অভিরূপ দাস: বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়, অতিমারীর ছোবল, ভারত-চিন যুদ্ধের ভয় ছুঁতে পারেনি প্রজাপতিকে। মাস্ক ঝোলানো কানের ফুটো দিয়েই দিব্যি প্রবেশ করছে “যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।” ওয়েস্ট বেঙ্গল ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসের তথ্য অনুযায়ী গত ৮ থেকে ১৮ জুনের মধ্যে, অর্থাৎ দশ দিনে মালাবদলের সংখ্যা চোখ কপালে তোলার মতো। চার হাজার! শুধু এপ্রিল ও মে মাস যোগ করলে সংখ্যাটা পাঁচ হাজার সাতশো বাহান্ন! শুধু কি তাই। মে মাসে আরও ৩০১১টি আবেদন জমা পড়ে রয়েছে।
ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, লকডাউনের পরে অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন আর্থিক মন্দার কারণে হয়তো বিয়ের সংখ্যা কমে যাবে। কিন্তু কোথায়! বরং পাছে ফের লকডাউন হয়ে যায়, সে আতঙ্কে তড়িঘড়ি বিয়ে সারছেন অনেকেই। দেখা গিয়েছে যত বিয়ে হচ্ছে তার সিংহভাগই হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট এবং স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুসারে। লকডাউনের আগের মাসেও এত বিয়ে হয়নি বলে জানিয়েছেন ম্যারেজ অফিসার রাধাগোবিন্দ পাল।
ওয়েস্ট বেঙ্গল ম্যারেজ অফিসার অর্গানাইজেশনের কর্তা জয়ন্ত মিত্র বলেন, “লকডাউনের পর প্রথম দিকে কম হলেও এখন বিয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে জুন মাসে।” ২৫ মার্চ থেকে দেশজুড়ে শুরু লকডাউন ও সংক্রমণের কারণে সমস্ত ধরনের অনুষ্ঠানে রাশ টানা হয়। সামাজিক দূরত্বকেই করোনা ঠেকানোর দাওয়াই বলে জানান চিকিৎসকরা। প্রমাদ গোনেন পাত্র-পাত্রী উভয়পক্ষই। অগত্যা বিয়ের তারিখ বাতিল। অবশেষে জুনের প্রথম তারিখে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৮ জুন থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান হতে পারে। তবে নিমন্ত্রিতর তালিকা যেন ২৫ জনের বেশি না হয়। ওয়েস্ট বেঙ্গল ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের (West Bengal Marriage register) হিসাবে ৮ জুন থেকে ১৮ জুনের মধ্যে সরকারিভাবে স্বামী-স্ত্রী’র তালিকায় নাম তুলেছেন ৩৮১৯ জন।
[আরও পড়ুন: ‘হিংসা ছাড়া পৃথিবীতে কোনও দিন কোনও সমাধান হয়নি’, ফের উসকানি দিলীপের]
জুনের প্রথম সাতদিনে এই সংখ্যাটা ছিল ১৮৩৫। সদ্য বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ যুগলদের মধ্যে অনেকেই জানিয়েছেন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং তাঁদের পকেট বাঁচিয়ে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, “সরকারি নির্দেশে ঘনিষ্ঠ ২২ জনকে ডেকেই বিয়ে সারলাম। পকেটটা তো বাঁচল।” অনেক যুগল আবার ভয় পাচ্ছেন পুনরায় লকডাউনের। করোনার থেকেও বিরহ তাঁদের বেশি আঘাত করেছে। অতিমারীর শহরে দ্রুত লাল-নীল সংসার পাততে তর সইছে না!
চারহাত এক হলেও মধুচন্দ্রিমা আপাতত স্থগিত। দশ ফুট বাই দশ ফুটেই সময় কাটাচ্ছেন নতুন যুগল। বিপাকে পড়েছেন কার্ড ব্যবসায়ীরা। এঁদের সকলেই বিয়ের কার্ডের বরাত দিলেও আর সে কার্ড নেননি। এমনই হাজার হাজার কার্ড পড়ে রয়েছে এমজি রোডের একাধিক কার্ডের দোকানে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কেউ ২৫০ কেউ ৩০০ কার্ডের বরাত দিয়ে অগ্রিম দিয়ে গিয়েছিলেন। এখন অনেকেই ফোন করে বলছেন বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বানানো এই কার্ড নিয়ে আমরা কী করব? দোকানীদের গলায় হতাশা, শেষমেশ পুরনো কাগজের দোকানে ওজনদরে বিক্রিই লেখা রয়েছে বিয়ের কার্ডের কপালে।