BREAKING NEWS

২৯ শ্রাবণ  ১৪২৭  শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০ 

Advertisement

ক্রিকেটের আদিমতম সভ্যতাতে কোহলি-বুমরাহদের বন্দনা

Published by: Sulaya Singha |    Posted: July 5, 2019 4:43 pm|    Updated: July 5, 2019 4:43 pm

An Images

গৌতম ভট্টাচার্য, হ্যাম্বলডন: ওয়াই ফাই পাসওয়ার্ড? চেয়ে লাভ নেই। বৃষ্টিতে আশেপাশের গাছ পড়ে যাওয়ায় কেবল লাইন নষ্ট হয়ে গিয়েছে দিন পনেরো ধরে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট? নেই। নিজেকে গাড়ি জোগাড় করে আসতে হবে। কাছাকাছি রেলওয়ে স্টেশন? পিটার্সফিল্ড। পনেরো মাইল দূরে। লেভেল ক্রসিং বন্ধ থাকলে সেটা আরও দূর মনে হবে। এলাকার হোটেল-টোটেল? কিছু তো চোখে পড়ল না। পুরোটাই ধু ধু মাঠ। তাঁবু আর সরাইখানা ছাড়া কোনও স্থাপত্যের খোঁজ নেই।

বোলপুর পেরিয়ে ভেদুয়ার কোনও গ্রামের ভেতরে ঢুকছি না লন্ডন থেকে দেড়ঘণ্টা দূরত্বে এসছি? ভরদুপুরেও গুলিয়ে যেতে বাধ্য। ওয়েলকাম টু হ্যাম্বলডন! পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট সভ্যতায়। যেখানে বিশ্বকাপ শুরুর চার মাস আগে আইসিসি বিশ্বকাপ ঘুরিয়ে গিয়েছিল। মহালয়া না করে সপ্তমী-অষ্টমীর পুজো কী করে করত!

নামটা চট করে শুনলে মনে হয় উইম্বলডন। বরিস বেকারের বাড়ির কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে উইম্বলডনের কোর্টগুলো এখন এত খবরে যে শুনলে আরওই মনে হবে। কিন্তু না এটা হ্যাম্বলডন। এর আলাদা করে কোনও সিজন নেই যে হঠাৎ করে লোকে ভিড় করবে। ক্রিকেটের রোম্যান্টিক অনুরাগী বা ইতিহাসবিদ ছাড়া কারও ইংল্যান্ডের এই গ্রাম সম্পর্কে কোনও আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। লিডসে বৃহস্পতিবার গল্ফ কোর্সের মধ্যে বিশালাকার রিসর্টে পুরো ছুটি কাটানো ভারতীয় দলের একজনকেও জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবেন বলে মনে হয় না।

অথচ হ্যাম্বলডন ক্রিকেটের সবচেয়ে রোম্যান্টিক কাহিনি। ক্রিকেটের অকৃত্রিম সত্যযুগ। এখানেই যে খেলাটার সৃষ্টি এবং প্রথম বেড়ে ওঠা। ১৭৫০-১৭৮৭ এই সাঁইত্রিশ বছর হ্যাম্বলডনের সঙ্গেই কাটিয়েছে ক্রিকেট সভ্যতা। কাজেই পুঁচকে গ্রামটাতেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, তারপর একটা সময় লর্ডসের হাইস্কুলে চলে যাওয়া। হ্যাম্বলডন ক্রিকেট মাঠের সেটিংটা অদ্ভুতরকম। যে কোনও ফিল্ম পরিচালক এখুনি এলে শুটিংয়ের জন্য ভাড়া চাইবেন। আর বিয়েবাড়ি থেকে শুটিং- সবকিছুর জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট মাঠের যে জীবিকা নির্বাহের জন্য পাউন্ডের দরকার। রেলওয়ে স্টেশন থেকে গাড়ি করে এলাম। পুরোটা চাষের ফসলি জমি। জনমানসের চিহ্নমাত্র নেই। কোনও মানুষজনও দেখলাম না। তারপর শুরু হল একটা উপত্যকা। সেই উপত্যকার ঠিক কোলে ক্রিকেট মাঠটা।

[আরও পড়ুন: সেমিফাইনালে কে হবে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী? কী বলছে অঙ্কের হিসাব?]

স্থাপত্য থেকে এতদূরের ক্রিকেট জনপদ। অথচ মনে হবে একে যেন ডিজাইন করে তৈরি করা হয়েছে। এর পেছনে যে অপূর্ব উপত্যকাটা সেখানে ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে রাখাল বালকেরা প্রথম ক্রিকেট খেলা শুরু করে। তারপর দীর্ঘদিন বাদে সেটা গুছিয়ে আনা হয় হ্যাম্বলডন মাঠে। তৈরি হয় পৃথিবীর প্রথম ক্রিকেট উইকেট। এদিন দুপুরে সেখানে একটা অদ্ভুত ম্যাচ চলছে। হ্যাম্বলডন একাদশ ভার্সেস ডাচ একাদশ। দু’দলের গড় বয়স তিপ্পান্ন। সবচেয়ে বেশি বয়সি ক্রিকেটারের বয়স আটাত্তর। তবু আমস্টারডাম থেকে আসা টিমের প্লেয়াররা নাছোড়। ক্রিকেটের নার্সারিতে খেলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে চান।

প্লেয়াররা খেলার আগেই ছোট লাঞ্চ সেরে নিলেন উলটোদিকের পাবটায়। যার প্রথম নাম ছিল, ‘দ্য হাট’। এখন বদলে হয়েছে ‘দ্য ব্যাট অ্যান্ড বল ইন’। এটা পৃথিবীর প্রাচীনতম ক্রিকেট পাব বললে কিছুই বলা হয় না। পলাশির যুদ্ধের সাত বছর আগে এখানেই তৈরি হয় ক্রিকেটের সব নিয়মকানুন। এখন ক্রিকেটের নিয়ম তৈরি করে এমসিসি। সেই নিয়মের পরিবর্তন ও সংযোজন করে সৌরভদের টেকনিক্যাল কমিটি। যে কমিটিতে গ্যাটিং, পন্টিংরাও রয়েছেন। প্রাক ১৭৮৭ যাবতীয় ক্রিকেট আইন এই সরাইখানায় বসে তৈরি।

রাখালরা যে ক্রিকেট খেলত তাতে বাইশ গজ নির্দিষ্ট ছিল না। সেটা ঠিক হল। ব্যাটের দৈর্ঘ্য ঠিক হল। আরেকটা সময় পর রাউন্ড আর্ম বোলিং চালু করা হল। হ্যাম্বলডন ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান ‘সংবাদ প্রতিদিন’ প্রতিনিধিকে বল গড়িয়ে দিয়ে দেখাচ্ছিলেন কীভাবে সেই সময় আন্ডার আর্ম ক্রিকেট চলত। তারপর নাকি এক মহিলা এসে আন্ডার আর্ম করতে যাওয়ায় তাঁর গাউনে বল আটকে যায়। তখন নাকি তিনি ডান হাতটা উপরে করে বল ছোড়েন। রাউন্ড আর্ম বোলিংয়ের সেই জন্ম। আর তাই সন্দেহাতীতভাবে হ্যাম্বলডন মাঠই ক্রিকেটের অরিজিনাল নন্দনকানন! এক এক সময় বিস্ফারিত লাগছিল। এ তো লর্ডসেরও আগের আলো না পড়া লর্ডস। এ তো সেই প্রাচীন ভিক্টোরিয়ান যুগের ইংল্যান্ড যাকে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফিল্মে আবিষ্কার করা যায়। যেখানে ডব্লিউ জি গ্রেসেরও খোঁজ নেই।

পানশালার আড্ডা দ্রুত আধুনিক সময়ে ফেরাল। এক ডাচ ক্রিকেটার বললেন, “ইংল্যান্ড আবার শুরু করে দিয়েছে।” তাঁর হাতে ধরা এ দিনের খবরের কাগজ। যেখানে বড় হেডলাইন: মর্গ্যানরা এজবাস্টন দুর্গ সাজিয়ে তৈরি। এরা ডাচ হলে কী হবে ঝরঝরে ইংরেজি বলেন। এক মাস ধরে ইংল্যান্ড সফর করছেন। আজ সফরের শেষ ম্যাচ খেলছেন হ্যাম্বলডনে। সিবি ফ্রাই-র উদ্যোগে ১৯০৮ সালে বসা সেই ফলকের সামনে ছবি তুললেন যার উপর খোদাই করা রয়েছে ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর! কিন্তু এখন পানশালার আলোচনা চলে গিয়েছে একশো এগারো বছর এগিয়ে। শো-কেসে ডিকি বার্ডের সই করা স্মৃতি সংগ্রহ আর হরভজন সিংয়ের দেওয়া বল। ভাজ্জি নাকি আন্তর্জাতিক টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সপ্তাহখানেক আগে এখানে এসেছিলেন।

ব্যাট অ্যান্ড বল ইন যে দম্পতি চালান তাঁরা ইংরেজ, তবু তাঁদের ধারণা কোহলির ভারতকে হারানো একেবারেই সহজ হবে না। ইংল্যান্ড দুটো ম্যাচ জিতেই আবার বাগাড়ম্বর শুরু করে দেওয়ায় এঁরা মোটেই প্রীত নন। বলছিলেন, জেসন রয় আর বেয়ারস্টো ওপেনিং পার্টনারশিপ নিয়ে এত ফাটাচ্ছে তো। বুমরাহর একটা ইয়র্কার সব শেষ করে দিতে পারে। পৃথিবীর আদিমতম সভ্যতায় দেখা গেল বুমরাহ ঢুকে পড়েছেন। মহিলা নিয়ে গেলেন বার কাউন্টারের পাশের ঘরে যা লর্ডস জাদুঘরের চেয়েও অনেক মূল্যবান। এখানে বসেই যে রিচার্ড নাইরেন সঙ্গীদের নিয়ে যাবতীয় ক্রিকেটের আইন বানিয়েছেন। তিনি নিজে ছিলেন টিমের ক্যাপ্টেন। এত শক্তিশালী ছিল হ্যাম্বলডন যে অবশিষ্ট ইংল্যান্ডকে ইনিংসেও হারিয়েছে। সেই ম্যাচের স্কোরবোর্ড এখনও পাবটাতে।

ক্রিকেটের ইতিহাস বইতে তার কোনও উল্লেখই নেই। বলা হয়ে থাকে ক্রিকেটের প্রসার ও সংসার আবর্তিত হয়েছে গুটিকয়েক ব্যক্তির প্রভাবে। টমাস লর্ড। যিনি লর্ডস ক্রিকেট মাঠের প্রতিষ্ঠাতা। তারপর ডব্লিউ জি গ্রেস। যিনি ব্যাটিংয়ের ব্যাকরণ তৈরি করেন। কেরি প্যাকার। যিনি খেলাটাকে নতুন সময় পৌঁছে দেন নানান অভিনবত্ব দিয়ে। জগমোহন ডালমিয়া। যিনি ক্রিকেটে উপমহাদেশীয় শক্তিকে একজোট করে সাহেবদের সার্বভৌমত্ব আক্রমণ করেন। হ্যাম্বলডনে পা দিলে মনে হবে তারা কিন্তু ক্রিকেটের প্রকৃত জনক হিসেবে রিচার্ড নাইরেনকেই ধরে। হ্যাম্বলডন ক্লাবটা এখন চালান মাইক বিয়ার্ডো নামের এক প্রাক্তন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। তিনিই চেয়ারম্যান। অনুযোগের ভঙ্গিতে বললেন, “টমাস লর্ড আমাদের পাশের গ্রামের লোক। ওখানেই ওঁর সমাধি। হ্যাম্বলডনের প্রতিপত্তি দেখে ওঁর প্রথম মনে হয় খেলাটা লন্ডন নিয়ে গেলে কেমন হয়। কারণ তখন হ্যাম্বলডনে গোটা ইংল্যান্ড ভিড় করছিল আর ম্যাচগুলোর উপর চড়া বেটিং হচ্ছিল।”

[আরও পড়ুন: আম্পায়ারের সঙ্গে বিতর্কের জের, ২ ম্যাচ নির্বাসিত হতে পারেন কোহলি!]

জানতাম না আদিম আমলেও যে ক্রিকেটের উপর বেট ধরা হত। লন্ডন নিয়ে যাওয়ায় ক্রিকেট বেটিংয়ের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। লর্ডসের পাশে জমি কিনে টমাস লর্ড তৈরি করেন ক্রিকেটের নতুন ঘাঁটি। ১৭৮৭-তে তৈরি হয় এমসিসি। যে মাঠে বৃহস্পতিবার বিকেলে বিশ্বকাপ এনে রাখা হল। “আর আমরা যেহেতু ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ করতে পারলাম না। গুরুত্ব হারালাম,” বললেন মাইক। এমনভাবে বলছিলেন যে গত বছর ঘটনাটা ঘটেছে। এখানে আসলে সবকিছুই যেন ভিক্টোরিয়ো আমলের সাবেকি সভ্যতা থেকে গিয়েছে। আর সেটাই তার সৌন্দর্য্য। হ্যাম্বলডন হ্যাম্পশায়ার কাউন্টিতে পড়ে। গাড়িতে পঁচিশ মিনিট দূরের উইঞ্চেস্টার। যেখানে ক্রিকেট শেখা ডগলাস জার্ডিন ‘ব্যাট অ্যান্ড বল পাব’ ও তারপর এমসিসি আইনকে বোকা বানিয়ে দেন। লেগ সাইডে ছ’জনের উপর ফিল্ডার রাখা যাবে না। এমন নিয়ম যে করা দরকার, না হ্যাম্বলডন, না লর্ডস, কেউ বোঝেনি। বডিলাইন সিরিজের পর আইন বদলানো হয়। এহেন জার্ডিন কিন্তু বহুবার হ্যাম্বলডন ঘুরে গিয়েছেন। এসেছেন উইঞ্চেস্টারের আর এক ছাত্র টাইগার পতৌদিও।

হ্যাম্বলডন প্যাভিলিয়নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় লর্ডস থেকে এক পাক সাংবাদিকের ফোন এল। তাঁদের দেশে এখনও গুঞ্জন চালাচালি হচ্ছে যে, ভারত সেদিন ইচ্ছে করে ইংল্যান্ডকে ম্যাচ ছেড়ে দিয়েছে। চেষ্টা করলেই রান চেজ করতে পারত। জাস্ট পাকিস্তানকে হেনস্তা করার জন্য। সৌরভ যা শুনে বলছিলেন, “কী যে বলে। এই ইংল্যান্ড টিমের চেয়ে সেমিফাইনালে যে কেউ পাকিস্তানকে খেলতে চাইবে।” মুহূর্তে মনে হল, হ্যাম্বলডন গ্রামের সমাধিতে শুয়ে রিচার্ড নাইরেন কি নিজের দেশে ঘটা বিশ্বকাপের কাণ্ডকারখানা দেখে শান্তিতে পাশ ফিরছেন? শুধু তো হ্যাম্বলডন ইলেভেন নয়, ক্রিকেটে পৃথিবী একাদশের নেতৃত্ব দিয়েছেন এত বছর। আর সেই খেলাটার মাদকতা কিনা তাঁর মৃত্যুর দু’শো বাইশ বছর পরেও বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক স্কোরবোর্ডে নাম নেই তো কী! লোকে তাঁকে চেনে না তো কী! ধন্য রিচার্ড নাইরেনের ক্রিকেট জীবন।

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement