বাঁকিপুরে উপনির্বাচন, রাজস্থানে পুরভোটের ফল আর আরশোলাদের জাগরণ– যে-চিন্তায় বিজেপির বলিরেখা গাঢ় হয়েছিল, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচনী (Delhi University Election Results) ফলে তা আচমকাই প্রশমিত। লিখছেন, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
চিন্তিত পদ্মকুলকে ভরসা জুগিয়েছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন। ফেসবুক-টুইটার ছেড়ে ইনস্টাগ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আপাতত নিশ্চিন্ত হতে পারেন এই ভেবে যে, এত কিছুর পরেও তরুণ পড়ুয়ারা হয়তো পুরোপুরি তাঁদের ত্যাগ করেনি। অথচ বাঁকিপুর থেকে এই চিন্তাই তাঁদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। যন্তর মন্তর কাঁপানো আরশোলা জাগরণের পর ওটাই ছিল দেশের প্রথম নির্বাচন। ৩০ জুলাইয়ের সেই ভোটের ফল ছিল বিজেপির বড় ধাক্কা।
আরও পড়ুন:
বিহারের বাঁকিপুর এমনই এক বিধানসভা কেন্দ্র যেখানে গত ৩০ বছরে বিজেপি ছাড়া অন্য কোনও দল দাঁত ফোটাতে পারেনি। এককথায়, ওটা ছিল গেরুয়া বাহিনীর খাসতালুক। এতটাই যে, সেখানকার সাংসদ রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেছিলেন, বাঁকিপুরে পদ্ম-টিকিটে কুকুর-বেড়াল দাঁড়ালেও জয় নিশ্চিত। রবি-কণ্ঠে দম্ভ ঠিকরেছিল ঠিকই, কিন্তু এটাও তো সত্য, বাঁকিপুরে বিজেপির ভোট কখনও ৫৪ শতাংশের কম হয়নি। সর্বোচ্চ ভোটের হার ছিল ৮২ শতাংশ। সেখানকার ‘তালুকদার’ নীতিন নবীনকে একালের অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক জুটি দলের সভাপতি পদে বসিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহর অনুগত নীতিনের কাছে ওই উপনির্বাচন তাই সম্মানের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু নেপোর দই মারার মতো সে গুড়ে বালি ছেটান রাজনৈতিক অঙ্গনের শিশুপ্রতিম প্রশান্ত কিশোর। যাঁর তৈরি দল ‘জন সুরাজ পার্টি’ বিহার বিধানসভার ভোটে বিপুল সাড়া ফেলেও কোনও আসন জিততে পারেনি, সেই দলের নেতার রমরমিয়ে জয় শাসক বিজেপির ভ্রুকুঞ্চনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই প্রথম তারা বোঝার চেষ্টা করে, ওই পরাজয়ের নেপথ্যে জেন জি-দের হাত কতটা। না ভেবে উপায়ও ছিল না। কেন না, ৮ মাস আগে বিধানসভার ভোটে ওখান থেকে নীতিন জিতেছিলেন ৫২ হাজারের ব্যবধানে। তা ছাপিয়ে প্রায় ২০ হাজারের ব্যবধানে প্রশান্ত কিশোর বাঁকিপুরে বিজেপিকে ঠাঁইনাড়া করেন। ৭২ হাজার ভোট এমনি এমনি টানা যায় না।
নিশ্চিত জয়ের মুখ থেকে হার ছিনিয়ে নেওয়ার আরও একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ তারা রেখে গেল। টিকিট না-পাওয়া দীপাংশু শোকিন সহ-সভাপতি পদে নির্দল হয়ে লড়ে রেকর্ড ব্যবধানে জিতে বুঝিয়ে দিলেন, ভুল প্রার্থী বাছাই কংগ্রেসকে কীভাবে ডোবায়।
বিজেপির বিশ্লেষণে দু’টি বিষয় উঠে আসে। ব্রাহ্মণ প্রশান্তের পাশে উচ্চবর্ণের অবস্থান এবং জেন জি-দের ঢালাও সমর্থন। বাঁকিপুরই বিজেপির কপালের ভাঁজ প্রথম গভীরতর করেছিল। তবে স্রেফ বাঁকিপুর নয়, সেই সঙ্গে ভোট হয়েছিল আরও দুই বিজেপি-শাসিত রাজ্যের দুটি কেন্দ্রে। গুজরাতের মঞ্জলপুর ও মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ায়। বিজেপিকে ভাবায় ওই দুই কেন্দ্রের ফলও। গুজরাত এমন এক রাজ্য যেখানে কোনও বিধানসভা ভোটে বিজেপির জয়ের মার্জিন এক লাখের কম হলে তা হার গণ্য করা হয়। মঞ্জলপুরে আগের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ২ হাজার। সেখানে এবার কংগ্রেস প্রার্থী হারেন মাত্র ৩০ হাজার ভোটে। ৭২ হাজার ভোট কংগ্রেস কী করে কমাল, সেই নিরীক্ষাতেও উঠে আসে জেন জি অসন্তোষ। কিংবা, মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া। আসনটি কংগ্রেসের জেতা হলেও দলটি ছিল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ। এবার যাঁকে প্রথমে প্রার্থী করা হয়েছিল, পরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ভোটের দিন কয়েক আগে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়। বিজেপির ঘরও যে শান্ত ছিল তা নয়। তাদের হেভিওয়েট প্রার্থী টিকিট না পেয়ে বিদ্রোহ করেন। পরে ধমক খেয়ে শোধরালেও খিঁচ একটা লেগেই ছিল। দাতিয়ায় কংগ্রেসের মাথা উঁচু রাখার নেপথ্য কারণ হিসাবেও বিজেপি ছাত্র-জাগরণকে খাড়া করেছে। মনে রাখতে হবে, ওই সময় থেকেই ফেসবুক-টুইটার ছেড়ে মোদি বেশি করে আঁকড়ে ধরেন জেন জি-র প্রিয় মাধ্যম ইনস্টাগ্রাম। পরের ভোটটা ছিল মরুরাজ্য রাজস্থানের পুরসভার। ক’-দিন আগে তার গণনা-শেষে দেখা গেল, বিজেপি হাসছে, যদিও সেই হাসি ঔজ্জ্বল্যহীন। ম্লান। তুলনায় কংগ্রেসের হাসিতে আশার ঝিলিক। সেখানে ভোট শেষে হেসেছে আম আদমি পার্টি ও সিপিএমও। কারণ, কংগ্রেসের পাশাপাশি তারাও বিজেপির আধিপত্য দমিয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে।
মরুরাজ্যের মোট ৩০৯টি পুর এলাকার ১০ হাজার ২৪৫টি ওয়ার্ডে এই প্রথমবার একসঙ্গে ভোট গ্রহণ হয়। ফলপ্রকাশের পর দেখা যায়, বিজেপি জিতেছে ৪ হাজার ১৮২ ও কংগ্রেস ৩ হাজার ৬১৯টি ওয়ার্ডে। নির্দল প্রার্থীদের দখলে গিয়েছে ২ হাজার ২৭৩টি ওয়ার্ড। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে কংগ্রেসের তিন শরিক, রাষ্ট্রীয় লোকতান্ত্রিক পার্টি, সিপিএম ও বিএপি জেতে যথাক্রমে ৬৩, ৪২ ও ৮টি ওয়ার্ড। আম আদমি পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টি আলাদাভাবে লড়েছিল। তারা জিতেছে যথাক্রমে ৪২ ও ১৫টি ওয়ার্ড।
বিজেপির হাসি ম্লান কারণ, আগের বারের পুরভোটে তারা কংগ্রেসের চেয়ে ৮ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছিল। এবার সেই ফারাকটা কমে হয়েছে ১ শতাংশেরও কম। রাজ্য সরকারের মন্ত্রী-সান্ত্রি ছাড়াও এই ভোটে বিজেপি প্রচারে নামিয়েছিল তিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতিকে। এত কিছু পরেও ১০ নগর নিগমের মাত্র ৫টি তারা কবজা করেছে। কংগ্রেস ৩টি। একটি নির্দলীয়দের দখলে। যোধপুর নগর নিগমের ভাগ্য নির্দলীয়দের হাতে। সেখানকার ফল বিজেপি ৪৫, কংগ্রেস ৪৫, নির্দল ১০।
মরুরাজ্যে পুরভোটের প্রচার তুঙ্গে ওঠে যন্তর মন্তর আন্দোলন প্রত্যাহারের পর। রাজ্য নেতৃত্বের মত, ওই ভোটেও পড়ুয়াদের প্রভাব পড়েছে। সরকার বিরোধী মনোভাবের ফায়দা তুলেছে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র যুগ্ম আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা রাজস্থানি। জেন জি আন্দোলনকে প্রধানত তিনিই রাজস্থানে প্রসারিত করেছেন। ‘স্কুল ঠিক করো’ আন্দোলন যে রাজ্যগুলিতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছে, রাজস্থান তার অন্যতম। মরুরাজ্যে পুরভোটের প্রচার তুঙ্গে ওঠে যন্তর মন্তর আন্দোলন প্রত্যাহারের পর। রাজ্য নেতৃত্বের মত, ওই ভোটেও পড়ুয়াদের প্রভাব পড়েছে। সরকার বিরোধী মনোভাবের ফায়দা তুলেছে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা। জেন জি ও জেন আলফা-র ঢেউয়ে কিঞ্চিৎ বিব্রত বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যখন পরিত্রাণের উপায়ের খোঁজে ব্যস্ত, সেই সন্ধিক্ষণে বসন্ত সমীরণের মতো হাজির দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্র সংগঠনের (দুসু) নির্বাচনী ফল। এত দিন যে-চিন্তা বিজেপির বলিরেখা গাঢ় করে তুলেছিল, রাহুল গান্ধীর একের পর এক ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে জেন জি ও জেন আলফা-র বিস্ময়কর উপস্থিতি চিন্তা বাড়াচ্ছিল, ‘দুসু’-র ফল আচমকাই তা প্রশমিত করে দিল। বিজেপির কাছে এই ফল হাজির হয়েছে মুশকিল আসান সেজে। সভাপতি, সচিব ও যুগ্ম সচিব পদে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের জয়ে বিজেপি হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। এই জয় আশাতীত। আশাতীত কেননা, তারা শঙ্কিত ছিল যন্তর মন্তরের প্রভাব নিয়ে। দিল্লির বুকে ছাত্রসমাজের যে-ক্ষোভ শিক্ষামন্ত্রীকে ছেঁটে ফেলতে সরকারকে বাধ্য করেছে, যে আন্দোলন দিল্লি পুলিশকে বাধ্য করেছে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে আনা সব মামলা প্রত্যাহারে, সেই সমাজের ঢেউ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের ভোটে আছড়ে পড়ে ‘এবিভিপি’-কে তলিয়ে দেবে এমন শঙ্কায় তারা কুঁকড়ে ছিল। বিজেপি নেতারা ভেবেছিলেন, ‘দুসু’-র ফল রাহুল গান্ধীকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলবে। কিন্তু হল বিপরীত। লড়াই তুল্যমূল্য হয়েছে হয়তো। কিন্তু তিন পদে এবিভিপির জয় নরেন্দ্র মোদির জন্য নিশ্চিতই স্বস্তিদায়ক। ছাত্র সমাজের কেন এই মিশ্র আচরণ?
দু’-মাস আগেও যে-জাগরণে মনে হচ্ছিল সবকিছু উল্টেপাল্টে যাবে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কী করে তা স্তিমিত হয়ে গেল? যে-ভাবনা এতকাল প্রধানমন্ত্রীকে বিচলিত রেখেছিল, ‘দুসু’-র ফল তা সংক্রামিত করবে রাহুল গান্ধীকে। ২০১৫ সালের পর এই প্রথম একটি আসনেও এনএসইউআই জিততে পারল না! জেন জি জোয়ার সত্ত্বেও! এ জন্য কংগ্রেসই দায়ী। নিশ্চিত জয়ের মুখ থেকে হার ছিনিয়ে নেওয়ার আরও এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ তারা রেখে গেল। টিকিট না-পাওয়া দীপাংশু শোকিন সহ-সভাপতি পদে নির্দল হয়ে লড়ে রেকর্ড ব্যবধানে জিতে বুঝিয়ে দিলেন, ভুল প্রার্থী বাছাই কংগ্রেসকে কীভাবে ডোবায়। রাহুল উড়ছিলেন। ‘দুসু’-র ভোট ফের তঁাকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘বিগ বস বাংলা’র দূর্গে রহস্যময়ী! ‘স্পিটসভিলা’ কাঁপানো ‘ক্যুইন’ কি এবার কোণঠাসা করবেন নন্দিনীকে?
-
জোড়া ছোবলে বাংলাদেশে ‘মড়ক’, হামের ‘মৃত্যুবাণে’ নিহত ১০৭৬ শিশু, ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল ২০০!
-
মনসা পুজোর বিসর্জনে নৌকা বাইচ, ৭০ বছরের ঐতিহ্যে মাতল কানমারী
-
ত্রিকোণ প্রেমের জেরে শপিং মলে বন্ধুর গলায় ছুরির কোপ! নিউটাউনে রক্তারক্তি
-
শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরাও পাবেন বকেয়া ডিএ, ‘তবে কিছুটা সময় লাগবে’, হাই কোর্টে জানাল রাজ্য