দেখতে দেখতে ৫০০০ ওয়ানডের সাক্ষী বিশ্ব, ইতিহাসের সেরা এই একদিনের ম্যাচগুলির কথা মনে আছে?
পুরুষদের আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে শুক্রবার লেখা হল নতুন ইতিহাস।
সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়া জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয় সবাইকে। ক্রিকেটও এর ব্যতিক্রম নয়। ওয়ানডে ক্রিকেটেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। সাদা পোশাকের জায়গায় এসেছে রঙিন জার্সি। লাল বলের বদলে সাদা বল। দিনের ম্যাচের বদলে এখন হয় দিন-রাতের ম্যাচও। এত পরিবর্তনের পরও ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রতি আবেগ এতটুকু কমেনি।
আরও পড়ুন:
ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রথম ম্যাচ হয়েছিল ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি, মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে। বৃষ্টিতে টেস্ট ভেস্তে যাওয়ার পর ৪০ ওভারের পরীক্ষামূলক সেই ম্যাচই নতুন যুগের সূচনা করেছিল। ১০০০তম ওয়ানডে হয়েছিল ১৯৯৫ সালে নটিংহ্যামে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের মধ্যে। সেই সময় ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শিখরে। বিশ্বকাপের উত্তেজনাও তখন এই ফরম্যাটকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
২০০৩ সালে শারজায় পাকিস্তান ও জিম্বাবোয়ের ম্যাচ ছিল ইতিহাসের ২০০০তম ওয়ানডে। তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ৫০ ওভারের এই ফরম্যাট। বড় কোনও সিরিজ মানেই ছিল ওয়ানডের লড়াই। ২০১০ সালে সাউদাম্পটনে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ম্যাচের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় ৩০০০তম ওয়ানডে। সে সময় টি-টোয়েন্টির জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলেও ওয়ানডের গুরুত্ব কমেনি। বরং দুই ফরম্যাটের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই এগিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট।
২০১৮ সালে হারারেতে হংকং ও পাপুয়া নিউগিনির ম্যাচ ছিল ইতিহাসের ৪০০০তম ওয়ানডে। এতে বোঝা যায়, ওয়ানডে ক্রিকেটের উন্নতিতে শুধু বড় দল নয়, সহযোগী দেশগুলোরও অবদান রয়েছে। আর শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ৫০০০তম ওয়ানডে খেলতে নামে আয়ারল্যান্ড বনাম আফগানিস্তান। আইসিসি পুরুষ ক্রিকেট বিশ্বকাপ লিগ-২-এর এই ম্যাচ তাই শুধু একটি পরিসংখ্যানের মাইলফলক নয়, নতুন দেশগুলির উঠে আসারও গল্প লেখে।
আরও পড়ুন:
দীর্ঘ এই যাত্রাপথে পিছনে ফিরে তাকালে আপনাকে স্মৃতিমেদুর করবে অনেক ম্যাচ। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের কথাই ধরা যাক। ১৭ জুন বার্মিংহামের এজবাস্টনে মুখোমুখি হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। শেষ চারের ওই দ্বৈরথ ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ম্যাচ। প্রথমে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া ২১৩ রান করে। জবাবে প্রোটিয়ারাও থামে ২১৩ রানে। সুপার সিক্স পর্বে এগিয়ে থাকার সুবাদে অস্ট্রেলিয়া ফাইনালে ওঠে।
শেন ওয়ার্নের ২৯ রানে ৪ উইকেট এখনও অনেকের চোখের সামনে ভাসে। ম্যাচের সেরাও তিনি হয়েছিলেন। স্টিভ ওয়া ও মাইকেল বিভানের পার্টনারশিপের কথাও অনেকে ভুলবেন না নিশ্চিত। ল্যান্স ক্লুজনারের বিধ্বংসী ব্যাটিং দক্ষিণ আফ্রিকাকে জয়ের খুব কাছে নিয়ে যায়। শেষ ওভারে জয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার ৯ রান প্রয়োজন ছিল। প্রোটিয়া অলরাউন্ডার প্রথম দু'বলে দু'টি চার মেরে সমতা ফেরান। চতুর্থ বলে রান নিতে গিয়ে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট...
২০০২ সালের ১৩ জুলাই। ইতিহাস গড়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভারত। ৩২৬ রান তাড়া করে জয়ের মঞ্চ গড়া ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণে অনেকেই এখনও ডুব দেন। অধিনায়ক নাসের হুসেনের সেঞ্চুরিতে ৩২৫ রানের পাহাড় গড়ে ইংল্যান্ড। জবাবে বীরেন্দ্র শেহওয়াগ ও সৌরভের যুগলবন্দিতে মাত্র ১৫ ওভারেই ১০৬ রান উঠে যায়। কিন্তু মাঝের ওভারগুলিতে চাপে পড়ে টিম ইন্ডিয়া।
শেষ পর্যন্ত ১২১ রানের দুরন্ত পার্টনারশিপ গড়ে ভারতকে ম্যাচে ফিরিয়ে আনেন যুবরাজ-কাইফের জুটি। তিন বল বাকি থাকতেই ম্যাচ জিতে যায় ভারত। তারপরেই বাঙালির গর্বের সেই মুহূর্ত-লর্ডসের ব্যালকনিতে জার্সি ওড়াচ্ছেন প্রিন্স অফ ক্যালকাটা। ফাইনাল ম্যাচে মাত্র ৭৫ বলে ৮৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন কাইফ। ৬৩ বলে ৬৯ রান করে জয়ের মঞ্চ গড়ে দিয়েছিলেন অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং।
কে ভুলতে পারে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ৪৩৪ রান তাড়া করে দক্ষিণ আফ্রিকার জেতা? ২০০৬ সালের ১২ মার্চ জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়ার রানের এভারেস্ট টপকেছিল প্রোটিয়ারা, তাও আবার ১ বল বাকি থাকতে। অজি অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের ১৬৪ রানের জবাব দিয়েছিলেন হার্শেল গিবস। করেছিলেন বিধ্বংসী ১৭৫। গ্রেম স্মিথ ৯০, মার্ক বাউচারের অপরাজিত ৫০ রান সমানভাবে স্মরণীয়। সর্বোচ্চ রান তাড়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
ক্রিকেটের 'চেজ মাস্টার' কে? সকলেই বিরাট কোহলির নাম করবেন। ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি হোবার্টে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে কমনওয়েলথ ব্যাঙ্ক সিরিজে ৮৬ বলে অপরাজিত ১৩৩ রানের 'কালজয়ী' ইনিংস খেলেছিলেন ২৩ বছরের কোহলি। হাঁকিয়েছিলেন ১৬টি চার ও ২টি ছক্কা। ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের সৌজন্যে ৩২১ রান তাড়া করে জেতে ভারত। মনে রাখতে হবে, বিপক্ষ ছিলেন লাসিথ মালিঙ্গার মতো বোলার। তখন থেকেই চেজমাস্টারের তকমা পান কোহলি।
সঙ্গে যোগ হয়েছে ২০১৫ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে গ্র্যান্ট এলিয়টের ছক্কায় নিউজিল্যান্ডের নাটকীয় জয়। ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের সুপার ওভারের রোমাঞ্চ। ২০২৩ বিশ্বকাপে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অবিশ্বাস্য ডবল সেঞ্চুরি। আর ১৯৮৩ বিশ্বকাপে কপিল দেবের অপরাজিত ১৭৫ রানের ইনিংস ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসই বদলে দিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে শচীনের 'মরুঝড়'ও অবিস্মরণীয়। বালুঝড়ের কারণে খেলা বন্ধ থাকার পর লিটল মাস্টারের ১৩১ বলে ১৪৩ রানের ইনিংস ভারতকে ফাইনালে তুলেছিল।