দেবত্রী ঘোষ: ‘আজ লড়কি নহি করতে হ্যায়। ইসওয়ালিকো ছোড় দেতে হ্যায়’– অভিযুক্তের জবানবন্দি শুনতে শুনতে ক্রমশ শক্ত হতে থাকে ডিসিপি’র মুখের পেশিগুলো। এর অর্থ, একই ঘৃণ্য অপরাধ এরা প্রথমবার করেনি। আগেও করেছে, তবে ধরা পড়েনি। কারণ, স্থানীয় থানার পুলিশ তাদের কর্তব্য যথাযথ পালন করেননি। কেউ সময় থাকতে এফআইআর নেয়নি, আবার কেউ মেয়েটির মৃতদেহ পাওয়ার পর পরিবারের হাতে তুলেই ক্ষান্ত হয়েছে। কোনও তদন্ত হয়নি, ফাইল যেমনকার তেমন থেকেই গিয়েছে। ২০১৫ সালে ‘তলওয়ার’ এবং ২০২০ সালে ‘ছপক’-এর পর মেঘনা গুলজারের ‘দায়রা’ (Daayra) যেন এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করে। সেই বৃত্ত যেখানে এই দেশের মানুষ এতদিনে এইটুকু বুঝতে সক্ষম, পুলিশ ও আইনি ব্যবস্থা যথাসময়ে নিজেদের কাজ না করার ফলে কী ঘটতে পারে। আবার কখনও তা নিজের কাজ করলেও সমাজে তার প্রভাব চোখে পড়ে নামমাত্র। যে দেশে বিচার পাওয়ার অপেক্ষা করতে করতে মানুষেরা ক্লান্ত এবং অসহায়, সেখানে ক্রমাগত ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মালা পরিয়ে অপরাধীদের সংবর্ধনা দেওয়ার ঘটনা জনগণকে ক্রোধে জর্জরিত করে তোলে ক্রমশ।
আজকাল আর কেউ আশা করে না যে আইনি ব্যবস্থায় সঠিক বিচার মিলবে। তাই বিচারের ভাষাকে বদলে দেওয়া হোক বদলায়। মেঘনা গুলজার অবশ্য তাঁর এই ছবিকে এমন দৃষ্টিভঙ্গিগত বিভ্রমের কাচ দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যেখানে দর্শক ভুগতে পারে দোলাচলে।
আরও পড়ুন:

এই গল্পে (২০১৯ সালে হায়দরাবাদে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ-খুন, ও অপরাধীদের এনকাউন্টারের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে) রাগিণী পূজারির ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ডিসিপি রমন কুমার (পৃথ্বীরাজ সুকুমারন) ও তার টিম অবশ্য তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত চালিয়ে অপরাধীদের ধরে ফেলে। তারপর কেস আদালতে ওঠার আগেই ঘটনার পুনর্নিমাণ করার সময় আত্মরক্ষার তাগিদে গুলি চালিয়ে তাদের যখন মেরে ফেলে, তখন গোটা দেশ আনন্দে উত্তাল হয়ে ওঠে। আপামর জনগণের মনে হয়, নির্যাতিতার পরিবার বিচার পেয়েছে, আর এই দেশের নাগরিক হিসেবে, তারা পেয়েছে স্বস্তি। এমন ঘৃণ্য অপরাধের এই শাস্তিই তো হওয়া উচিত! আজকাল আর কেউ আশা করে না যে আইনি ব্যবস্থায় সঠিক বিচার মিলবে। তাই বিচারের ভাষাকে বদলে দেওয়া হোক বদলায়। মেঘনা গুলজার অবশ্য তাঁর এই ছবিকে এমন দৃষ্টিভঙ্গিগত বিভ্রমের কাচ দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন যেখানে দর্শক ভুগতে পারে দোলাচলে। খাতায়-কলমে সেলফ-ডিফেন্সের জন্য গুলি চললেও আদতে কি এনকাউন্টার? – ঘটনার সত্যতা যাচাই করতেই ন্যায়পরায়ণ ডিসিপি আজুনি কোহলি (করিনা কাপুর খান) ও তার টিমের আবির্ভাব। বিচারক বাবার (কানোয়ালজিৎ সিং) মেয়ে হিসেবে আইনেই আস্থা তাঁর – “লেট দ্য ল’ ডু ইটস ডিউটি”।
মেঘনা গুলজার, সীমা আগরওয়াল ও যশ কেসওয়ানির সঙ্গে মিলে যে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন, তা এই দুই ডিসিপি-কে মুখোমুখি দাঁড় করায়। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, আইনকে কি সত্যি নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায়? যে দেশে দিনের পর দিন আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে (উল্লেখ্য, এখানে তুলে আনা হয়েছে ‘নির্ভয়া’ কেসের কিশোর অভিযুক্তের কথাও যে পরিচয় পালটে নিজের জীবন কাটাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে। অথচ সেই অপরাধে সব থেকে হিংস্র অংশগ্রহণ নাকি তারই ছিল), আর তার ফলে নির্দ্বিধায় কিছু মানুষ একই কাজ করে চলেছে – সেখানে এই শাস্তিই তাদের পাওয়া উচিত?

পৃথ্বীরাজ সুকুমারন তাঁর অভিনয়ে আবেগের ভারসাম্য রাখতে জানেন। কেবলমাত্র মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে তিনি তাঁর রাগ, হতাশা, প্রতিশোধের স্পৃহা সবটা ফুটিয়ে তুলেছেন।
হয়তো এই দেশেরই নাগরিক বলে পরিচালক নিজেও দাঁড়িপাল্লার একটা দিকের প্রতি পক্ষপাতী থেকে গিয়েছেন, যা তাঁর চিত্রনাট্যেও পরিষ্কার। পৃথ্বীরাজ সুকুমারন তাঁর অভিনয়ে আবেগের ভারসাম্য রাখতে জানেন। কেবলমাত্র মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে তিনি তাঁর রাগ, হতাশা, প্রতিশোধের স্পৃহা সবটা ফুটিয়ে তুলেছেন। এই ছবি প্রায় পুরোটাই একা টেনে দিয়েছেন। অন্যদিকে আজুনির চরিত্রে করিনা কাপুর খানকে সংযত লাগলেও চরিত্র হিসেবে তাঁর করা প্রশ্নগুলো খুব একটা জোর পায়নি এই গল্পে। সেটা তাঁর দোষ নয়, চিত্রনাট্যের দোষ। জিতেন্দ্র যোশী ও ক্ষিতি যোগের অভিনয় বেশ জোরালো। সৌরভ গোস্বামীর চিত্রগ্রহণে গল্পের কঠিন ও অন্ধকার দিক ধরা পড়ে। ছবির দুই জায়গায় এক অ্যাসিড হামলার শিকার ও আরুশি ধাবার উপস্থিতিও নজর এড়ায় না। ‘দায়রা’ আইনের দুই প্রতিপালকের দু’রকম দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করলেও আদতে পুলিশ-রিভেঞ্জ ড্রামা হয়েই থেকে যায়। সেখানেই এই ছবির সার্থকতা নাকি ব্যর্থতা? তা দর্শক বিচার করবেন।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জব্দ করেন পাকিস্তানকে, ‘র’ প্রতিষ্ঠাতার ‘৭১-এর মিশন এবার সিনেমায় দেখাবেন করণ জোহর
-
সিআইডি-র জিজ্ঞাসাবাদের মাঝেই অসুস্থ বিধায়ক পরেশরাম, ভর্তি এসএসকেএমে
-
অফসাইড গোলে চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান! ‘রাগে’ শিল্ড বয়কট করল মহামেডান
-
রাতের হাওড়া স্টেশনে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি! আটক করে ব্যাগ খুলতেই তাজ্জব রেল পুলিশ, দেখলেন…
-
সাড়ে তিন কাঠা জমি-ভিটেমাটি গিলে খেয়েছে গঙ্গা! স্বামীর একটিমাত্র ঘর আঁকড়ে মুর্শিদাবাদের কল্পনা