বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) সংসদীয় ও পরিষদীয় দলে ভাঙন ধরে। মমতা বন্দে্যাপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকে সরতেই সাংসদ-বিধায়করা তাঁকে ছাড়তে শুরু করেন। লোকসভার ২৯ জনের মধে্য ২০ জন সাংসদ সরাসরি পদ্ম শিবিরের দিকে চলে গেলেও বিজেপিতে যোগ দিতে পারেননি নানা টেকনিকাল কারণে। শেষ পর্যন্ত ‘এনসিপিঅাই’ নামে একটি কুলগোত্রহীন দলে তাঁরা অবস্থান নিয়েছেন। যে দল এখন এনডিএ-র বৃহত্তম শরিক। সাংসদরা এনডিএর বৈঠকেও অংশ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তঁারা নিজেদের নেতা বলে ঘোষণা করেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূল থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার পর এই সাংসদদের বিরুদ্ধে স্পিকারের কাছে অভিযোগ জানানো হয়। তাতে কোনও লাভ না হওয়ায় সুপ্রিম কোর্টে ২০ জনের বিরুদ্ধে অালাদা অালাদা করে মামলা করেছে মমতা শিবির। সাংসদরা দলত্যাগ অাইন লঙ্ঘন করেছেন কি না তার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। তবে ঘটনা পরম্পরায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। সাংসদরা সময় নিচ্ছেন। তঁারা সবাই বিজেপিতে যোগ দিতে চাইছেন। কিন্তু কীভাবে? অাইনগত দিকটি জোরদার না হলে বিজেপির পক্ষে তঁাদের নেওয়া সম্ভব নয়। রাজ্যসভার সাংসদদের পদত্যাগ করিয়ে অাবার জিতিয়ে অানা হচ্ছে। কিন্তু লোকসভার সদস্যর পদত্যাগ করানো মানে ভোটে যেতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট যদি কঠোর মনোভাব নেয়, তা হলে ২০ জনের সাংসদ পদ চলে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০ অাসনে উপ-নির্বাচন অনিবার্য। রাজে্য এখন যা পরিস্থিতি এই অাসনগুলির অধিকাংশ বিজেপি জিতে যাবে। কিন্তু দলত্যাগী সাংসদরা টিকিট পাবেন কি? তঁাদের মানবেন বিজেপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা? লাখ টাকার প্রশ্ন।
তাই রাজ্যসভায় যা সহজ লোকসভায় তা ততটাই কঠিন। রাজ্যসভায় তৃণমূলের ১৩ জন সাংসদ ছিলেন। তঁাদের মধে্য তিনজন ইতিমধে্য ইস্তফা দিয়ে বিজেপির টিকিটে জিতে এসেছেন। অারও একজন পদ ছাড়ায় ভোট ঘোষণা হয়েছে। ‘ডিলিমিটেশন বিল’ সংসদের দুই কক্ষে পাস করাতে বিজেপি বদ্ধপরিকর। একবার বিল লোকসভায় অাটকে গিয়েছে। এবার দুই-তৃতীয়াংশ জোগাড় করেই তারা বিলটি সংসদে পেশ করবে। নানা দিক থেকে প্রয়োজনীয় অঙ্ক জোগাড় করার চেষ্টা চলছে। সেক্ষেত্রে বাংলার দলত্যাগীদের খুবই দরকার।
বিধানসভার পরিস্থিতিটা অবশ্য অন্যরকম। তৃণমূলের জয়ী ৮০ বিধায়কের মধে্য অন্তত ৬০-৬২ জন কালীঘাটের ছত্রছায়া থেকে বেরিয়ে অালাদা গোষ্ঠী তৈরি করেন। দলনেত্রী মনোনীত শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে না মেনে ঋতব্রত বন্দে্যাপাধ্যায়কে ‘বিরোধী দলনেতা’ নির্বাচন করেন। এমনকী, দলীয় অধিবেশন ডেকে সমান্তরাল সংগঠন তৈরি করে নিজেদের ‘অাসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন। রাজ্য সভাপতি, সর্বভারতীয় সভাপতি মনোনীত করা হয়। সেই দল থেকে অভিষেক বন্দে্যাপাধ্যায়কে ‘বহিষ্কার’-এর পর মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় সভানেত্রীর পদ থেকে সরিয়ে অরূপ রায়কে তঁার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। দখল নেওয়া হল মেট্রোপলিটন রাজ্য দফতরও। স্বাভাবিকভাবেই এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে কমিশনে নালিশ করেছে মমতা শিবির। কিন্তু কারা ‘অাসল’ তৃণমূ্ল সেই প্রশ্নের এখনও নিষ্পত্তি করেনি নির্বাচন কমিশন। দু’-পক্ষর কথা শোনা হয়েছে কয়েক দফায়। বার বার তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত কিছু নেওয়া হয়নি। এরই মধে্য দু’টি বিধানসভা অাসনের উপনির্বাচন ঘোষিত হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। যুযুধান দুই শিবিরকে দু’টি অালাদা ‘দল’ ও দু’টি ‘প্রতীক’ দেওয়া হয়। নামের ক্ষেত্রে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করার অনুমতি থাকলেও ‘জোড়াফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ‘ফ্রিজ’ হয়েছে। তৃণমূলের জন্মদাত্রী মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের দলের নাম হয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’। সংক্ষেপে ‘এমএঅাইটিসি’। অর্থাৎ, দলের মূল নামের অাগে শুধু ‘মমতা’ বসেছে। অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দে্যাপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের দলের নাম হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’। সংক্ষেপে ‘ডিটিএমসি’। মমতাকে প্রতীক দেওয়া হয়েছে ‘বল পায়ে ফুটবলার’, দ্বিতীয় শিবির পেয়েছে ‘খাম’। দল ও প্রতীকের জন্য তিনটি করে নাম দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল দুই শিবির। কমিশন কালীঘাটের তালিকার প্রথম নাম ও প্রতীকটিকে নির্দিষ্ট করে। ঋতব্রতরা পেয়েছেন তঁাদের পাঠানো তালিকার তৃতীয় নামটি। কী কারণে প্রথম দু’টি নাম গ্রাহ্য হয়নি তার ব্যাখ্যা তাদের দিয়েছেন কমিশনের কর্তারা।
দল ও প্রতীক নিয়ে এমন অস্থায়ী সিদ্ধান্তের ভবিষ্যৎ কী? কত দিন এই পরিস্থিতি চলবে স্পষ্ট নয়। মমতার হাতে তঁার তৈরি দল ও প্রতীক ফিরে অাসবে কি না তা এখনই বলা যাবে না। পরিস্থিতি যা তাতে কলকাতা পুরসভার ভোটেও এই স্টেটাস বজায় থাকতে পারে। পুজোর পর কলকাতার ভোট। তারপর ভেঙে যাওয়া পুরসভাগুলিরও ভোট হবে। কমিশনের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্টে গেলেও বিভাজনটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় মমতা শিবির খানিকটা হলেও স্বস্তিতে। কারণ, ‘জোড়াফুল’ বিপক্ষ শিবিরে যায়নি। দু’টি পক্ষের নাম ও প্রতীক অালাদা। কে ‘অাসল’ অার কে ‘নকল’ তা বিচার্য এখন জনতার হাতে। অন্য একটি মামলায় কালীঘাটকে স্বস্তি দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়। যে তিনটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার সুযোগ তঁারা পেয়েছিলেন তা বজায় রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। অর্থাৎ দলের নাম ও প্রতীক অালাদা হয়ে গেলেও পুরনো নামেই ব্যবহৃত অ্যাকাউন্ট চালু থাকবে।
উপনির্বাচনের প্রেক্ষিতে দু’টি দলে বিভাজন কমিশন করে দিলেও এ ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি বিচারপতিরা। উপনির্বাচনে দু’-পক্ষই ভোটে প্রার্থী দিয়েছে। কিন্তু নন্দীগ্রামে মমতা শিবিরের যিনি প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি নিজেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলেন। তার অাগে তিনি কলকাতায় এসে দেখা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে। এই ছবি ‘ভাইরাল’ হতেই অনেকে অনেক মন্তব্য করেছে। কিন্তু বাস্তব হল, হারের পর নন্দীগ্রামের তাসের ঘরের মতো ভেঙে গিয়েছে তৃণমূলের সংগঠন। নন্দীগ্রামে তৃণমূলের নেতা হিসাবে পরিচিত ছিলেন অাবু তাহের, সুফিয়ানরা। কিন্তু তঁারা কেউ প্রার্থী তো হননি, উল্টে দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করছেন। শুভেন্দু অধিকারীকে ৩০ হাজার ভোটে হারাবেন বলে যিনি তালিকা প্রকাশের দিন ক্যামাক স্ট্রিটে গিয়ে যোগদান করে বাজার গরম করেছিলেন, সেই পবিত্র কর ভোটের পর থেকে বেপাত্তা। এই অবস্থায় ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার হতে চাননি নিশ্চয়ই সঞ্চিতা প্রধান দে। তিনি সরে গিয়েছেন। তিনি দঁাড়ালেও প্রচারের অাদৌ কাউকে পাশে পেতেন কি না সন্দেহ। এই অাসনে গণতান্ত্রিক তৃণমূলের প্রার্থী রয়েছে। কিন্তু মমতা শিবির কংগ্রেসকে সমর্থন করে দেওয়ায় তৃণমূলের ভোট কোন দিকে যায় সেদিকে নজর থাকবে। বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথের বড় জয় নিয়ে কোনও সংশয় নেই। নজর ব্যবধান নিয়েই।
রেজিনগরের ক্ষেত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধীদের ৫ জন প্রার্থী। মমতা তৃণমূলের রবিউল অালম চৌধুরি দঁাড়াব না বলেও থেকে গিয়েছেন। চার মাস অাগে জিতেছিলেন হুমায়ুন কবীর। এবার তঁার প্রার্থী নিজের ছেলে। রেজিনগরে হুমায়ুনের সেই হাওয়া নেই। লোকজন কমে গিয়েছে। ফলে ৭০ শতাংশের অধিক সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যায় দেখার। ভোট ভাগাভাগি হলে বিজেপির লাভ।
সব মিলিয়ে ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূল শিবিরে এক কথায় এক বিচিত্র পরিস্থিতি। কমিশনের সিদ্ধান্তের ফলে অনেক প্রশ্ন। নতুন দলের নাম হয়ে গিয়েছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। কিন্তু সংসদে যে ১৬ জন সাংসদ (রাজ্যসভা ৮, লোকসভা ৮) কালীঘাট শিবিরের সঙ্গে রয়েছেন তঁারা এখনও ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’-এর। তঁাদের স্টেটাস কী হবে এখন? একইভাবে বিধানসভায় দুই শিবিরে থাকা ৮০ জন বিধায়কও দুই শিবিরে বিভক্ত। তঁাদের অধিবেশনের সময় কোন দলের বিধায়ক বলা হবে?
উপনির্বাচনের পর যদি কমিশন কোনও সিদ্ধান্তে না অাসে তা হলে নতুন এই সংকট তৈরি হবে লোকসভা রাজ্যসভা ও বিধানসভায়। মজার কথা হল, কমিশন দু’টি নতুন দলে ভাগ করে দিলেও পুরনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আবার রইল অাগের স্টেটাস অনুযায়ী মমতার হাতে থাকা ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’-এর হাতেই। সব মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি পরিস্থিতি। দেখা যাক, এই জট কী করে ছাড়ায়। কমিশন চুপ। হয়তো সুুপ্রিম কোর্টে ঠিক হবে কে অাসল অার
কে নকল!
সর্বশেষ খবর
-
স্থানীয়দের কাঁধে চেপে এলাকা পরিক্রমা, বাংলার এই দুর্গাপ্রতিমা নিরঞ্জনেও রয়েছে বিশেষ চমক
-
দক্ষিণেশ্বর থেকে ফেরার পথে অঘটন, ট্রেন থেকে পড়ে মৃত্যু পুণ্যার্থীর
-
‘ইন্ডিয়া’র ইলিশ খাব না! ভারত থেকে রুপোলি শস্য আমদানি নিষিদ্ধ করল বাংলাদেশ সরকার
-
অভিষেকের রোষানলে বরখাস্ত! পুলিশের সেই গাড়িচালকের চাকরি ফেরাল হাই কোর্ট
-
রাত পেরলেই সোনাজয়ের হাতছানি, আশায়-স্বপ্নভঙ্গে কাটল এশিয়াডে ভারতের চতুর্থ দিন