‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’-র ‘জ্ঞানভাণ্ডার’ ভরাতে মুদ্রিত বই কেটে-ছিঁড়ে স্ক্যান করা হচ্ছে। তাতে ধ্বংস হচ্ছে লক্ষাধিক বই। প্রযুক্তিকে অতি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তা যদি মানব জাতির হাজার বছরের অর্জিত লিখিত সংস্কৃতির ধ্বংসের কারণ হয়, তবে সেই অগ্রগতি কতটুকু কল্যাণকর? লিখছেন জয়দীপ বিশ্বাস।
দেশে-বিদেশে প্রতি বছর উৎসবের মতো বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। ‘আসুন বই পড়ি’, ‘বইয়ের জন্য হঁাটুন’ ইত্যাদি ফেস্টুন, ফ্লেক্স নিয়ে বইয়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসায় মিছিল করে পাঠকের দল। জেলায় জেলায়, পাড়ায় পাড়ায়। উদ্দেশ্য, মানুষকে বইমুখো করা, পাঠক বাড়ানো, ডোডো পাখির মতো বইকে বিলুপ্ত হতে না দেওয়া। বইকে ভালবেসে কেউ কেউ বাড়িতে বইঘর গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য, বই নিয়ে নির্ভেজাল আড্ডা। আজকাল কফিশপে বই রাখা হয়। আশা, কৌতূহলী পড়ুয়া পাঠক কফির মাগে চুমুক দিতে দিতে বইয়ের সাদা পাতার উপরে কালো কালির অক্ষরমালায় ডুবে যাবেন! লাইব্রেরিগুলো র্যাকের পর র্যাক বই নিয়ে পাঠকের হাতের ছোঁয়ার জন্য অপেক্ষা করে।
রে ব্র্যাডবেরির বিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ‘ফারেনহাইট ৪৫১’-এ ফায়ারম্যানদের কাজ আগুন নেভানো নয়, বরং বই পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া!
বই নিয়ে মাতামাতি চলছে ঠিকই, কিন্তু আক্ষরিক অর্থে পাঠকের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। বই পড়ার অভ্যাস দিনে দিনে কমছে। এ কথা অনস্বীকার্য, বই পড়ার জন্য যে পরিমাণ মনঃসংযোগ, চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি এবং ধৈর্যর প্রয়োজন, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষের এসব গুণ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফল হচ্ছে মারাত্মক। সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, মানুষের চিন্তা ও কল্পনা করার মানসিক ক্ষমতাগুলো অলস হয়ে পড়ছে। অজান্তে, খেলাচ্ছলে প্রযুক্তি আমাদের মস্তিষ্কের কিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে মন্থর করে ফেলছে। আজকাল ভাবার অবকাশ নেই। গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। ফলে, মস্তিষ্কের যে অংশ ক্রিটিকাল থিংকিং বা জটিল চিন্তাভাবনা করে, সেই অংশের ব্যবহার কমে যাচ্ছে।
এখন যে কোনও প্রশ্ন বা সমস্যার মুখোমুখি হলেই মানুষ সরাসরি চ্যাটজিপিটি বা অন্য কোনও ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’-র মডেলের কাছে বা ফেলুদার সিধু জ্যাঠার মতো গুগ্লের কাছে সমাধান খোঁজে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে বসে বইয়ের পাতা ওল্টানোর দিন যেন অবসান! দিনে দিনে পাঠক মুদ্রিত বইয়ের জগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আর বইয়ের পাতা পোকায় কাটছে। আলফা প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা বইয়ের তুলনায় মোবাইলকেই বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে। মুদ্রিত বইয়ের প্রতি এই অনীহা অন্য এক ভুবনের জন্ম দিচ্ছে। সেই ভুবনে পাঠকের জন্য লিখিত বই, খাওয়ানো হচ্ছে মেশিনকে!
রে ব্র্যাডবেরির বিখ্যাত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস ‘ফারেনহাইট ৪৫১’-এ ফায়ারম্যানদের কাজ আগুন নেভানো নয়, বরং বই পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া! কল্পবিজ্ঞানের সেই ভয়ংকর রূপক একবিংশ শতাব্দীর ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (এআই) বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বিপ্লবের যুগে আরও নির্মম এক বাস্তব রূপ নিয়েছে। সিলিকন ভ্যালির আধুনিক এআই ল্যাব এবং প্রযুক্তি জায়ান্টরা নেমেছে চ্যাটজিপিটি, ‘ক্লড’-এর মতো এআই মডেলগুলিকে আরও ‘জ্ঞানী’ ও ‘চতুর’ করে তুলতে। কীভাবে সে কাজ করা হচ্ছে? প্রতিদিন তারা লক্ষ লক্ষ ছাপা দুষ্প্রাপ্য বই কিনছে। বইগুলোর বঁাধাই হাইড্রোলিক কাটিং মেশিনের মাধ্যমে কেটে পাতা আলাদা করা হচ্ছে। এরপর বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড স্ক্যানারের মধ্যে দিয়ে স্ক্যান করা হচ্ছে। ডিজিটাল ফাইলে তৈরি হচ্ছে ই-বুক।
ই পদ্ধতির পোশাকি নাম ‘ডেসট্রাকটিভ বা ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং’। স্ক্যান শেষে সেই কাটাকুটি হওয়া বইয়ের পাতাগুলোকে ফেলে দেওয়া হয় ডাস্টবিনে বা পাঠিয়ে দেওয়া হয় রিসাইক্লিং কারখানায় মণ্ড বানানোর জন্য। ‘এআই’ কোম্পানিগুলির কাছে বই হল শুধুই ‘কঁাচামাল’। অ্যানথ্রপিক তাদের ‘প্রোজেক্ট পানামা’-র অধীনে এই পদ্ধতিতেই লক্ষাধিক বই ধ্বংস করে তাদের ‘ক্লড’ মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। প্রযুক্তির বিশ্বে এই রক্তপাতহীন বই-হত্যার উৎসব ও মানব সভ্যতার লিখিত ঐতিহ্য ধ্বংসের এক গভীর ও উদ্বেগজনক চিত্রকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে জোর চর্চা চলছে।
পৃথিবীর সেরা এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণের ডেটা কোনও সার্ভারে নয়, লাইব্রেরির র্যাকে শান্ত হয়ে দঁাড়িয়ে থাকা বইগুলির ভিতরেই অপেক্ষা করছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইয়ের ডেটাবেস ‘আইএসবিএন’ জানিয়েছে, ‘এআই’-এর বৃহৎ ভাষা মডেল (লার্জ ল্যাঙ্গোয়েজ মডেল) যুগের আগে ছাপা বইগুলো গঠনগত ভাবেই আধুনিক ‘এআই’-এর দূষণ থেকে মুক্ত। আর এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা। পৃথিবীর সেরা এআই মডেলগুলোর প্রশিক্ষণের ডেটা কোনও সার্ভারে নয়, লাইব্রেরির র্যাকে শান্ত হয়ে দঁাড়িয়ে থাকা বইগুলির ভিতরেই অপেক্ষা করছে। ‘ডেসট্রাকটিভ স্ক্যানিং’-এর বিষয়টি
আমেরিকার ‘৪০৪ মিডিয়া’ সামনে এনেছে।
‘৪০৪ মিডিয়া’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন বইবিক্রেতা জানিয়েছেন, হঠাৎ করেই তঁার বইয়ের বিক্রি বেড়ে গিয়েছে। একটা সময় যেখানে সপ্তাহে ২০টি বইও বিক্রি হত না, সেখানে বিক্রির সংখ্যা রাতারাতি বেড়ে শতাধিক হয়ে গিয়েছে। ক্রেতারা সব বই নির্বিচারে কিনছেন।
বই কেনার ক্ষেত্রে দু’টি শর্ত আছে। বইগুলি মুদ্রিত হতে হবে এবং ‘আইএসবিএন’ নম্বর থাকতে হবে। এই ধরনের কেনা-বেচা আর্থিক দিক থেকে বইবিক্রেতার কাছে লাভজনক। কারণ দোকানের পুরনো ও দুর্লভ যেসব বইয়ের স্টক দীর্ঘ দিন অবিক্রিত অবস্থায় পড়েছিল, সেগুলো এবার বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে দুষ্প্রাপ্য ও বিরল বইগুলোর শেষ পরিণতি বড়ই করুণ। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের মতো কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলার নথি থেকে জানা গিয়েছে যে, প্রযুক্তি সংস্থাগুলো বৃহৎ ভাষা মডেলের জন্য নিজস্ব প্রশিক্ষণ ডেটাসেট তৈরি করতে লক্ষ লক্ষ বই কিনে সেগুলিকে ধ্বংসাত্মকভাবে স্ক্যান করছে।
শুধু আমেরিকাই নয়, নেদারল্যান্ডস-সহ ইউরোপের বিভিন্ন দুর্লভ বইয়ের বাজারেও এভাবেই হাজার হাজার বিরল, আউট-অফ-প্রিন্ট বই এক লপ্তে বিক্রিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, পৃথিবীর অনেক বিরল ও প্রাচীন বইয়ের শেষ কপিগুলোও চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
একটি বই কেবলমাত্র কিছু হরফ বা ডেটা-র সমষ্টি নয়। একটি বইয়ের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস এবং মানবস্পর্শ।
সেই শূন্যস্থান পূরণে ই-বুক, অডিও বুক, অনলাইন লাইব্রেরি, ইন্টারনেট আর্কাইভ ইত্যাদি সদর্থক ভূমিকা নিচ্ছে। মুদ্রিত বইয়ের কপিরাইটের ব্যাপারটা যেন গৌণ হয়ে পড়েছে।
‘এআই’ ল্যাবগুলির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল– ডেটার অভাব এবং ইন্টারনেট জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তথ্য-দূষণ। গত কয়েক বছরে জেনারেটিভ এআই-এর তৈরি করা ভুয়া, নিম্নমানের এবং পুনরাবৃত্তিমূলক লেখায় ইন্টারনেট ছেয়ে গিয়েছে। যদি এআই মডেলগুলোকে এইসব ‘এআই’-সৃষ্ট ডিজিটাল আবর্জনা (‘এআই স্লপ’) দিয়েই আবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাহলে সেই মডেলগুলো প্রতিযোগিতার বাজারে টিকবে না। আর সেই কারণেই, ‘এআই’ কোম্পানিগুলির কাছে এখন সোনার চেয়েও মূল্যবান হল– মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত ডেটা, যা এখনও‘এআই’-এর ছোঁয়া পায়নি।
একটি বই কেবলমাত্র কিছু হরফ বা ডেটা-র সমষ্টি নয়। একটি বইয়ের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস এবং মানবস্পর্শ। ঐতিহ্যবাহী লাইব্রেরিয়ান ও আর্কাইভ-বিদরা বছরের পর বছর ধরে ধুলো ঝেড়ে অতি যত্নে, বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করে বইয়ের পৃষ্ঠা না ছিঁড়ে দুষ্প্রাপ্য বইগুলোকে ডিজিটাল রূপ দিয়ে আসছেন। ইতিহাসবিদ এবং দুর্লভ বই ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, পাইকারি ক্রয় অভিযানের ফলে দুষ্প্রাপ্য, অপ্রচলিত বা একক ঐতিহাসিক সংস্করণগুলো হয়তো চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
প্রযুক্তিকে অতি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সেখানে সময় বঁাচানো আর খরচের অঙ্ক মেলানোটাই শেষ কথা। এআই কোম্পানিগুলোর কাছে একটি বিরল বই কেবল কয়েক গিগাবাইটের ডিজিটাল ফাইলের সমতুল্য। তাই প্রয়োজন ফুরলেই মূল বইটিকে নির্দ্বিধায় ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা যায়!
‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’, যাকে আমরা ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন বলছি, তা যদি মানব জাতির হাজার বছরের অর্জিত লিখিত সংস্কৃতির ধ্বংসের কারণ হয়, তবে সেই অগ্রগতি কতটুকু কল্যাণকর? এ প্রশ্নই এখন বিশ্বজুড়ে সচেতন মহলকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
ভোররাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল পুলিশ! গ্রেপ্তার পিংলার প্রাক্তন বিধায়ক অজিত মাইতি
-
দু’বছরের জন্য নয়া টাইটেল স্পনসর পেল বিসিসিআই, ম্যাচপ্রতি বিপুল অঙ্কে চূড়ান্ত চুক্তি
-
সাতসকালে জলপাইগুড়িতে হাড়হিম কাণ্ড! বেকারিতে ঢুকে ম্যানেজারকে ‘খুন’, কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা
-
কোমলের সঙ্গে গণপতি দর্শনে তুমুল বিতর্ক, করিশ্মা-রবীনা প্রসঙ্গ টেনে কী যুক্তি গোবিন্দার?
-
সরকারে আসা মানেই কাজ শেষ নয়, বঙ্গ বিজেপিকে সব অংশে যোগাযোগ বৃদ্ধির বার্তা সংঘের