কোলন ক্যানসার কী এবং কেন? এর চিকিত্‍সাই বা হবে কীভাবে?

প্রতিদিনই পশ্চিমি দুনিয়া ঘেঁষা লাইফস্টাইল পালন করে থাকেন? তাহলে সাবধান। কারণ এই লাইফস্টাইলের কারণেই বাড়ছে কোলন (মলাশয়) ক্যানসারের ঝুঁকি৷ আর জিনঘটিত হলে রোগীর নিকটাত্মীয়কে আগাম সতর্ক থাকতেই হবে৷ এই বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন অ্যাপোলো গ্লেনিগলস হসপিটালের মেডিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডা. ইন্দ্রনীল ঘোষ৷ লিখছেন পৌষালী দে কুণ্ডু

ভারতে ১০০ জন ক্যানসার আক্রান্ত পুরুষের মধ্যে সাতজন কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হন৷ মহিলাদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা পাঁচ৷ এত্ত কম! ভেবে নিশ্চিন্ত হলেই ভুল করবেন৷ কারণ, এতদিন ভারতে খুব বেশি মানুষের কোলন ক্যানসার হত না ঠিকই৷ কিন্তু গত পাঁচ বছরে হঠাত্‍ করে কোলন ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে৷ যার জন্য দায়ী করা যায় আধুনিক লাইফস্টাইল, প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে যাওয়াকে৷ বিশেষ করে ৪০-৬০ বছর বয়সিদের মধ্যে কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে৷ আমেরিকায় মোট ক্যানসার আক্রান্তদের মধ্যে ১৫-২০ শতাংশ মানুষই কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত৷

[মুসলিমরা হিন্দু মেয়েদের ছুঁলে জবাব দেবে তরোয়াল: হিন্দু যুবা বাহিনী]

মলাশয়ে অনিয়ন্ত্রিত হারে কোষের বৃদ্ধিই হল কোলন ক্যানসার৷ খাবার হজমের পর পাইপের মতো দেখতে বৃহদন্ত্রের মধ্য দিয়ে মলদ্বারে পৌঁছয়৷ তারপর সেখানে সেটি মল হয়ে বেরিয়ে যায়৷ বৃহদন্ত্রের অংশই হল কোলন৷ কোলনের পাইপের ভিতরে ক্যানসার হলে মলত্যাগে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়৷ সে ক্ষেত্রে পাইপের পথে পলিপের মতো কোনও ব্লক হয়ে পেট পরিষ্কার হতে বাধা দিতে পারে৷ যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য (কনস্টিপেশন) হয় কিংবা নিয়মিত মলত্যাগ হয় না৷ পাইপের ভিতর ব্লক না হলে ঘন ঘন পায়খানা হয়ে ডায়েরিয়াও হতে পারে৷ আবার পাইপের ভিতরে ক্যানসারযুক্ত পলিপ থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে৷ তখন মলের সঙ্গে রক্ত বেরোয়৷ শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে অ্যানিমিয়া হয়৷

কাদের কাদের ঝুঁকি রয়েছে:

  • জিনঘটিত কারণে কোলন ক্যানসার হলে রিস্ক জোনে থাকেন রোগীর নিকটাত্মীয়রাও৷
  • আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে৷ অতিরিক্ত মোটা বা ওবেসিটি-তে আক্রান্ত হলে৷ বেশিক্ষণ বসে বসে কাজ করলে৷
  • ঘন ঘন রেড মিট, প্যাকেটজাত প্রসেসড খাবার খেলে৷ অতিরিক্ত প্রাণীজ প্রোটিন ও হাই-ক্যালোরির খাবার খেলে৷
  • নিয়মিত শরীরচর্চা না করলে৷

লক্ষণ:

  • তলপেটে ব্যথা, পেলভিস ও বৃহদন্ত্রের শেষ অংশে যন্ত্রণা৷
  • মলের সঙ্গে রক্ত, ঠিকমতো মলত্যাগ না হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়েরিয়া, অতিরিক্ত পেটে গ্যাস হওয়া, ঘন ঘন পায়খানা৷
  • রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া), ক্লান্তি, খিদে না পাওয়া, ওজন কমা৷
  • তলপেটে খিঁচ বা লাম্প৷

[যোগীর দাওয়াইয়ে চাঙ্গা পুলিশ, ৩ দিনে উদ্ধার ২৭ নাবালিকা]

পেটের গোলমাল নয়:
কোলন ক্যানসার হলে সাধারণত ঠিকমতো পেট পরিষ্কার হয় না৷ কিংবা ঘন ঘন পায়খানা হয়৷ এসব ক্ষেত্রে অধিকাংশ ব্যক্তিই পেটের গন্ডগোল ভেবে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেন না৷ অথবা পেটের অসুখ সারানোর চিকিত্‍সা করে অযথা দেরি করেন৷ বেশ কিছুদিন ধরে এমন সমস্যা হলে বুঝতে হবে তা ঠিক করে পেট সাফ না হওয়ার জন্যই হচ্ছে৷ আর কোলনে সমস্যা হলেই পেট পরিষ্কার হতে চায় না৷

কোলনোস্কপি ও চিকিত্‍সা: ক্যানসার কি না নিশ্চিত করতে প্রথমে কোলনোস্কপি করে বায়োপসি করা হয়৷ মলদ্বার দিয়ে ক্যামেরা লাগানো একটি যন্ত্র ঢুকিয়ে দেওয়া হয়৷ কোলনে কোনও অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়লে সেই অংশের বায়োপসি করা হয়৷ রিপোর্টে ক্যানসার ধরা পড়লে সিটি স্ক্যান, পেট স্ক্যান করে দেখা হয় সেটি কোন স্টেজে আছে কিংবা কোথায় কোথায় ছড়িয়েছে৷ ক্যানসার যদি শুধুমাত্র কোলনেই থাকে তাহলে ওপেন বা ল্যাপারোস্কপি করে অপারেশন করতে হবে৷ টিউমারের অবস্থান, রোগীর শারীরিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত কোন পদ্ধতিতে অপারেশন হবে৷ প্রথম ও দ্বিতীয় স্টেজের ক্যানসার কোলনেই থাকে৷ অপারেশন ও ওষুধ দিয়ে রোগীর চিকিত্‍সা চলে৷ তৃতীয় স্টেজে ক্যানসার কোলন ও লিম্ফনোডে ছড়ায়৷ এই তিন স্টেজে অপারেশন করা যায়৷ চতুর্থ স্টেজে ক্যানসার ধরা পড়লে সাধারণত তখন তা ছড়িয়ে পড়ে৷ এই স্টেজের রোগীকে পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যায় না৷ তবে ক্যানসার কোলন ছাড়াও অন্যত্র ছড়িয়ে গেলে সাধারণত অপারেশন করা হয় না৷ সে ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপি করা হয়৷ কেমোথেরাপি ট্যাবলেট ও ইঞ্জেকশন দু’ভাবেই হয়৷ টার্গেটেড থেরাপি হয় ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে৷

[লন্ডনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে গ্রেপ্তার বিজয় মালিয়া]

জরুরি স্ক্রিনিং:
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ ক্যানসারের লক্ষণ সম্পর্কে খুব একটা জানেন না৷ সেই কারণেই বেশিরভাগ রোগী তৃতীয় ও চতুর্থ স্টেজে শনাক্ত হন৷ পেটের গোলমাল ভেবে বা মলের সঙ্গে রক্ত পড়লে কোষ্ঠকাঠিন্য ভেবে ফেলে রাখবেন না৷ ৫০ বছর বয়স হলেই একবার কোলনোস্কপি করিয়ে নিন৷ রিপোর্ট নর্মাল হলে দশ বছর অন্তর ফের এই টেস্ট করাতে হবে৷ রিপোর্টে অস্বাভাবিক কিছু স্পট দেখা গেলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখান৷

জিনের জন্য আগাম সতর্কতা:
বাবা, মা, ভাই-বোনের মতো নিকটাত্মীয়ের কোলন ক্যানসার হলে এই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই বেশি৷ কারণ, এই ক্যানসার হওয়ার অন্যতম কারণ জিন৷ কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে ৫-১০ শতাংশের পরিবারে কোলন ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে৷ এঁদের জিনেই ক্যানসারের সিন্ড্রোমটি থাকে৷ তাই জিনঘটিত কারণে যে রোগী কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হন তাঁর নিকটাত্মীয়দের আগাম বংশগত কারণে জিনঘটিত ক্যানসার শনাক্ত করা যায় এমন কিছু টেস্ট করিয়ে নেওয়া উচিত৷ সাধারণত কোলন ক্যানসারের চার-পাঁচটি সিন্ড্রোম হয়৷ যেমন, কারও কোলনের সর্বত্র ক্যানসারযুক্ত পলিপে ভরে যায় অথবা কোলনে কোনও ক্যানসারযুক্ত পলিপ নেই অথচ পরিবারে একাধিক সদস্যের এই ক্যানসার হয়েছে৷ তাই ফ্যামিলিয়াল অ্যাডিনোমেটাস পলিপোসিস(এফএপি), হেরিডিটরি ননপলিপোসিস কোলোরেক্টাল ক্যানসার (এইচএনপিসিসি) সিন্ড্রোমের টেস্ট করানো উচিত৷

[প্রেক্ষাগৃহে জাতীয় সংগীত বাজলে আর দাঁড়াতে হবে না প্রতিবন্ধীদের]

খাওয়াদাওয়া

  • সপ্তাহে একদিনের বেশি পাঁঠার মাংস বা অন্য রেড মিট খাওয়া চলবে না৷ মুরগির মাংসে অসুবিধা নেই৷
  • প্রচুর শাক-সবজি খেতে হবে৷
  • মদ্যপান একদম নয়৷
  • মশলাদার খাবার খাওয়ার সঙ্গে কোলন ক্যানসারের সম্পর্ক নেই৷
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম করা উচিত৷

যোগাযোগ: ৮০১৭৭৫৬৭৭৫

[নারদ কাণ্ডে সিবিআই নজরে আরও ১৭ জন]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *