Advertisement
Advertisement
Md Salim

‘নামে মহম্মদ বলে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের টার্গেটেই আমি’, সেলিম জানালেন সবচেয়ে বড় ‘শত্রু’ কে!

একের পর এক বিতর্কিত প্রশ্ন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হওয়া সত্ত্বেও, মহম্মহ সেলিম প্রতিটি পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। প্রশ্নোত্তরে সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক।

Advertisement
রমেন দাস
রমেন দাস

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১৮:৪৫

link
রমেন দাস
রমেন দাস

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১০, ২০২৬, ১৮:৪৫

options
link
‘নামে মহম্মদ বলে হিন্দু-মুসলিম উভয়ের টার্গেটেই আমি’, সেলিম জানালেন সবচেয়ে বড় ‘শত্রু’ কে! zoom

৬৮ বছর বয়সেও বাংলার ভোট রাজনীতিতে সমান প্রাসঙ্গিক। বামেদের উত্থান-পতন ও ভোটের সমীকরণ নিয়ে সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে আলোচনায় সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (Md Salim)।

প্রশ্ন: মহম্মদ সেলিমের মধ্যে এমন কী রয়েছে যার কারণে আজও সোশাল মিডিয়া খুললে তিনিই ট্রেন্ডিং? যুবনেতাদের ছাপিয়ে আপনাকে নিয়েই কেবল চর্চা চারদিকে। কী রহস্য এর পিছনে?
উত্তর: যবে থেকে রাজ্য সম্পাদক হয়েছি, সোশাল মিডিয়া থেকে আমি অ্যাবসেন্ট! ২০১১ সালে আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টও বন্ধ করে দিয়েছি। এখন আমাদের সমর্থক-দরদী যাঁরা রয়েছেন, তারাই বোধহয় এসব করে। এই প্রযুক্তি তো নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরই। ওরাই (যুবনেতারা) বেশি জনপ্রিয় সেখানে। আমি এটুকু বলতে পারি যে, দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে গত শতাব্দীর শেষে আমিই প্রথম সোশাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ হই। সিপিআইএম-এর আগে, মহম্মদ সেলিমের নামে ওয়েবসাইট তৈরি হয়! জ্যোতি বসুর হাতে উদ্বোধন হয়েছিল। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কাজ পাচ্ছে না, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা বিজেপি এবং তৃণমূলের দুর্নীতি-লুটপাট দেখে গভীরভাবে হতাশ। তাই এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রুটি-রুজি, কলকারখানা, কৃষি, শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কথা বললে হয়তো নতুন করে তাদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থার পুনরুত্থান ঘটছে। আমি যেহেতু সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক, এসবের সঙ্গে আমাকে নিয়েও চর্চা হচ্ছে বোধহয়।

Advertisement

“আমার নামের সঙ্গে ‘মহম্মদ’ রয়েছে। কোনও মুসলমান সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি আমাকে অ্যাটাক করে বলছেন, “আপনার নামের মধ্যে মহম্মদ শব্দটাই বেমানান।” আবার হিন্দু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিও আক্রমণের সময় ওই শব্দটাকেই টার্গেট করছেন। আরএসএস শুরু থেকেই এদেশের তিনটি প্রধান শত্রু চিহ্নিত করেছে— মুসলমান, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্ট। আমি জন্মসূত্রে মুসলমান, আবার কমিউনিস্টও। তাই টার্গেট হিসেবে আমি ‘টু-ইন-ওয়ান’!”

প্রশ্ন: কিন্তু সিপিআইএমের যত দোষ, সবের জন্যই মহম্মদ সেলিমকে দায়ী করা হয় কেন?
উত্তর: প্রথমত, রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতিতে এক গভীর অবক্ষয় নেমে এসেছে। কেনাবেচা, দলবদল, হিংসা, খুনোখুনি, ব্যক্তিগত অ্যাটাক, মহিলাদের বডিশেমিং— আগে সেভাবে ছিল না। ন্যূনতম যে সম্ভ্রম-মূল্যবোধ ছিল, তা এখন বিলুপ্তপ্রায়। দক্ষিণপন্থার উত্থানের কারণে প্রবল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু হয়েছে দেশে। ‘ইসলামোফোবিয়া’ তো বেড়েছেই। ‘রোহিঙ্গা’, ‘জেহাদি’র মতো শব্দের ব্যবহারও আছে। তার উপর আমার নামের সঙ্গে ‘মহম্মদ’ রয়েছে। কোনও মুসলমান সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি আমাকে অ্যাটাক করে বলছেন, “আপনার নামের মধ্যে মহম্মদ শব্দটাই বেমানান।” আবার হিন্দু সাম্প্রদায়িক ব্যক্তিও আক্রমণের সময় ওই শব্দটাকেই টার্গেট করছেন। আমি লালকৃষ্ণ আদবানিকেও বলেছিলাম যে, আরএসএস শুরু থেকেই এদেশের তিনটি প্রধান শত্রু চিহ্নিত করেছে— মুসলমান, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্ট। আমি জন্মসূত্রে মুসলমান, আবার কমিউনিস্টও। তাই টার্গেট হিসেবে আমি ‘টু-ইন-ওয়ান’! 

প্রশ্ন: আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আপনি নিজে সাম্প্রদায়িক না-হলে কেন মুজফ্ফর আহমেদের (কাকাবাবু) ছবির নিচে বসে বিভিন্ন ‘নিষিদ্ধ’ সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন? হুমায়ুন কবীরের সঙ্গেও দেখা করতে গিয়েছিলেন। 
উত্তর: প্রথমত, ‘নিষিদ্ধ সংগঠন’ নয়। তাহলে তো বলতে হয় যে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধীনতার আগে ও পরে বারেবারে ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছে। নকশালপন্থী বিভিন্ন সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে জামাতের উত্থানের পর আওয়ামী লিগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ’কথা বলতে পারি যে, পার্টির রাজ্য সম্পাদক হিসেবে আমি সবার সঙ্গে কথা বলি। আমি যখন বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী সমস্ত শক্তিকে এক জায়গায় করব বলছি, সেখানে আমাকে সবাইকেই জড় করতে হবে। এখানে বাছবিচারের ব্যাপার নেই। আসন সমঝোতায়, ২৯৪ আসনের মধ্যে সিপিআইএম লড়েছে ১৯৫-১৯৬ আসনে। বামপন্থীরা সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০টির বেশি আসনে লড়ছে। সেখানে সহযোগী হিসেবে আইএসএফ রয়েছে।

প্রশ্ন: প্রতীকউর রহমান দল ছাড়লেন। কোথাও কি আপনারা সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থ ছিলেন? মহম্মদ সেলিম কি তা বুঝতে ভুল করেছিলেন? আরও একটু সক্রিয় হলে কি এমন নেতাদের আটকানো যেত?
উত্তর: না, গত লোকসভা নির্বাচনের দিন থেকেই আমরা বুঝলাম, সে কিছুটা ‘কম্প্রোমাইজড’ হয়ে গিয়েছে। এসব তো বাইরে আলোচনা করা যায় না! আমরা ওকে খানিক রক্ষার চেষ্টা করলাম। ভয় পেয়ে হয়েছে? রাগে, লোভে? বোঝার চেষ্টাও করলাম। কিন্তু দেখা গেল, ও ক্রমাগত সরে যাচ্ছে। বেরিয়ে যাওয়ার আগের তিন মাস দেখলাম যে সিপিআইএমের কোনও কাজকর্মে আর ওর কোনও উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ নেই। দুঃখ হয়, তবে এটা আমাদের চর্চার বিষয় নয়।

প্রশ্ন: বামপন্থীদের সঙ্গে আইএসএফ জোট। আইএসএফ যখন আরাবুল ইসলামকে টিকিট দিচ্ছে, তখন কি মন খারাপ হয় সেলিমের? কোথাও কি মনে হয় যে এই সমঝোতা করা ভুল ছিল?
উত্তর: রাজনীতির ময়দানে কোনটা গ্রহণযোগ্য, কোনটা বর্জনীয়, সেই বিষয়ে সিপিআইএম তথা বামপন্থীদের স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এবং তা আমি প্রেস কনফারেন্স করে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছি। কোন দলে কে যাবে, তা সেই ব্যক্তি ও দল ঠিক করে। আমি বড়জোর দেখতে পারি আমার দলে কোনও বেনোজল ঢুকছে কি না। 

প্রশ্ন: ‘পোলারাইজেশন’, ‘বাইনারি পলিটিক্স’ বা ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার যে কথা আপনারা বলেন, সেই নির্বাচনী পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধলে কি বেশি ভালো হত বলে মনে হয়?
উত্তর: যদি ওয়েবসাইটে গিয়ে আমাদের ডকুমেন্টস দ্যাখো… বামপন্থীদের বাইরে অন্য কোনও দলের সঙ্গে আমাদের ‘জোট’ হওয়ার কথা না। নির্বাচনের সময় আসন রফা হতে পারে। কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে সমঝোতা হতে পারে। যেমন অভয়াকাণ্ডের সময় সবাই মিলে দলমত নির্বিশেষে নামলাম। এখন বিজেপি-তৃণমূল বিরোধী সমস্ত শক্তিকে যখন আমরা এককাট্টা করছিলাম, তখন পূর্বশর্ত ছিল যে তাদের বিজেপি এবং তৃণমূল বিরোধী অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। বামফ্রন্টের বাইরে যে বাম শক্তি রয়েছে, তাদেরকে একত্রিত করতে হবে। নকশালপন্থীরা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই প্রথম সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর মতো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমরা একত্রিত হলাম। তারা নির্বাচনে লড়ছে বামফ্রন্টের সহযোগী হিসেবে। গত নির্বাচনেও আইএসএফ আমাদের সঙ্গে ছিল। এই বছর অনেক চেষ্টা চলছিল যেন তেমনটা না হয়, যেমনটা কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলেছি।

West Bengal Assembly Election: Exclusive Interview with Md Salim

প্রশ্ন: অভয়াকাণ্ডের পর ন্যায়বিচারের দাবিতে লড়াই করেছেন বামপন্থীরা। আসন্ন নির্বাচনে পানিহাটি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী অভয়ার মা। কীভাবে দেখছেন?
উত্তর: আমাদের দেশের জনপ্রতিনিধি আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যে কেউ প্রার্থী হতে পারেন। অভয়াকাণ্ড যখন ঘটল, তখন কোন রাজনৈতিক দলের হয়ে কে দাঁড়াবে, তা বিচার্য ছিল না। সেটা ছিল অত্যন্ত নৃশংস এক হত্যা। সুপ্রিম কোর্ট বলল, এর পিছনে ‘লারজার কন্সপিরেসি’ আছে, যা ‘আনআর্থ’ করতে হবে। কিন্তু রাজ্যের পুলিশ, কলকাতা পুলিশ বা সিবিআই— কেউই আর ওর ধারেকাছে গেল না। এ থেকেই তো পরিষ্কার, চিকিৎসা জগতে যে ‘মাফিয়া রাজ’ চলে, তা তৃণমূলের আমলে আরও সংগঠিত হয়েছে। সন্তানহারা পরিবারই তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করবে। আমরা আগেই এর আঁচ পেয়েছিলাম, যখন আরএসএস ছুপারুস্তম হয়ে ছাত্র সমাজের নাম করে নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছিল। আমরা তখনই বলেছিলেন যে এটা রাজনৈতিক ফাঁদ। যারা বিজেপির সঙ্গে কামদুনি গেল, তারা কি সকলে ন্যায় পেল? দারিভিটে রাজেশ খুন হয়েছিল, তার পরিবার বিজেপির সঙ্গে গেল। অপরাধীরা শাস্তি পেল কি?

প্রশ্ন: আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে, তারা কেন যাচ্ছে?
উত্তর: যারা গেছে, তারাই বলতে পারবে। আমি কারও ‘ভ্যালু জাজমেন্ট’ করতে পারি না। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেশের ৩৬৫টি জেলায় কারফিউ জারি হয়েছিল। দাঙ্গা-হাঙ্গামা হল। মন্দির নির্মাণের নাম করে আসলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে জায়গা দেওয়া হল। নীতিগত অবস্থান এটা হবে যে, তুমি রাজনীতির সঙ্গে মন্দির-মসজিদকে জড়াবে না। জ্যোতি বসু বলেছিলেন, আমরাও সেই একই কথা বলছি। তুমি রামমন্দিরের বিরোধিতা করবে, আর জগন্নাথ মন্দির দেখিয়ে ভোট করবে, এটা হতে পারে না।

প্রশ্ন: মীনাক্ষী-দীপ্সিতার মতো প্রার্থীরা লড়াই করছেন। কিন্তু ভোটবাক্স তেমনভাবে পূরণ হচ্ছে না, যাতে আসন পাওয়া যায়।
উত্তর: প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে যে, নির্বাচন কমিশন এসআইআরের নাম করে কী করেছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনগুলোতে কী করেছে। আমডাঙায় সিপিআইএম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েছিল। আমাদের সদস্যদের কেনাবেচা করতে পারেনি বলে সেখানে দীর্ঘ পাঁচ বছর বোর্ড গঠন করতেই দেওয়া হয়নি। সুতরাং, এই ভোট-প্রক্রিয়া জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন নয়। সেখানে মস্তানি, গুন্ডামি, ইলেক্টোরাল বন্ডের টাকা, কর্পোরেটের টাকার বিষয় থাকছে। ভোটার লিস্ট তৈরি থেকে ভোটগণনা পর্যন্ত- সমস্তটাই ওরা হাইজ্যাক করে নিতে চাইছে। নির্বাচনের ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গত দুই-আড়াই বছর ধরে লোকে আর ‘শূন্য’ বলছে না। আগে লোকে বলত, ‘বামপন্থীদের ভোট দিয়ে কী হবে?” এখন মানুষ প্রশ্ন করছে, “বামপন্থীদের ভোট দিলে ওরা মানুষের জন্য কী কী করবে?” বিজেপি-তৃণমূল আগে দাবি করত, বামপন্থীদের কোনও অস্তিত্ব নেই। অথচ এখন তারা বামপন্থীদের গালাগাল না করে কোনও কথা বলতে পারে না। 

প্রশ্ন: মনে করা হয়, হিন্দু ভোট মানেই বিজেপির দিকে যাবে। মুসলিম ভোট মানেই তৃণমূল। সেখানে আপনার প্রাক্তন সতীর্থ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেতারা বলছেন, বামপন্থীরা সাম্প্রদায়িক। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার খোলস ধরে থাকে।
উত্তর: বামপন্থীদের খোলস ছাড়তে হয় না, আমরা স্পষ্ট কথা স্পষ্টভাবে বলি। আমরা দুর্বল হইনি। আমাদের রাজ্যে ও দেশে ধর্মনিরপেক্ষতাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়েছে। সংবিধানে যে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে, তা রক্ষা করার জন্যই আমাদের লড়াই। বাংলাদেশের দিকে তাকালেই দেখতে পাবে, সেখানকার ‘গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র’ গত দেড় বছর ধরে দুর্বল হয়ে পরছিল। জামাতপন্থী মৌলবাদী শক্তি এবং পাকিস্তানপন্থী ভারত-বিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। আমরা কি তা চেয়েছিলাম? চেয়েছিলাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি সবল হোক। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হল, বিশাল পরিবর্তন যে হয়েছে, তা নয়। কিন্তু রক্ষা পেয়েছে দেশটা! নির্বাচিত হয়ে গণতান্ত্রিক সরকার তো এসেছে! আমেরিকা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর নাম করে কোনও সরকার বসিয়ে দিয়েছে, এমন তো নয়। আমাদের দেশেও গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে মজবুত করতে হবে। বামপন্থীরা এই লড়াইয়ের কথা বলছে এবং বিপুল অংশের মানুষও এটিই চাইছেন। ও ফারজি মুদ্দে লাতে রহেঙ্গে। হাম আসলি মুদ্দে পর অড়ে রহেঙ্গে।

“গত কয়েক দশকে প্রচলিত শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ পালটে গিয়েছে। আজ এমন পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, যেখানে যুদ্ধের নামে খেলা হচ্ছে। আর খেলার নামে যুদ্ধ হয়। পার্কগুলোকে নীল-সাদা রং করেছে, কিন্তু শিশুদের খেলার ব্যবস্থা নেই। অথচ বুথে যখন অরাজকতা চলছে, মানুষ বলছে ‘খেলা হবে’!”

প্রশ্ন: উত্তর কলকাতা, রায়গঞ্জ, মুর্শিদাবাদ- একবার আপনি হারলেন। পরে রায়গঞ্জে জিতলেন। একাধিকবারের রাজ্যসভার সাংসদ। সেলিম নাকি অঙ্ক কষেই এমন আসন বাছেন, যেখান থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। এমন সিট বদল কেন?
উত্তর: প্রথমত, তেমন হলে তো যতবার ভোটে দাঁড়িয়েছি, ততবারই জিততাম। দ্বিতীয়ত, এটা সিট বদল করা নয়। সিপিআইএমে কে কোন কেন্দ্রে দাঁড়াবে তা কোনও ব্যক্তি নিজে ঠিক করে না। কেউ এর জন্য আবেদনও করে না। আমি যখন উত্তর-পূর্ব কলকাতা কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছিলাম, সেখানে তখন অজিত পাঁজা গত ২৪ বছর ধরে গেঁড়ে বসেছিলেন। তখনও আপত্তি উঠেছিল যে, তিনি মালদহ-মুর্শিদাবাদ থেকে কেন দাঁড়ালেন না? আমি যখন দলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, তখন গোটা দেশজুড়ে যুবসংগঠন করেছি। যখন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় কলকাতা ছেড়ে রায়গঞ্জে দাঁড়িয়ে সাংসদ হয়েছিলেন, তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলেনি। প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী দক্ষিণ কলকাতায় হারলেন, হাওড়ায় গিয়ে জিতলেন। প্রশ্নটা স্থানবদল নিয়ে নয়, প্রশ্নটা মহম্মদ সেলিমকে নিয়ে। সবসময়ই থাকবে। আই এঞ্জয় দিস!

প্রশ্ন: এই মুহূর্তে প্রধান প্রতিপক্ষ কে— তৃণমূল, বিজেপি, কংগ্রেস নাকি অন্য কেউ?
উত্তর: সিপিআইএম, সিপিআই, সিপিআইএমএল— বিভিন্ন ফ্র্যাকশন আছে। যদি সে কমিউনিস্ট হয়, তবে তার মতে প্রধান শত্রু আরএসএস। বিজেপি, মোদি, যোগী এসব নাম আসার আগে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘দুর্গা’ সাজিয়ে আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে ঘাঁটি গাড়ার আগে। বাজপেয়ী-আদবানির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি সরকারে যোগ দেওয়ার আগে। কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল তৈরি করার আগে। আমাদের পার্টি কমিটিতেই লেখা আছে, আরএসএস একটা ফ্যাসিস্ট সংগঠন। তারা এ দেশে ধর্মের নামে উসকানি দিয়ে ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। কেবল কমিউনিস্টরা নয়, স্বাধীনতার আগে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সুভাষচন্দ্র বসু বলেছেন যে আরএসএস আমাদের দেশের জন্য কত বড় ব্যধি!

প্রশ্ন: এককথায় উত্তর দিতে হবে, কাকে আপনি কীভাবে দেখেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
উত্তর: যিনি জরুরি অবস্থার সময় রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের রাজ্যে যখন আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস চলছে, তখন তার সমর্থনে কংগ্রেসে গিয়েছিলেন। তাঁর জেনারেশনের বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করেছিল।
প্রশ্ন: শুভেন্দু অধিকারী?
উত্তর: ‘দলবদলু’। সে তৃণমূলে থাকতে বলেছিল, লাল ঝান্ডা কেন, লাল কাপড়ের টুকরোও থাকবে না! আর এখন তৃণমূলের ঝান্ডা ফেলে বিজেপির ঝান্ডা ধরে ‘রোহিঙ্গা’, ‘বাংলাদেশি’ বলছে। রাজনীতিতে তো একটা নির্দিষ্ট মত থাকতে হয়। এরা কোথাও থিতু নয়।
প্রশ্ন: দিলীপ ঘোষ?
উত্তর: তার রাজনীতির আমি বিরোধিতা করি। কিন্তু এটুকু মনে করি, সে কনসিস্ট্যান্ট। রাজনীতিতে কনসিসট্যান্সি একটা বড় কথা।

প্রশ্ন: মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, দীপ্সিতা ধর, সৃজন ভট্টাচার্য, কলতান দাশগুপ্ত। কাকে কীভাবে দেখেন?
উত্তর: আমি এরকম চারশোটা নাম বলতে পারি! তিন মাস আগে তিনশোটা বলছিলাম। এক বছর পর এক হাজারটা বলতে পারব। এরা প্রায় সবাইই ছাত্র-যুব আন্দোলন করে, পুলিশের সঙ্গে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ে উঠে এসেছে। সে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে লড়ে আসা জেএনইউ-এর ছাত্রী দীপ্সিতাই হোক, অথবা রাজ্য পুলিশের সঙ্গে লড়ে আসা কলতান-সৃজন-মীনাক্ষী হোক। এরা এ কারণেই নেতা বা নেত্রী, কারণ এদের সঙ্গে একটা গোটা প্রজন্ম রয়েছে। আরও অনেক নাম রয়েছে যা তুমি বললে না। সে কোচবিহারের আখিখ হতে পারে, প্রণয় কার্জি, বীরভূমের সৌভিক হতে পারে, খড়দহের দেবজ্যোতি হতে পারে। এসএফআই-এর সেক্রেটারি ময়ূখ বিশ্বাস এবারে দমদমের প্রার্থী হয়েছে। বালিগঞ্জের আফরিন রয়েছে। সীতারাম ইয়েচুরির ‘কার্ডার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’ করে গোটা রাজ্যে এমন কয়েকশো ছেলেমেয়েকে বেছে নিয়ে, ট্রেনিং দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যতের শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তুলছেন।

প্রশ্ন: বাংলার রাজনীতিতে ‘খেলা হবে’ স্লোগানটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বামেরাও কি এবারের নির্বাচনে খেলবে?
উত্তর: গত কয়েক দশকে প্রচলিত শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থ পালটে গিয়েছে। আজ এমন পৃথিবীতে আমরা বাস করছি, যেখানে যুদ্ধের নামে খেলা হচ্ছে। আর খেলার নামে যুদ্ধ হয়। পার্কগুলোকে নীল-সাদা রং করেছে, কিন্তু শিশুদের খেলার ব্যবস্থা নেই। অথচ বুথে যখন অরাজকতা চলছে, মানুষ বলছে ‘খেলা হবে’!
প্রশ্ন: রাজনৈতিক ময়দানে অধীর চৌধুরীকে মিস করেন?
উত্তর: এই লড়াইয়ের ময়দান বিস্তৃত। হয়তো দেখবে বামপন্থী, কংগ্রেসের আলাদা আলাদা প্রার্থী তালিকা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ একযোগে বিজেপি-তৃণমূলকেই হারাতে চায়। থিঙ্ক টুগেদার, স্ট্রাইক সেপারেটলি।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.