শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। শিশির অধিকারীর পুত্র। শিশির অধিকারীর এক জ্যাঠতুতো ভাই অল্পবয়সেই গৃহত্যাগী, অতঃপর সন্ন্যাস। শুভেন্দু অধিকারীও সে পথে হাঁটবেন যে কোনও দিন, এ বড় দুশ্চিন্তা ছিল পরিবারের! তিনি অবশ্য সন্ন্যাস নেননি। গেরুয়া পরেননি। গেরুয়া ঝাণ্ডা ধরেছেন। ক’দিন আগেই যোগী আদিত্যনাথকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেছেন দেখে অনেকেই ‘থ’! যোগী আদিত্যনাথ যে একজন সাত্ত্বিক, সন্ন্যাসী মানুষই, তাঁকে ভেতর থেকে প্রবল সম্মান করেন, জানিয়েছেন শুভেন্দু। কিন্তু আসলে সন্ন্যাসী বা মুনি কারা? না, নিজের মত চাপাব না। আসুন, দেখে নিই বরং ‘গীতা’ কী বলছে! কারণ ২০২২ সালে, শুভেন্দুই বলেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ উত্তরপ্রদেশ, অসম হবে। গুজরাটের মতো এখানেও স্কুলে গীতা পড়ানো হবে।’ অতএব গীতায় যখন তাঁর বিশ্বাস রয়েছে, দেখি, দ্বিতীয় অধ্যায়ের, ৫৬ নং শ্লোকে কী রয়েছে–
দুঃখেষ্বনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ।
বীতরাগভয়ক্রোধঃ স্থিতধীর্মুনিরুচ্যতে।।
আরও পড়ুন:
অর্থাৎ যিনি দুঃখে উদ্বিগ্ন নন, সুখেও আসক্ত নন, একইসঙ্গে রাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকেও তিনি মুক্ত– তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ বা স্থিরবুদ্ধি মুনি। শুভেন্দু অধিকারীর মতে যোগী আদিত্যনাথ যে পরম ‘সন্ন্যাসী’, তাঁর রূপটি কেমন? তিনি হয়ে উঠেছেন বুলডোজার সংস্কৃতির হোতা। কখনও ইসলামবিদ্বেষে বদলে দিচ্ছেন একের পর এক স্টেশন কিংবা জায়গার নাম। ১০ জন সদ্যোজাত শিশু তাঁরই রাজ্যে সরকারি হাসপাতালে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পরদিনই বিরাট রোড শো-তে বেরিয়েছিলেন আদিত্যনাথ। উদাহরণ অজস্র!
শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে রাজনৈতিক জ্যোতিষচর্চায় ব্যস্ত রয়েছেন। অতীত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন যথাযথ। বিজেপির অতীত ফলাফল দেখেছেন এবং মনে হয়েছে এ বছর তাঁরা ১৭৭ প্লাস ভোটে জিততে চলেছেন। তা বেশ। আর ক’টাই তো দিন। সেরকম মিলে-টিলে গেলে একটা গেরুয়া জ্যোতিষালয় খোলারও নিদান আসতে পারে নির্বাচন কমিশন থেকে।
কিন্তু বিস্ময় জাগে যখন এই বাংলার সংস্কৃতিতে বড় হয়ে ওঠা কোনও নেতা এমন কাউকে গড় হয়ে প্রণাম করেন। সম্মান প্রদর্শনে, নাকি রাজনৈতিক সিঁড়ি চড়ার জন্য এই প্রণামের টোকেন? ‘বাংলার সংস্কৃতি’ বললাম বটে, কিন্তু বাংলা ও বাঙালিকে টেনে নামানোর জন্য কম কসরত তিনি করেননি। তাঁর হিন্দুত্ববাদী অ্যাজেন্ডার কাছে বাংলা ভাষাটা স্বাভাবিকভাবেই গোলমেলে। ‘আ মরি হিন্দিভাষা’ বললে বরং তিনি আপন ইমেজ বজায় রাখতে পারবেন। এই ক’দিন আগে, ২২ এপ্রিলের ঘটনা– রাজ্য সরকারের নতুন নিয়ম: পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস বা ডব্লুবিসিএস-এ চাকরির জন্য বাংলা ভাষার লিখিত পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক। শুভেন্দু অধিকারী, খাস মেদিনীপুরের বাঙালি, বাংলা ভাষাকে নিয়ে এমন সাধু উদ্যোগে যাঁর আনন্দ হওয়ারই কথা ছিল, তিনি গেলেন বিগড়ে! বাঙালি নিজের ভাষা জানবে না? পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা সরকারি কাজ করবেন, তাঁদের বাংলা ভাষার পরীক্ষায় পাস করতে হবে, এ কি পরীক্ষার্থীদের জন্য অসম্মানের নাকি বাংলার ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর! কী ভেবেছেন বিরোধী দলনেতা, কে জানে, তিনি এর বিরোধিতা করতে গিয়ে সর্বাত্মক গণআন্দোলন চান। এমনকী, বিধানসভাতেও এই ব্যাপারে সওয়াল করবেন বলে জানিয়েছেন!
শুভেন্দু অধিকারী বর্তমানে রাজনৈতিক জ্যোতিষচর্চায় ব্যস্ত রয়েছেন। অতীত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন যথাযথ। বিজেপির অতীত ফলাফল দেখেছেন এবং মনে হয়েছে এ বছর তাঁরা ১৭৭ প্লাস ভোটে জিততে চলেছেন। তা বেশ। আর ক’টাই তো দিন। সেরকম মিলে-টিলে গেলে একটা গেরুয়া জ্যোতিষালয় খোলারও নিদান আসতে পারে নির্বাচন কমিশন থেকে। এবার বলবেন না, নির্বাচন কমিশন কোথা থেকে এল? তারা যে কোনও জায়গা থেকেই উদয় ও অস্ত হতে পারে।
এই বসন্তেই, ৩ মার্চ– বালিগঞ্জে দোলযাত্রায় অংশগ্রহণ করে শুভেন্দু অধিকারী এক বে-আইনি ও সংবিধান লঙ্ঘনকারী উক্তি করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। সকলেই নির্ঘাত সে উক্তির কথা জানেন। শুভেন্দু বলেছিলেন: ‘সেকুলারিজম নিপাত যাক, নাস্তিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা চলবে না।’ বোঝাই যায়, হিন্দুরাষ্ট্রের যে অভিসন্ধি– তাই-ই বারবার করে উঠে আসছে বিজেপির নানা নেতার কথায়, প্রচারাভিযানে। শুভেন্দু অধিকারীর মতো, খাস বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে, একথা বলার মতো সাহস আর কেউই অর্জন করতে পারেননি বোধহয়। বাংলার সেকুলার মন তাতে অবশ্য কতটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, জানা নেই। সম্ভবত, ভোটের ফলাফলেই তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। একথা বলার জন্য তাঁর নামে থানায় এফআইআর করা হয়েছে অবশ্য। তাতে শুভেন্দু অধিকারীর বিশেষ কিছু যায় আসার কথা নয়। ’২২ সালের এক প্রকাশ্য সভায় তিনি কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘ইই যেগুলা বসে আছে সেগুলো শিশু। এই দেবনাথ হাঁসদা, বীরবাহা এরা সব শিশু। আমার জুতোর নীচে থাকে।’ ঝাড়গ্রাম থানায় এফআইআরও হয়েছিল তখন। এখানে একটা পরিসংখ্যান দিয়ে রাখি। যদিও ২৩ এপ্রিল, ভোটগ্রহণের প্রথমপর্ব পার হয়ে গেল, মনে রাখবেন, বিজেপির ৭০ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধেই রয়েছে ফৌজদারি মামলা। কিন্তু এই ফৌজদারি কেসের ফার্স্ট বয় কে? তিনি– শুভেন্দু অধিকারী। কেসের সংখ্যা: ২৯টি! তা সত্ত্বেও এতদূর তিনি রাজনৈতিক সাফল্যের মুখ দেখলেন কী করে? শুভেন্দু যদিও একবার বলেছিলেন, ‘লিফটে করে উঠিনি, ধাপে ধাপে এতদূর উঠেছি।’
’২১ সালে তমলুকের সভায় তিনি তৃণমূল নেতাদের প্রবল আক্রমণ সেরে-টেরে বামেদের প্রশংসাও করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘বামেদের নীতি ভুল ছিল, কিন্তু ওরা অনেক কাজ করেছিল যা কোনওদিন আমরা অস্বীকার করতে পারব না।’ গত কয়েক বছর ধরে অবশ্য অনেকেই ঘুরিয়েফিরিয়ে বলছিলেন বামের ভোট রামে গিয়েছে। সেই যুক্তিতেই কি বামপ্রীতি শুভেন্দুর?
গত বিধানসভার সময়, খুব পরিচিত একটি রাজনৈতিক ট্যাগলাইন ছিল: ‘নো ভোট টু বিজেপি’। এ বছর, চন্দ্রকোণায় সভা করতে গিয়ে সাধারণভাবে পরনে যা থাকে শুভেন্দুর, তা ত্যাগ করে পরেছেন একটা সাদা টি-শার্ট। যেখানে লাল ইংরেজি ফন্টে লেখা ‘নো ভোট টু মমতা’! এহেন টি-শার্টের বাহুল্য অবশ্য রাস্তাঘাটে বিশেষ চোখে পড়েনি। ডিজাইনার টি-শার্ট কি? ভবানীপুরে এমন টি-শার্টের বাহুল্য দেখা গেলে অবাক হতাম না। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে প্রবল ফাইট দেবেন– এহেন বিরোধী নেতা বিজেপিতেও সম্ভবত দ্বিতীয়টি ছিলেন না।
বামেদের শুভেন্দু বোধহয় ততটা শত্তুর ভাবেন না। ’২১ সালে তমলুকের সভায় তিনি তৃণমূল নেতাদের প্রবল আক্রমণ সেরে-টেরে বামেদের প্রশংসাও করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘বামেদের নীতি ভুল ছিল, কিন্তু ওরা অনেক কাজ করেছিল যা কোনওদিন আমরা অস্বীকার করতে পারব না।’ গত কয়েক বছর ধরে অবশ্য অনেকেই ঘুরিয়েফিরিয়ে বলছিলেন বামের ভোট রামে গিয়েছে। সেই যুক্তিতেই কি বামপ্রীতি শুভেন্দুর? এ বছরের ভোটের হিসেব সম্ভবত সেকথা বলছে না। নানা জায়গায়, বিশেষ করে তরুণ বামেদেরকে নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে শুভেন্দু অধিকারী পরবর্তীকালে বামেদের ব্যাপারে প্রশংসাবাক্য খরচ করবেন বলে মনে হয় না।
‘কেউ বন্ধু, কেউ শুভেন্দু’– এহেন একটা নতুন প্রবাদবাক্য ছড়িয়ে পড়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস থেকে শুভেন্দু বিদায়পর্বে। সে কথায় বিস্তারিত যাচ্ছি না। কিন্তু বন্ধুর মতোই বলছি, মশাই, রাগ খানিক কনট্রোল করলে ভালোই হয়। রোড শো থেকে শুরু করে নানা সভা-টভায় এমন ভীষ্মলোচন শর্মা হওয়ার কোনও দরকার আছে কি? সে কারণেই নানা হাবিজাবি অসাংবিধানিক কথা বলে ফেলছেন। একজন স্কিপারের বিরোধী হলে কি বাকসংযম থাকতে নেই?
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
সিআইডি সেজে ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য রাস্তা থেকে অপহরণ করে ডাকাতি, তদন্তে পুলিশ
-
‘আত্মঘাতী’ বিস্ফোরণে কাঁপল করাচির সেনা দপ্তর, চলল গুলি, মৃত্যু তিন পাক সেনার
-
লেনিন নয়, হৃদয় সম্রাট শিবাজি! ‘লাল’ যাদবপুরে পালিত ‘হিন্দু সাম্রাজ্য দিবস’
-
লিঙ্কডিনে ফুটবলার খুঁজে বিশ্বকাপের নকআউটে! কেপ ভার্দের স্বপ্নের সওদাগর যে মানুষটা
-
জীবিকা হারানো হকারদের এককাট্টা করে আন্দোলনের প্রস্তুতি ‘কালীঘাট তৃণমূলের’, ফের পথে মমতা!