ঝালমুড়ি, গঙ্গাভ্রমণ থেকে ‘শক্তি’ স্মরণ, ছাব্বিশে বঙ্গজয়ের লক্ষ্যে আর কোন ছক ভাঙলেন মোদি?
বাঙালি হওয়ার মরিয়া চেষ্টা বিজেপির। ২০১৪ থেকে ২০২১-এর সব ছকই এবার ভাঙছেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও পড়ুন:
অন্যান্য রাজ্যের ভোটে দেখা গিয়েছে কখনও তিনি ভোটের মুখে নর্মদায় নেমে স্পিড বোটে ঘুরছেন। কখনও দেখা গিয়েছে ভোটার কয়েক মাস আগে আচমকা তিনি জঙ্গলে গিয়ে বিখ্যাত প্রেজেন্টারের সঙ্গে টেলিভিশন শো করছেন। কখনও তাঁকে দেখা গিয়েছে ভোটের মুখে বিখ্যাত অভিনেতাকে ডেকে তাঁর সঙ্গে ইন্টারভিউতে 'আম' খাওয়া নিয়ে আলোচনা করছেন।
ভোটের মুখে তাঁর ধ্যানে বসে যাওয়া নিয়ে সমালোচনা বিতর্কও হয়েছে অতীতে। নিন্দুকেরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এসব কৌশল নিতান্তই স্ক্রিন ক্যাপচারের জন্য। আসলে ভোটের আগে আগে স্রেফ তথাকথিত জনসভা বা রোড শো করলে সমস্ত দলের ভোটপ্রচারের মাঝে যতটা শিরোনাম পায় বা স্ক্রিন টাইম পায়, সেটার চেয়ে অনেক বেশি স্ক্রিন টাইম পায় এই ধরনের অফবিট প্রচার।
বাংলার ভোটের ক্ষেত্রে অবশ্য এভাবে ছকভাঙা প্রচার খুব বেশি দেখা যায়নি প্রধানমন্ত্রীর। এতদিন জনসভা, রোড-শোতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য ছিলেন। দিল্লি থেকে আসতেন, সভা করতেন, বড়জোর রোড শো করতেন, চলে যেতেন। তাতে বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্মকরণের বেশি সুযোগ ছিল না। তৃণমূল যে এতদিন তাঁকে 'বহিরাগত' বলে আসছে, সেই প্রচার ভাঙার কোনও চেষ্টা দেখা যেত না।
আরও পড়ুন:
কিন্তু ছাব্বিশে সেই চেষ্টাটা পুরোদস্তুর শুরু করেছেন মোদি। পশ্চিমবঙ্গে এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাঙালি অস্মিতা’কে হাতিয়ার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের কোনও বিরোধ নেই, সেই বার্তা দিতে মরিয়া বিজেপিও। সেই কৌশলেরই অঙ্গ হিসেবে এবার রামনাম ছেড়ে আওড়াচ্ছে দুর্গা-কালী। আবার বাঙালিয়ানার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে মোদি কখনও ঝালমুড়ি খাচ্ছেন, কখনও বা খাচ্ছেন গঙ্গার হাওয়া।
কিছু দিন আগে রাজ্যে প্রচারে এসে ঝাড়গ্রামের সভার পর রাস্তার ধারের দোকান থেকে ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। পকেট থেকে ১০ টাকার নোট বার করে দোকানির হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ঝালমুড়ি খেতে খেতে দোকানির সঙ্গে এবং আশপাশের লোকজনের সঙ্গে কথাবর্তা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কারও কারও হাতে ঝালমুড়ি ঢেলেও দিয়েছিলেন। যা নিয়ে পরে ব্যাপক প্রচার করে গেরুয়া শিবির। সোশাল মিডিয়ার ট্রেন্ডেও উঠে আসে ঝালমুড়ি।
পরে মোদির সেই ‘ঝালমুড়ি পে চর্চা’ নিয়ে বারবার কটাক্ষ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ করেছিলেন, গোটা বিষয়টি সাজানো। আগে থেকে ওই দোকানে কীভাবে ক্যামেরা লাগানো থাকল, কীভাবে মাইক ‘সেট’ করা থাকল, প্রশ্ন তুলেছিলেন মমতা। এমনকী প্রধানমন্ত্রীর পকেটে ১০ টাকার নোট কোত্থেকে এল, সেটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। পালটা মোদি আবার কটাক্ষ করে বলেন, "ঝালমুড়ি আমি খেলাম। ওদের কেন ঝাল লাগছে?"
দিন দুয়েক যেতে না যেতেই আবার অন্য 'স্টান্ট'। এবার তিনি গ্রীষ্মের সকালে সাল গায়ে চাপিয়ে গঙ্গার ঘাটে হাওয়া খেতে বেরোলেন। যেমন বাঙালি ভদ্রলোকেরা বেরন। গত শুক্রবার সকালে গঙ্গায় নৌকাবিহারের একাধিক ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন তিনি। ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, নৌকায় বসে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পিছনে দেখা যাচ্ছে হাওড়া এবং বিদ্যাসাগর সেতু।
এই দুই স্টান্টের মাঝে আবার প্রধানমন্ত্রী ঘুরে গিয়েছেন বেলুড় মঠে। রাজ্যের প্রথম দফার ভোটের দিনই তিনি চলে যান বেলুড়ে। পরে এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, 'যে খানে স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যান করতেন, আজ সেখানে যেতে পেরে আমি অভিভূত।” বারবার বাংলার মনীষীদের নাম-বিভ্রাটের মাঝে বস্তুত সবটাই স্ক্রিন ক্যাপচার এবং বাঙালিয়ানা দেখানোর চেষ্টা, বলছে বিরোধীরা।
এর পর পালা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। প্রধানমন্ত্রীর হাতে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি উপহার হিসেবে তুলে দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। পানিহাটির ‘বিজয় সংকল্প সভা’য় প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর সময়ে শমীক তাঁর হাতে শক্তির ছবি তুলে দেন। এর আগে রাজ্যে মোদির সভামঞ্চে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি উপহার দিয়েছিলেন শমীক। রবিবার প্রধানমন্ত্রীর রোড শোয়ের মাঝে আবার সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়ের আঁকা মহানায়ক উত্তমকুমারের ছবি তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে।
ছক ভাঙা এই প্রচারের ধারাটা আগেই শুরু করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গে জনসভায় এসে সাধারণ বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে একটি রিল পোস্ট করাটাও বেশ অভিনব ছিল। সেটা অবশ্য পুরোপুরি দলের কর্মীদের চাঙ্গা করার চেষ্টা হিসাবেই দেখছিল রাজনৈতিক মহল। তারপরই বাঙালি হওয়ার চেষ্টার শুরু। আগামী দেড়-দু'দিনে প্রধানমন্ত্রী প্রচারে আরও কোনও অভিনবত্ব আনেন কিনা সেটাই দেখার।