Advertisement
Advertisement
West Bengal Assembly Election

আরাবুলের ‘হুল’ নাকি বাহারুলের ‘রুল’! ক্যানিং পূর্বের ভোটযুদ্ধে কোন পক্ষের পাল্লা ভারী?

আরাবুল-বাহারুলদের মাঝে এসআইআর অস্ত্রে শান দিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে এসইউসিআইও।

Advertisement
দেবব্রত মণ্ডল
দেবব্রত মণ্ডল

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ২০:০৩

link
দেবব্রত মণ্ডল
দেবব্রত মণ্ডল

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ২০:০৩

options
link
আরাবুলের ‘হুল’ নাকি বাহারুলের ‘রুল’! ক্যানিং পূর্বের ভোটযুদ্ধে কোন পক্ষের পাল্লা ভারী? zoom
ক্যানিং পূর্বে ভোটের লড়াই কেমন?

প্রতিপক্ষ চেনা হলে সুবিধা বেশি নাকি অসুবিধা? এমনিতে উত্তর যাই হোক, রাজনীতিতে কিন্তু এই জবাব তেমন সরলরৈখিক নয়। বিরোধী পক্ষ পূর্ব পরিচিত থাকলে যেমন আক্রমণের ব্লু প্রিন্ট সাজানো সুবিধাজনক, তেমন কিছু অজানা বিপদের মুখেও পড়তে হতে পারে। চেনা ‘শত্রু’র চারপাশের বৃত্ত থেকে আপনার প্রতি চোরাগোপ্তা হামলা হবে না, সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিত হয়ে যাওয়া মানে ভোটযুদ্ধের গোড়াতেই কিছুটা পিছিয়ে পড়া। ছাব্বিশের ভোটে (West Bengal Assembly Election) অন্যতম হটস্পট ক্যানিং পূর্বের পরিস্থিতি কিন্তু এই বিষয়গুলো ভাবাচ্ছে। তার মূল কারণ, এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা যে কোনও সময় ভোটের অঙ্ক এদিক-ওদিক করে দিতে পারেন বলে মনে করছে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল। এখানে এবার তৃণমূলকে ছায়াযুদ্ধের মুখে ফেলেছেন সদ্য তৃণমূল ত্যাগী ভাঙড়ের ‘তাজা নেতা’ আরাবুল ইসলাম। তিনি লড়ছেন আইএসএফের টিকিটে। তাঁর প্রতিপক্ষ শাসক শিবিরের বাহারুল ইসলাম। এখন এই যুযুধান পক্ষের মাঝে শাঁখের করাতের দশা তৃণমূলের সাধারণ কর্মী, সমর্থকদের। ফলে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই কেন্দ্রের লড়াইয়ে নজর থাকছেই।

ঠিক কোন অঙ্কে ক্যানিং পূর্বের নির্বাচনী লড়াই এবার আলাদা এবং জটিল? সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে একবার এই বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাথমিক তথ্যগুলো জেনে নেওয়া যাক। এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ২ লক্ষ ৫৬ হাজার ৫৩৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৩ হাজার ৫৯৩। স্ত্রী ভোটার ১ লক্ষ ২২ হাজার ৯১৯। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ২৫ জন। কেন্দ্রটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। প্রায় ৬৫ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। সাধারণ শ্রেণি ১০ শতাংশ, তফসিলি জাতি ও উপজাতি ভোটার মিলিয়ে বাকি ২৫ শতাংশ। এসআইআরের পর অবশ্য বাদ পড়েছে ৩২ হাজার ৯৪১ কিছুটা বেশি, যা বেশ বড় সংখ্যা।

Advertisement

নিঃসন্দেহে ক্যানিং পূর্বের অন্যতম ফ্যাক্টর তাজা নেতা আরাবুল ইসলামের আইএসএফ প্রার্থী হওয়া। কিন্তু জিততে হলে জোড়া ফলা ডিঙোতে হবে ‘তাজা নেতা’কে। ভোটের মাস খানেক আগে আইএসএফে যোগ দেওয়ায় এলাকায় তেমন সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু তৃণমূলের যে সমর্থকরা তাঁর অনুগামী ছিলেন, দলত্যাগ করায় তাঁদেরও হারিয়েছেন আরাবুল। এছাড়া ভাঙড় থেকে ক্যানিং পূর্বে লড়তে যাওয়া আরাবুলকে ‘বহিরাগত’ খোঁচা কম শুনতে হয়নি। যতবারই তিনি সন্ধের পর প্রচারে গিয়েছেন, হামলার মুখে পড়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে। 

২০১১ সালে গোটা রাজ্য পরিবর্তনের মুখ দেখলেও ক্যানিং পূর্ব সেবারও লাল ছিল। তৃণমূল প্রার্থীকে ধরাশায়ী করে জিতেছিলেন বাম আমলের বিতর্কিত মন্ত্রী, ‘চাষার ব্যাটা’ বলে পরিচিত সিপিএমের আবদুর রেজ্জাক মোল্লা। পরেরবার অর্থাৎ ২০১৬ সালে সিপিএম প্রার্থীকে হারিয়ে দেন শওকত মোল্লা। সেই থেকে ক্যানিং পূর্ব তাঁর গড়। ২০১৬ সালে শওকতের জয়ের ব্যবধান আরও বেড়ে যায়। কিন্তু ছাব্বিশের নির্বাচনে শওকত মোল্লাকে অন্য কেন্দ্র উদ্ধারের ভার দিয়েছে শাসকদল। তিনি এবার ভাঙড়ের প্রার্থী। ১০ বছর ক্যানিং পূর্বের বিধায়ক থাকার সুবাদে শওকতের আমলে উন্নয়ন ভালোই হয়েছে। ক্যানিং পূর্ব ও পশ্চিমকে টানা সংযুক্ত করা মাতলা সেতু তৈরি হয়েছে। রাস্তাঘাটের পাশাপাশি আলো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও এখানকার মূল সমস্যা স্বাস্থ্য, পানীয় জল ও সেচের জল। এসব সামাজিক ইস্যু থাকলেও এবার এখানে ভোটের (West Bengal Assembly Election) লড়াই হবে অন্য সমীকরণের উপর দাঁড়িয়ে।

ক্যানিং পূর্বের তৃণমূল প্রার্থী বাহারুল ইসলাম জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ। ছবি: বিশ্বজিৎ নস্কর

তৃণমূল প্রার্থী বাহারুল দক্ষ সংগঠক। খুব ভেবেচিন্তেই এখানে প্রার্থী বাছাই করেছে শাসক শিবির। বাহারুল ভাঙড়ের বাসিন্দা হলেও জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ হিসেবে গোটা অঞ্চল তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, পরামর্শের পাশাপাশি জনসংযোগও ব্যাপক। তাই বাহারুল নিজের জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী।

শওকতের বদলে ক্যানিং পূর্বে ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী হয়েছেন জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ বাহারুল ইসলাম। একদা সতীর্থের বিরুদ্ধে লড়ছেন আইএসএফের আরাবুল ইসলাম। নিঃসন্দেহে তিনিই এখানে অন্যতম ফ্যাক্টর। কিন্তু ক্যানিং পূর্ব জিততে হলে জোড়া ফলা ডিঙোতে হবে ‘তাজা নেতা’কে। ভোটের মাস খানেক আগে আইএসএফে যোগ দেওয়ায় এলাকায় তেমন সংগঠন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু তৃণমূলের যে সমর্থকরা তাঁর অনুগামী ছিলেন, দলত্যাগ করায় তাঁদেরও হারিয়েছেন আরাবুল। এছাড়া ভাঙড় থেকে ক্যানিং পূর্বে লড়তে যাওয়া আরাবুলকে ‘বহিরাগত’ খোঁচা কম শুনতে হয়নি। যতবারই তিনি সন্ধের পর প্রচারে গিয়েছেন, হামলার মুখে পড়ে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান শুনতে হয়েছে। তাতে অবশ্য আরাবুল দায়ী করেছে শওকত-বাহিনীকে! ফলে ভাঙড়ের মতো এই কেন্দ্রেও আরাবুল-শওকত দ্বন্দ্বের চেনা ছবিটা রয়েই যাচ্ছে। প্রচারে বেরিয়ে আরাবুল অবশ্য জনতার কাছে আক্ষেপের সুরে বলছেন, ”এতদিন দলে ছিলাম। আমাকে কোনও কাজে লাগায়নি। অভিমান করেই দল ছেড়েছি। আইএসএফ আমাকে কাজের সুযোগ দিয়েছে। কথা দিচ্ছি, এখানে এতদিন ধরে যে দুষ্কৃতীরা দাপট দেখিয়েছে, তাদের উৎখাত করে দেব। মানুষ শান্তিতে থাকবেন। ক্যানিং পূর্বকে আমূল বদলে দেব।” কিন্তু আরাবুলের লড়াই বেশ কঠিন, তেমনই মনে করছে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল। সেখানে ফিসফাস, শওকত মোল্লা এতদিন ধরে যেভাবে সংগঠন সাজিয়েছেন, নিজের দাপটে আরাবুল তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবেন বলে মনে হয় না।

‘তাজা নেতা’ আরাবুল ইসলামের ভোটপরীক্ষা এবার নতুন গড়ে। ছবি: বিশ্বজিৎ নস্কর

তৃণমূল প্রার্থী বাহারুল দক্ষ সংগঠক। খুব ভেবেচিন্তেই এখানে প্রার্থী বাছাই করেছে শাসক শিবির। বাহারুল ভাঙড়ের বাসিন্দা হলেও জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ হিসেবে গোটা অঞ্চল তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা, পরামর্শের পাশাপাশি জনসংযোগও ব্যাপক। তাই বাহারুল নিজের জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প তুলে ধরার পাশাপাশি প্রাক্তন সতীর্থের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ”সবাই জানেন আরাবুল কেমন। দল তো তাঁকে এমনি এমনি গত ৬ বছর সাসপেন্ড করে রাখেনি। সেই নেতা এখন আবার দলের কর্মী হয়ে থাকতে চান না, নেতা হতে চান, তাই অন্য দলে গিয়েছেন। এমন মানুষকে ভরসা করে জিতিয়ে আপনারা বিধানসভায় পাঠাবেন কি না, সেটা আপনারাই ঠিক করবেন।” ক্যানিং পূর্বের বিজেপি প্রার্থী অসীম সাঁপুই। যদিও এখানে বিজেপির সংগঠন তেমন নেই, তা সত্ত্বেও একযোগে তৃণমূল, আইএসএফকে নিশানা করে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। প্রার্থীর কথায়, ”এখানে যা হয়েছে, সব ভুল হয়েছে। আমরা ক্ষমতায় এলে গণতন্ত্র ফেরাব, সব ভুল সংশোধন করে নেব।”

এসইউসিআই প্রার্থী রফিক আকঞ্জি। ছবি: বিশ্বজিৎ নস্কর

দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক জমিতে বরাবরের লড়াকু দল এসইউসিআই। বছর কয়েক আগে পর্যন্তও সংসদে তাঁদের জনপ্রতিনিধি ছিলেন। যদিও দুর্ভাগ্যবশত এসআইআরে সেই প্রাক্তন সাংসদ তরুণ নস্করের নামই বাদ পড়েছে। আর সেই ইস্যুকেই হাতিয়ার করে ছাব্বিশের ভোটে ক্যানিং পূর্ব থেকে লড়ছেন এসইউসিআই প্রার্থী রফিক আকঞ্জি। তিনি বলছেন, ”সবাই ধর্মের কথা বলছে। বিজেপি এক ধর্মের প্রচার করছে তো, তৃণমূল আরেক ধর্মের। সাধারণ মানুষের সার্বিক সমস্যার কথা কেউ বলছে না। আমরা এবার কেন্দ্রের এই এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেই মানুষের কাছে প্রচার করছি। কারণ এতে তো তাঁদেরই বেশি সমস্যা হয়েছে।” নিঃসন্দেহে এসআইআরে ভোটারদের নাম বাদ পড়াটা এবারের ভোটে একটা বড় ইস্যু। কিন্তু তা কি ভোট বৈতরণী পেরতে এসইউসিআইয়ের মতো দলকে তেমন সাহায্য করতে পারবে? প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ৪ মে।

বিজেপি প্রার্থী অসীম সাঁপুই আশ্বাস দিচ্ছেন, জিতলে এখানে গণতন্ত্র ফেরাবেন। । ছবি: বিশ্বজিৎ নস্কর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.