Advertisement
Advertisement
Kunal Ghosh

ভোটের স্কিপার: ট্রোলারদের বিশ্বে কুণাল ঘোষই ইন্ডাস্ট্রি!

ডিফেন্স তাঁর চিরকালই কড়া। মাঠে ও রাজনীতির ময়দানে। সর্বোপরি, টেলিপাড়ার মতো একটা ট্রোলপাড়া হলে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো তিনিও বলতে পারেন ‘আ-আ-মি ইন্ডাস্ট্রি’।

Advertisement
নিরাপদ কর
নিরাপদ কর

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১২:০৭

link
নিরাপদ কর
নিরাপদ কর

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১২:০৭

options
link
ভোটের স্কিপার: ট্রোলারদের বিশ্বে কুণাল ঘোষই ইন্ডাস্ট্রি! zoom
ক্যারিকেচার: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

জয় বাবা ফেলুনাথের সেই বিখ্যাত দৃশ্য। উৎপল দত্ত বলছেন, ‘উঠেন মোহনবাবু, উঠেন উঠেন।’ চোখ খানিক পিটপিট করে লালমোহনবাবু ওরফে সন্তোষ দত্ত বলেন, ‘শরবতটা খেয়ে নিই?’ অতঃপর ‘আহ’, ‘কী দিয়েছেন বলুন তো শরবতে? বেশ বল পাচ্ছি। অদ্ভুত!’ বলে দু’হাত ছড়িয়ে তিনি ‘টার্গেট’ হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর একের পর এক ছুরি। একটিও তাঁকে বিদ্ধ করে না। এই পর্যন্তই লালমোহনবাবু আর কুণাল ঘোষের (Kunal Ghosh) মিল। অমিল হল লালমোহনবাবু অজ্ঞান হয়ে পড়েন আর কুণাল ঘোষ হন না। এই আক্রমণ রোজদিনই তাঁকে সহ্য করতে হয় বঙ্গীয় ফেসবুক পাড়ায়। তিনি কিন্তু থাকেন অনড়। কে না জানে বহুরূপে সম্মুখে ঈশ্বর আসেন, আর বিরোধীরা আসেন শতরূপে। যে কোনও রূপেই বিরোধীরা আসুন না কেন– তিনি সদা স্পোর্টিং, প্রত্যুত্তরে স্ফূর্তিমান। মনে পড়ে, বছরখানেকের মধ্যেই হুলিগানইজমের একটি ‘ভাইরাল’ গানে, লিরিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘রেগে যাবে কুণাল ঘোষ’। কিন্তু তিনি এসব ব্যাপারে মোটেই রাগত নন, উলটে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, রাজনৈতিক নেতাদের এই টিপ্পনী, তীর্যকতা গ্রহণ করার মন থাকা উচিত। তবে তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণের যারপরনাই বিরুদ্ধে। তাঁকে দেখে বাকি রাজনৈতিক নেতারা যদি এই সহবত শিক্ষা নিতেন, তাহলে সংবাদপত্রগুলিতে কার্টুনের বিলোপ আটকানো যেত!

অতি-উৎসাহী তৃণমূল কর্মীরা বেলেঘাটার দেওয়ালে সিপিএমের পোস্টারের ওপর তাঁর পোস্টার সাঁটায় মেজাজ খাপ্পা হয়ে উঠেছিল কুণাল ঘোষের। তিনি স্পষ্ট জানান: ‘সিপিএম জমানায় এসব হয়েছে। আমরা এসব করব না। দরকার হলে সিপিএমের পোস্টার চেয়ে এনে আমাদের ছেলেরা সিপিএমের পোস্টার মেরে দেবে।’ শুধু এখানেই শেষ নয়। তিনি সহস্তে নিজের পোস্টার ছিঁড়েও দেন।

তবে, যাঁরাই ফেবুপাড়ায় রোজ হাঁটাচলা করেন, জানেন নিশ্চয়ই নানা মিম-এ, ভিডিওতে তাঁর দেখা মেলে। বাঙালির এককালে টোল ছিল, এখন ট্রোল হয়েছে। সারাদিনমান এই ট্রোল করতে গিয়ে অনেক সময়ই ব্যক্তিগতের পরিসীমা পেরিয়ে গিয়েছেন ট্রোলাররা। শুধু তাই-ই নয়, কিছুকাল আগে খোলামঞ্চে গিটার হাতে এক তরুণ, খানিক উত্তেজিত হয়েই, তাঁকে শারীরিক আক্রমণের কথাও বলেছিলেন। কুণাল ঘোষ সরাসরি তাঁকে ফোন করেন, কথা বলেন, আশ্বস্ত করেন চিন্তা না করতে, কোনও আইনি ব্যবস্থা নিতে তিনি ফোন করেননি। এবং, শেষত, তিনি নেমন্তন্ন করেন চায়ের। এটা যে প্রথমবারের জন্য, তাও নয়। বারবারই এই অহিংস উপায়ে তাঁর ট্রোলারদের খানিক ভড়কে দেন। চমৎকার পদ্ধতি বটে!

Advertisement

রাজনৈতিক সৌজন্য– যা বাংলা রাজনৈতিক মহলে ডুমুরের ফুল, তা কিন্তু এইবারের বেলেঘাটার প্রার্থী কুণাল ঘোষ দেখাতে ভোলেননি। অতি-উৎসাহী তৃণমূল কর্মীরা বেলেঘাটার দেওয়ালে সিপিএমের পোস্টারের ওপর তাঁর পোস্টার সাঁটায় মেজাজ খাপ্পা হয়ে উঠেছিল কুণাল ঘোষের। তিনি স্পষ্ট জানান: ‘সিপিএম জমানায় এসব হয়েছে। আমরা এসব করব না। দরকার হলে সিপিএমের পোস্টার চেয়ে এনে আমাদের ছেলেরা সিপিএমের পোস্টার মেরে দেবে।’ শুধু এখানেই শেষ নয়। তিনি সহস্তে নিজের পোস্টার ছিঁড়েও দেন।

তিনি স্রেফ নেতাপ্রবর নন। দীর্ঘকালের সাংবাদিক। আন্তর্জাতিক খবর পর্যন্ত ব্রেক করেছেন! দীর্ঘকালের কলাম লিখিয়ে। শুধু রাজনৈতিক লেখা নয়, স্মৃতিকথা নয়, গল্প-উপন্যাসও তিনি কিছু কম লেখেননি। হাজতবাসের সময়ও নিজের ক্রিয়েটিভ সত্তাকে কোনওভাবেই সংশোধনাগারের চার দেওয়ালে আটকে রাখেননি। লিট্‌ল ম্যাগাজিনের প্রতি আগ্রহ তো রয়েইছে, সেই কৌতূহলের সূত্রেই বোধহয় সংশোধনাগারের পত্রিকা ও তাঁর ইতিহাসের কথাও তুলে ধরেছিলেন তাঁর ধারাবাহিক কলামে–‘পথের বাঁকে এসে’। সে বইয়ের উদ্বোধনে, তিনি বলেছিলেন তাঁর লড়াকু জীবনদর্শনের কথা: ‘ছোট হতে পারি, কিন্তু রাজার মেজাজে থাকব। মৃত সৈনিকের পার্ট আমাকে দিয়ে করানো যাবে না। আমাকে পড়ে যেতে দেখেছেন কয়েকজন। উত্থান গোটা পৃথিবীকে দেখিয়ে ছাড়ব।’

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন রঙিন জীবন, এত উত্থানপতনের নাগরদোলা, সংখ্যায় বহু নেই। অনেকেই ওই গহীন পাতাললোক থেকে ফিরে আসতে পারতেন না, নিশ্চিত। তিনি পেরেছেন, মনের জোরে, জিতবেন বলেই। হেরে যাওয়ার পাত্র নন। স্বীকার করেন রবীন্দ্রসংগীত তাঁকে ছুঁয়ে ছিল। অমিত শাহ, একটু যদি সময় করে তাঁর কাছ থেকে রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে অন্তত দু’চার কলি জেনে নিতে পারতেন, ভালোই হত।

একবার এক আন্তরিক আলাপচারিতায়, সম্ভবত নবনীতা দেব সেনের স্মরণসভায়, চন্দ্রিল ভট্টাচার্য বলেছিলেন, নবনীতা দেব সেন এমন একজন, যিনি সম্ভবত বাংলা ভাষায় যে কোনও বিষয় নিয়েই স্বাদু গদ্য লিখতে পারতেন। বাংলার রাজনীতিতে এই একই কথা বলা চলে কুণাল ঘোষের সম্পর্কে। হেন বিষয় নেই, যা নিয়ে বক্তব্যে তিনি পটু নন। তাঁর চাঁদনি চকের অফিসে, দুপুরবেলার প্রেস মিটিংয়ে সাংবাদিকদের ভিড় বুঝিয়ে দেয় বঙ্গ টেলিভিশনের টিআরপি বাড়াতে তাঁর কতটা ভূমিকা। বিজেপি ভারত জুড়েই খাবারের ওপর বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের চেষ্টা করে চলেছে দীর্ঘকাল। আমিষ খাবার নিষিদ্ধ করা বিজেপির দীর্ঘকালীন টার্গেট। ‘বাঙালি’ সম্পর্কে অন্য রাজ্যে কিংবা বিদেশেও যদি কাউকে জানতে চাওয়া হয়, তাঁরা সম্ভবত তিনটি কথা বলবেনই। মাছ, রসগোল্লা এবং রবীন্দ্রনাথ। বাঙালির এই মৎসপ্রীতির অপরিহার্য দিকটি নিয়েও কুণাল ঘোষ লড়াই করে গিয়েছেন বিজেপির বিরুদ্ধে। বঙ্গের খাদ্যসংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। বারেবারেই বলেছেন, খাদ্যের গুণগত মান ছাড়া অন্য কোনও ব্যাপারে মাথা ঘামানোরই তো দরকার নেই! তিনি অবশ্য শুধুই ‘মেছো’ বাঙালি নন। কষা মাংসের প্রতি প্রবল চোরাটান তাঁর। মাসে অন্তত একবার অ্যালেনের চিংড়ির কাটলেট না খেলে তাঁর হজমের সমস্যা দেখা দেয়! বুঝতেই পারছেন, শরীরচর্চায় তাঁর মতি নেই, গতি আছে দু’পায়ে। চিকিৎসকের উপদেশে যে যে খাদ্য ব্ল্যাকলিস্টে, সাধারণত সেইসবই তো উপাদেয়– তিনি সেগুলোই দিব্যি সাঁটিয়ে সুস্থ আছেন। কারণ ১১ নম্বর বাসে তাঁর কোনও ক্লান্তি নেই।

কুণাল ঘোষ। সংক্ষেপে, ‘কেজি’। তিনি যে ওজনদার, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন রঙিন জীবন, এত উত্থানপতনের নাগরদোলা, সংখ্যায় বহু নেই। অনেকেই ওই গহীন পাতাললোক থেকে ফিরে আসতে পারতেন না, নিশ্চিত। তিনি পেরেছেন, মনের জোরে, জিতবেন বলেই। হেরে যাওয়ার পাত্র নন। স্বীকার করেন রবীন্দ্রসংগীত তাঁকে ছুঁয়ে ছিল। অমিত শাহ, একটু যদি সময় করে তাঁর কাছ থেকে রবীন্দ্রসংগীত সম্পর্কে অন্তত দু’চার কলি জেনে নিতে পারতেন, ভালোই হত। মাঝেসাঝেই, ছুটির দিনে, গলিঘুঁজিতে ব্যাট হাতে নেমে পড়েন। ডিফেন্স তাঁর চিরকালই কড়া। মাঠে ও রাজনীতির ময়দানে। সর্বোপরি, টেলিপাড়ার মতো একটা ট্রোলপাড়া হলে, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো তিনিও বলতে পারেন ‘আ-আ-মি ইন্ডাস্ট্রি’।

স্কিপারের ডিফেন্স তো কড়া হওয়াই বাধ্যতামূলক, তাই না?

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.