Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Bankura Durga Puja

দেবীর সঙ্গে পূজিতা দুই দাসীও, বাংলার শতাব্দী প্রাচীন পুজোর নেপথ্য কাহিনি কী?

প্রযুক্তি এসেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা - কিন্তু দেবীর পাশে থাকা দুই ‘দাসী’র জায়গাটি বদলায়নি।

টিটুন মল্লিক
টিটুন মল্লিক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১৭:৫৬

link
টিটুন মল্লিক
টিটুন মল্লিক

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১৭:৫৬

options
link
দেবীর সঙ্গে পূজিতা দুই দাসীও, বাংলার শতাব্দী প্রাচীন পুজোর নেপথ্য কাহিনি কী? zoom
রানিবাঁধের ঝিলিমিলি রাওতোড়া গ্রামের মণ্ডল পরিবারের পুজো। নিজস্ব চিত্র
Advertisement

এক হাতে স্মার্টফোন, অন্য হাতে পুজোর থালা। চারপাশে থিমের আলো, লেজার শো, সেলফি আর সামাজিক মাধ্যমে ‘স্টোরি’ দেওয়ার ব্যস্ততা। পুজোর সংজ্ঞা বদলেছে, বদলেছে উৎসব দেখার চোখও। অথচ সেই বদলে যাওয়া সময়ের মাঝেই রাওতোড়ার একটি উঠোনে এখনও জ্বলে মাটির প্রদীপ। ধূপের ধোঁয়া পেরিয়ে লক্ষ্মী-সরস্বতীর মুখের দিকে তাকালে চোখ আটকে যায় আরও দু’টি মুখে। দেবীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মাটির দাসী। ২৪০ বছর ধরে একই জায়গায়, একই ভঙ্গিতে। যেন আধুনিকতার দৌড়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সময়ের দু’টি স্থির ফ্রেম।

রানিবাঁধের ঝিলিমিলি রাওতোড়া গ্রামের মণ্ডল পরিবারের পুজো তাই শুধু দেবী আরাধনার কাহিনি নয়। এটি সময়ের সঙ্গে একটি পরিবারের চলার গল্প। একদিকে মোবাইলের ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে পুজোর প্রতিটি মুহূর্ত, অন্যদিকে পঞ্চমীর সকালে এখনও প্রবীণদের মুখে উচ্চারিত হয় পুরনো স্তব। এক দিকে অনলাইন শুভেচ্ছা, অন্যদিকে উঠোনে আলপনা আঁকেন গ্রামের মহিলারা। প্রযুক্তি এসেছে, বদলেছে জীবনযাত্রা – কিন্তু দেবীর পাশে থাকা দুই ‘দাসী’র জায়গাটি বদলায়নি। প্রথম দর্শনে নজর যায় লক্ষ্মী ও সরস্বতীর দিকে। কিন্তু একটু থামলেই বোঝা যায়, এই পুজোর আসল কৌতূহল লুকিয়ে রয়েছে দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মাটির প্রতিমায়। তাঁদেরও ফুল দেওয়া হয়, প্রদীপ জ্বালানো হয়, ভোগ দেওয়া হয়। পরিবারের কাছে তাঁরা দেবীর সেবায় যুক্ত দুই দাসীর প্রতীক।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
Durga
রানিবাঁধের ঝিলিমিলি রাওতোড়া গ্রামের মণ্ডল পরিবারের পুজো। নিজস্ব চিত্র

পরিবারের সদস্য প্রশান্ত কুমার মণ্ডল বলেন, “দাসীদের পুজো আমাদের কাছে কোনও নতুন বিষয় নয়। ছোটবেলা থেকে এই ভাবেই দেখে আসছি। দেবীর সেবায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের সম্মান জানানো পুজোরই অংশ – এমনটাই আমাদের পূর্বপুরুষেরা শিখিয়েছেন।” নতুন প্রজন্মের চোখে অবশ্য এই রীতির অর্থ আরও বিস্তৃত। পরিবারের নববধূ পিয়ালী মণ্ডল বলেন, “প্রথমবার দেখে অবাক হয়েছিলাম। দেবীর পাশে দাসীদেরও পুজো হচ্ছে – বিষয়টা আমার কাছে একেবারেই নতুন ছিল। পরে বুঝেছি, এর মধ্যে একটা পুরনো ইতিহাস আর মানুষের প্রতি সম্মানের ভাবনা রয়েছে। এখন মনে হয়, এই রীতিটাই আমাদের পুজোর সবচেয়ে বড় পরিচয়।”

পরিবারের দাবি, এই পুজোর সূত্র বিষ্ণুপুরে। সেখান থেকে মণ্ডল পরিবারের পূর্বপুরুষেরা খাতড়ার পুখুরিয়ায় আসেন। পরে বসতি গড়ে ওঠে রাওতোড়ায়। ঠিকানা পাল্টেছে, প্রজন্ম পাল্টেছে, বদলেছে পোশাক, পুজোর সামগ্রী, যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু বদলায়নি দেবী এবং দুই দাসীর অবস্থান। চতুর্থীর গণেশপুজো দিয়ে শুরু হয় উৎসব। পঞ্চমীর ভোরে ঘটস্থাপন। কলার থোড় জড়ানো ঘটে জল ভরার সময় চলে স্তবপাঠ। লক্ষ্মীর সামনে ধানের শিষ, চাল ও সিঁদুর। সরস্বতীর সামনে বীণা, তালপাতার পুঁথি ও সাদা ফুল। আর দুই দাসীর সামনেও জ্বলে পৃথক প্রদীপ, দেওয়া হয় ফুল ও ভোগ। ২৪০ বছর আগে এই রীতি পরিবারের কাছে হয়তো ছিল নিছক পুজোর নিয়ম। আজ তা হয়ে উঠেছে এক ধরনের পারিবারিক ‘হেরিটেজ’। দূরে থাকা আত্মীয়রা ভিডিও কলে পুজো দেখেন। তরুণেরা মোবাইলে ছবি তোলেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পুজোর মুহূর্ত। কিন্তু স্ক্রিনের ওপারে যতই আধুনিকতা থাক, প্রতিমার সামনে দাঁড়ালে সেই পুরনো রীতির কাছেই ফিরতে হয়।

‘দাসী’ শব্দটির অর্থ নিয়েও বদলেছে সময়। আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁরা কেবল কোনও পুরনো সামাজিক পরিচয়ের প্রতিনিধি নন; বরং দেবীর সেবায় যুক্ত মানুষের সম্মানের প্রতীক। তবে এই রীতির নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উৎস বা ওই দুই দাসীর পরিচয় সম্পর্কে লিখিত নথি কতটা রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। পারিবারিক স্মৃতি, লোককথা এবং প্রজন্মান্তরের বিশ্বাসই এখনও এই পুজোর ইতিহাসের প্রধান অবলম্বন। সন্ধ্যা নামলে রাওতোড়ার সেই উঠোনে অবশ্য আধুনিকতার সব শব্দ যেন একটু দূরে সরে যায়। মাটির প্রদীপের আলোয় আলপনা ঝলমল করে। ধূপের ধোঁয়া পাক খায়। শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনির সঙ্গে মিশে যায় ঢাকের আওয়াজ। সেই আলোয় লক্ষ্মী-সরস্বতীর পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে দুই মাটির দাসী।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.