনীতির ভিত্তি-ভবিষ্যৎ সবই ওই কৃষি। কল-কারখানা নেই, কাজের অভাব, বা কাজ থাকলেও পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম। ফলে বহু মানুষ চলে যান ভিনরাজ্যে রোজগারের আশায়।

মালতিপুর বিধানসভায় ৭২ শতাংশ ভোটার সংখ্যালঘু। তফসিলি জাতি-উপজাতির ভোটার ১০ শতাংশ। সংখ্যালঘু ভোটারের এই আধিক্য মালতিপুরের লড়াই থেকে কার্যত ছিটকে দিয়েছে বিজেপিকে। মূল লড়াইটা তৃণমূল, কংগ্রেস এবং বামেদের মধ্যে। মালতিপুর কেন্দ্রটি তৈরি হয় ২০১১ সালে। তারপর মোট তিনবার নির্বাচন হয়েছে। যার মধ্যে দু’বার জিতেছেন আবদুর রহিম বক্সি। প্রথমবার ২০১১ সালে আরএসপির টিকিটে। দ্বিতীয়বার ২০২১ সালে তৃণমূলের টিকিটে। মাঝে ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে সামান্য ভোটে জিতেছিলেন কংগ্রেসের অলবিরুণী জুলকারনাইন। দু’বারের বিধায়ক আবদুর রহিম বক্সিকে ফের টিকিট দিয়েছে তৃণমূল। বক্সি মালদহ জেলা তৃণমূলের সবচেয়ে ‘প্রভাবশালী’ নেতা। এই মালতিপুরে বহুদিন ধরে বামেদের একটা ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। এবার তারাও লড়াইয়ে। তবে আরএসপির বদলে এবার সিপিএম এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে যুব সংগঠনের নেতা মিনারুল হোসেনকে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার করছেন তিনিও।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Malatipur
বাম প্রার্থী মিনারুল হোসেন। ফাইল ছবি।

এমনিতে মালতিপুর মালদহ জেলার অন্তর্গত হলেও গণিখান চৌধুরীর সরাসরি সান্নিধ্য এই কেন্দ্র সেভাবে পায়নি। কারণ ২০১১ সালে বিধানসভা ও লোকসভা পুনর্গঠনের আগে পর্যন্ত মালতিপুর বিধানসভা মালদহ লোকসভার অন্তর্গত ছিল না। সেসময় এই এলাকার কংগ্রেসি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী। সে হিসাবে গণিখানের লিগ্যাসি মালতিপুরে খুব একটা কাজ করার কথা নয়। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে মৌসমের নিজেরই এই কেন্দ্রে একটি পরিচিত আছে। কংগ্রেসে থাকাকালীন দু’বার উত্তর মালদহের সাংসদ হন মৌসম। সেসময় এলাকার বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজও করেন তিনি। এলাকায় নিজস্ব পরিচিতি আছে। তাছাড়া গণিখান নিজে সরাসরি কাজ করার সুযোগ না পেলেও জেলার অন্যান্য প্রান্তে তাঁর প্রভাব দেখেছে মালতিপুর। ফলে মিথ কিছুটা হলেও কাজ করবে। অন্যদিকে তৃণমূলের জেলা সভাপতি নিজেই প্রার্থী। তাই রাজ্যের অন্য প্রান্তের তুলনায় এখানে গোষ্ঠীকোন্দল কম। তবে বক্সির বিরুদ্ধে ক্ষোভ যে নেই, তেমন নয়। এলাকায় দাপুটে নেতা হওয়ায় ‘দাদাগিরি’র অভিযোগ বিস্তর। রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগও। স্থানীয়রা বলছেন, মালতিপুর সার্বিকভাবে পিছিয়ে। রাস্তাঘাট, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, সেচ সবকিছুতেই সমস্যা রয়েছে। মালদহের অন্য প্রান্তে যেখানে বন্যায় ত্রস্ত আমজনতা। সেখানে মালতিপুরে চাষের জল মেলাই দুষ্কর। স্থানীয়রা বলেন, “গত পাঁচ বছরে এলাকায় বহু শিলান্যাস হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি।”

তৃণমূলের জেলা সভাপতি নিজেই প্রার্থী। তাই রাজ্যের অন্য প্রান্তের তুলনায় এখানে গোষ্ঠীকোন্দল কম। তবে বক্সির বিরুদ্ধে ক্ষোভ যে নেই, তেমন নয়। এলাকায় দাপুটে নেতা হওয়ায় ‘দাদাগিরি’র অভিযোগ বিস্তর। রয়েছে দুর্নীতির অভিযোগও। স্থানীয়রা বলছেন, মালতিপুর সার্বিকভাবে পিছিয়ে। রাস্তাঘাট, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, সেচ সবকিছুতেই সমস্যা রয়েছে।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Malatipur
তৃণমূল প্রার্থী আবদুর রহিম বক্সি। ফাইল ছবি।

তবে এ সব কিছুকে ছাপিয়ে মালদহের ভোটে এবার মূল ইস্যু এসআইআর। স্রেফ মালতিপুরেই ২ লক্ষ ৩৮ হাজার ভোটারের মধ্যে বাদ পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার ভোটারের নাম। স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্ষোভে ফুঁসছে। বিজেপির বিরুদ্ধে সেই ক্ষোভ কার ভোটব্যাঙ্কে পড়বে, তাতেই ঠিক হবে মালতিপুরের ভাগ্য। তৃণমূল প্রার্থী আবদুর রহিম বক্সি প্রচারে সাফ বলছেন, এসআইআর ইস্যু নিয়ে লড়ছেন একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই ভোটাধিকার বাঁচাতে এবার তৃণমূলের পাশে দাঁড়াবে মালতিপুরবাসী। বস্তুত, স্থানীয় স্তরের যা কিছু প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা রয়েছে সবটা এই SIR ইস্যু তুলে ধামাচাপা দিতে চাইছেন তিনি। হুমায়ুন কবীরের স্টিং ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর সংখ্যালঘুরা আরও একজোট হয়ে তৃণমূলের পক্ষে ভোট দিতে পারে, আশায় বুক বাঁধছে শাসকদল। তাছাড়া এলাকায় তৃণমূলের সংগঠনও শক্তিশালী। এলাকার সবকটি পঞ্চায়েতই এখন শাসকের দখলে। সংগঠন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি-সঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ, এই তিন ফ্যাক্টর ভাঙতে হবে মৌসমকে।

West Bengal Assembly Election 2026: Hotspot Malatipur
কংগ্রেস প্রার্থী মৌসম নূর। ফাইল ছবি।

এই লড়াইয়ে মৌসমের শক্তি, গণিখানের ভাবমূর্তি, নিজের সাংগঠনিক শক্তি এবং ‘পুরনো সেই দিনের কথা।’ কোতোয়ালি পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁর প্রতি ভোটারদের আবেগও কিছুটা কাজ করবে। এ কথাও ঠিক যে মৌসম দিল্লিতে গিয়ে কংগ্রেসে যোগ দেওয়ায় এলাকার অবশিষ্ট কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তাঁরা ‘দিদির’ জন্য দিনরাত এক করে লড়ছেন। কিন্তু লড়াইটা যে সহজ নয়, সেটা তারাও জানেন। এর মধ্যে আরও একটা বড় ফ্যাক্টর, তৃণমূল বিরোধী ভোট পুরোটা তাঁর ঝুলিতে যাবে না। হিন্দু ভোটের বেশিরভাগটাই পড়বে বিজেপির ঝুলিতে। আর সংখ্যালঘুদের মধ্যে একটা বড় অংশের ভোট কাটতে পারেন সিপিএমের মিনারুল। এই প্রথমবার এই কেন্দ্রে কাস্তে হাতুড়ি তারা প্রতীকে লড়ছে বামেরা। তাতে এলাকায় পুরনো বামপন্থীরা উজ্জীবিত। বস্তুত, নূরের ছোঁয়ায় মালতিপুরের মৌসম বদলাবে কিনা সেটা অনেকটা নির্ভর করছে বাম প্রার্থী মিনারুলের উপর। তিনি কতটা ভোট পাবেন, কার ভোট পাবেন? তাতে অনেক অঙ্ক বদলাতে পারে। সব মিলিয়ে একটা বিষয় স্পষ্ট, দলের স্টার প্রার্থীর জন্য মোটেই ‘সেফ’ সিট খুঁজে দিতে পারেনি কংগ্রেস।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.