সম্প্রতি, রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ফুটপাতে দেখলেন: এক গৃহহীন মা তার শিশুর জন্য স্টোভজ্বালিয়ে দুধ গরম করছে। এবং মুহূর্তে ফেটে পড়লেন ক্রোধে: কী অর্বাচীন আস্পর্ধা এই মায়ের, পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে স্টোভ জ্বালিয়ে দুধ গরম! যদি অ্যাক্সিডেন্ট হয়, তার দায়িত্ব নেবে কে? গভীর লজ্জায় মন্ত্রীর মনে এই মানবিক প্রশ্ন প্রথমেই কেন ধাক্কা দিল না, স্বাধীনতার বহু বছর পরেও কেন একজন চালচুলোহীন মা কলকাতার ফুটপাতে বাচ্চার জন্য দুধ গরম করতে বাধ্য হচ্ছে? কেন ওই বাচ্চা ফুটপাতেই পেটে এসেছে? জন্মেছে? বড় হবে?
এরকম লক্ষ-লক্ষ মা রয়েছে কলকাতার ফুটপাতে প্লাস্টিক ছাউনির তলায় তাদের চিরবিপন্ন সংসার পেতে, কেননা কলকাতায় মাথার উপর ছাদের ন্যূনতম ভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। কলকাতায় ফুটপাতবাসীদের সংখ্যা এখন লক্ষাধিক। শেষ আদমশুমারি হয়েছিল ২০১১ সালে। তখনই কলকাতার ফুটপাতে জীবনযাপন করা মানুষের সংখ্যা ছিল ৭০ হাজারের বেশি। এই ঠিকানাহীন হাজার হাজার শিশুর দায়িত্ব নেবে কে?
গৃহহীনতার মতো স্পর্শকাতর সামাজিক সমস্যার প্রতি প্রয়োজন বিনীত, নম্র আচরণ এবং মানবিক ও মাঙ্গলিক দৃষ্টিভঙ্গি।
একবার পিছন ফিরে তাকানো যাক। কলকাতায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন। কলকাতা তখন ভারতের রাজধানী এবং বাণিজ্যকেন্দ্র। গ্রাম থেকে হাজার-হাজার দরিদ্র মানুষ চলে এল কলকাতায় কিছু রুজি-রোজগারের ধান্ধায়। এবং শহরের বারান্দার তলায় পথের ধারে ঠাঁই নিল। ঝড়-জল, শীত-গ্রীষ্ম- সব সহ্য করে শুধুমাত্র টিকে থাকার করুণ চেষ্টায়। সেই শুরু কলকাতার ফুটপাতবাসীদের ইতিহাস। ১৭৫৮ সালে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণের সময় ঔপনিবেশিক সভ্যতার অঙ্গ হিসাবেই হয়তো এরা চিহ্নিত হল ‘পেভমেন্ট ডোয়েলার্স’ নামে। সেই থেকে কলকাতার ফুটপাতে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। এবং আমাদের মানবিকতা চোখ বন্ধ করে থেকেছে।
দেশভাগ এবং বাংলাদেশের ‘মুক্তিযুদ্ধ’- এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনার অভিঘাত বিপুল সংখ্যক শরণার্থী পাঠাল কলকাতায় এবং তাদের অধিকাংশের ঠাঁই হল ফুটপাত। কলকাতার ফুটপাতের জনমিতি গেল আরও বদলে। ১৯৯৬ সালে এক অর্বাচীন প্রচেষ্টা হল কলকাতার ফুটপাতবাসী উচ্ছেদের। মনে করা হয় তাহলেই বুঝি সূর্যোদয় হবে শহরে প্রচেষ্টার নাম দেওয়া হল, ‘অপারেশন সানশাইন’। কিন্তু ফোঁপরা প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ল। বোঝা গেল, উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া অমানবিক উচ্ছেদ সম্ভব নয়।
গৃহহীনতার মতো স্পর্শকাতর সামাজিক সমস্যার প্রতি প্রয়োজন বিনীত, নম্র আচরণ এবং মানবিক ও মাঙ্গলিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাতারাতি কলকাতার ফুটপাতবাসীদের উপযুক্ত পুনর্বাসন সম্ভব নয়। সুতরাং আপাতত চমকধমক গুটিয়ে সঠিক প্ল্যান অনুসারে শহরের ফুটপাতে দুঃসহ কষ্ট ও বিপন্নতার মধ্যে পড়ে থাকা মানুষকে সামান্যতম আশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করা এই মুহূর্ত একান্ত কর্তব্য। সে প্রচেষ্টা সফল হলে বলা যেতে পারে কলকাতায় সূর্যোদয়ের প্রথম আলোকরেখা দৃশ্য হল।
সর্বশেষ খবর
-
সাংবিধানিক সংকট! বন্দে মাতরমে সরাসরি কেন্দ্রের সঙ্গে সংঘাত, দুই স্তবকই গাইবে কর্নাটকের কংগ্রেস সরকার
-
সিআইএ-র সতর্কবার্তা শোনেননি, নেতানিয়াহুর টোপ গিলেই ইরানে জোর ফেঁসেছেন ট্রাম্প!
-
বিশ্বজুড়ে বন্ধ মার্কিন ভিসা ইন্টারভিউ, ট্রাম্পের কড়া অভিবাসন নীতির জের?
-
আড়াই বছরের ‘রাজত্ব’ খোয়ালেন বুমরাহ, শ্রীলঙ্কায় আগ্রাসী ইনিংসের পুরস্কার পেলেন পন্থ
-
লক্ষ লক্ষ টাকার সোনার গয়না ট্রেনে ফেলেই নেমে গেলেন যাত্রী, তারপর?