চুল কাটা শেষ। এবার ঘাড়ে মালিশ। তারপর দু’দিকে আচমকা ঘুরিয়ে দেওয়া হল মাথা। ‘মটমট’ শব্দে যেন মিলল আরামের শেষ ছোঁয়া। সেলুনে এই দৃশ্য বহু মানুষের কাছেই পরিচিত। কেউ নিজেই চান, কেউ আবার নিয়মের মতোই নিয়ে নেন এই ‘ম্যাসাজ’ (Neck Massage Side Effects)।
কিন্তু ঘাড়ের ওই কয়েক সেকেন্ডের ঝাঁকুনিই কখনও কখনও ডেকে আনতে পারে ভয়ংকর বিপদ। ঘাড়ের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালীতে সমস্যা থেকে শুরু করে স্ট্রোক, স্নায়ুর ক্ষতি, এমনকী পক্ষাঘাতও হতে পারে! বিরল ক্ষেত্রে প্রাণসংশয়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরও পড়ুন:
নেই কোনও ভিত্তি
নিউরোসার্জনদের কথায়, মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চুল কাটা বা দাড়ি কামানোর শেষে ঘাড় মটকানো এখন প্রায় একটি রীতিতে পরিণত হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য আরাম বা স্ট্রেস কমানো। ঘাড় মটকানোর সময় ‘মটমট’ শব্দটিও অনেকের কাছে বেশ তৃপ্তিদায়ক মনে হয়।
আরও পড়ুন:
কিন্তু এই অভ্যাসের পিছনে কোনও চিকিৎসাগত প্রয়োজন নেই। বরং সমস্যা হল, ঘাড়ের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির গঠন ও ঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ না থাকায় ভুল কায়দায় অতিরিক্ত জোর প্রয়োগ হয়ে যেতে পারে।
প্রশিক্ষিত ফিজিওথেরাপিস্ট কোনও রোগীর ঘাড়ে নির্দিষ্ট ধরনের নড়াচড়া করার আগে তাঁর বয়স, শারীরিক অবস্থা, মেরুদণ্ডের সমস্যা এবং অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করেন। কিন্তু যিনি চুল কাটছেন, তার পক্ষে সেই চিকিৎসাগত মূল্যায়নের সুযোগ থাকে না।

ছিঁড়ে যেতে পারে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেওয়া ধমনি
ঘাড়ের দু’পাশে রয়েছে ভার্টিব্রাল ধমনি। এই গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালীগুলি ঘাড়ের হাড়ের মধ্য দিয়ে উঠে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেয়। আচমকা এবং জোরে ঘাড় ঘোরালে বিরল ক্ষেত্রে ধমনির দেওয়ালে ক্ষত তৈরি হতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘আর্টেরিয়াল ডিসেকশন’।
রক্তনালীর দেওয়ালের মধ্যে রক্ত জমে সেখানে জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্তপ্রবাহ আটকে দিলে বা মস্তিষ্কের দিকে চলে গেলে হতে পারে ইসকেমিক স্ট্রোক। বিপদের আরেকটি দিক হল, আঘাত লাগার সঙ্গে সঙ্গেই সবসময় উপসর্গ দেখা নাও দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পরেও সমস্যা শুরু হতে পারে।
স্নায়ুর ক্ষতি হলে থমকে যেতে পারে শরীর
ঘাড়ের মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে নেমে গিয়েছে স্নায়ুরজ্জু। শরীরের নড়াচড়া ও অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু এখান থেকে বেরিয়েছে। তাই ঘাড়ে আচমকা, ভুল বা অতিরিক্ত জোরে নড়াচড়া হলে স্নায়ুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে ফ্রেনিক স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে শ্বাস নেওয়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ডায়াফ্রাম দুর্বল বা অচল হয়ে যেতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রয়োজন হতে পারে।
আবার কারও ঘাড়ে আগে থেকেই ডিস্কের সমস্যা, হাড়ের ক্ষয় বা মেরুদণ্ডে কোনও সমস্যা থাকলে আচমকা মোচড়ে সেই সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। হাত-পায়ে অসাড়তা, দুর্বলতা বা গুরুতর ক্ষেত্রে পক্ষাঘাতও দেখা দিতে পারে।

‘মটমট’ শব্দটা আরামের নিশ্চয়তা নয়
ঘাড় মটকানোর সময় শব্দ হওয়াকে অনেকেই মনে করেন, বুঝি জমে থাকা ‘টান’ বেরিয়ে গেল। কিন্তু শব্দ হওয়া মানেই যে ঘাড়ের জন্য উপকারী কিছু ঘটছে, এমন নয়। জোর করে বারবার ঘাড় ঘোরালে ঘাড়ের জোড় ও লিগামেন্টে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অভ্যাসে ঘাড়ে ব্যথা, পেশিতে টান এবং সন্ধিস্থলের অস্থিরতার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
যুবকের স্ট্রোক
সম্প্রতি এক যুবক ঘাড় মটকানোর পর মৃদু স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। প্রাণে বেঁচে গেলেও বর্তমানে তিনি কিছু স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছেন। ঘাড়ে আচমকা জোর প্রয়োগে ভার্টিব্রাল ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ফল মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে প্রবীণদের ঘাড়ের হাড় তুলনামূলক দুর্বল থাকায় আঘাতে হাড়ে চিড় বা ভাঙার আশঙ্কাও থাকে।

এই লক্ষণ দেখলেই হাসপাতালে
ঘাড় মটকানোর পর হঠাৎ মুখ বা শরীরের একদিকে অসাড়তা বা দুর্বলতা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা, বিভ্রান্তি, আচমকা মাথা ঘোরা, হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে সমস্যা, দৃষ্টিতে সমস্য়া, হঠাৎ প্রচণ্ড মাথাব্যথা বা তীব্র ঘাড়ের ব্যথা হলে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ‘একটু পরে ঠিক হয়ে যাবে’ ভেবে শুয়ে থাকা বা নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়া ঠিক নয়। এমনকী উপসর্গ খুব সামান্য হলেও, যেমন দীর্ঘক্ষণ মাথা ঘোরা বা কথায় সামান্য পরিবর্তন, একই দিনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ ধমনির ক্ষতির ক্ষেত্রে প্রথম দিকের উপসর্গ মৃদু হলেও পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতি গুরুতর হতে পারে।
চুল কাটা, দাড়ি কামানো, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া পর্যন্তই থাকুক নাপিতের কাজ। ঘাড়ের ভিতরে রয়েছে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেওয়া ধমনি, স্নায়ু এবং স্নায়ুরজ্জুর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। কয়েক সেকেন্ডের ‘আরাম’-এর জন্য সেগুলিকে অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে ফেলার প্রয়োজন কি সত্যিই আছে?
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
দুধের তৈরি না হলে বলা যাবে না ‘পনির’, ভেজালের রমরমা রুখতে কড়া নিয়মের পথে কেন্দ্র
-
পুজোয় বাঙালির পাতে পড়বে না পদ্মার ইলিশ! রুপোলি শস্য রপ্তানিতে মেলেনি ছাড়পত্র
-
SIR-এ বাদ, ট্রাইব্যুনালেও ওঠেনি নাম, হতাশায় চরম সিদ্ধান্ত কালনার যুবকের!
-
নাম জড়ায় ভূপেশ বাঘেল, রণবীর কাপুরদের! গ্রেপ্তার সেই মহাদেব বেটিং অ্যাপের কিংপিং
-
নেতাজি ও বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর সম্পর্ক, ফৈজাবাদের রহস্যময় সেই সাংকেতিক চিঠি