এ বছরের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা এশিয়ান ছবি নির্বাচিত হয়েছে অনুপর্ণা রায়ের ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’। নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ড জিতেছে তাঁর ছবিটি। মুম্বইয়ে জীবিকার টানে ভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা বলে এই ছবি। গত বছর ৮২তম ভেনিস ফেস্টিভ্যালেও ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’-এর জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের সম্মান অর্জন করেছিলেন পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা। যে ছবির বিষয় ছিল প্রধানত দু’জন রুমমেটের সম্পর্কের গল্প নিয়ে। অনুপর্ণার যাত্রা আক্ষরিক অর্থেই রূপকথার মতো। পরপর দু’বার এত বড় মঞ্চে বঙ্গকন্যার স্বীকৃতি ঐতিহাসিক। যা আর কোনও ভারতীয় পরিচালকের ক্ষেত্রে ঘটেনি। সোমবার ভেনিস থেকেই ফোনে অনুপর্ণা জানালেন, ‘পুরোটাই স্বপ্নের ঘোরের মতো লাগছে।’
পরপর দুবার এই সাফল্য। ভেবেছিলেন?
পরপর দু’বার এই সাফল্য ভাবিনি। তবে স্বপ্ন তো অবশ্যই দেখেছিলাম। যদি আরেকবার পারা যায়। চেষ্টা ছিল, যেটা ভেনিস পূর্ণ করে দিল।
আরও পড়ুন:
দেশে ফিরে কী প্ল্যান?
দেশে ফিরে পরিকল্পনা হল, তৃতীয় সিনেমার কাজ শুরু করা। নিজের ক্রাফ্টে বসা। আমার মেন্টরস অনির্বাণ মাইতি, নীরজ সহায়, পরেশ স্যর, এঁদের সঙ্গে দেখা করে আরেকটা বড় প্ল্যান করতে চাই। কিছু ভালো বই পড়তে চাই। আমি খুব উত্তেজিত কিছু ভালো ফিকশন-নন ফিকশন পড়ার জন্য। যে সিনেমাটা লিখছি, তার রিসার্চ শুরু করতে চাই।
বাবা, আমাকে এটাই বুঝিয়েছে, ‘যদি তুই কোনওদিন জিততে না পারিস, মন খারাপ করবি না। শিখে আসিস।’ সেই কথা মাথায় রেখেই এগোতে চাই। সব সময় তো পুরস্কার মানেই অ্যাচিভমেন্ট, বা অ্যাচিভমেন্ট মানেই পুরস্কার নয়। নিজেকে শিখতে হবে।
এবারের ছবির বিষয়টা একটু বলবেন?
ছবির বিষয় এক্ষুনি বিশদে বলতে পারব না, তবে আমি যে পুরুলিয়াতে বড় হয়েছি, অনেক কোল মাইনে ঘেরা অঞ্চল। আমার বাবা ওখানে ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। কিছুটা সেই জীবন ঘিরে, একটা কাপলের ওপর হবে ছবিটা। তাদের জীবন, জটিলতা, ডিসফাংশনাল ম্যারেজের ওপর বিষয় করে গল্পটা। একদম হিউম্যান স্টোরি। আমার আগের দুটো সিনেমা থেকে এই গল্পটা প্রচণ্ড আলাদা হবে। এর চেয়ে বেশি বলতে পারছি না। সিনেমার শুটিং ঝাড়খণ্ডে হবে।

বাবা-মা এখন কী বলছেন?
খুব খুশি। আমার ভেনিসে প্রথমবারের পরে ওঁরা অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। বুঝতে পেরেছেন যে, মেয়ে হয়তো একটা ভালো কিছু অ্যাচিভ করার চেষ্টা করছে। এখন তাঁরা খুব খুশি। যখনই কথা হয় ওঁরা বলেন আরও পড়াশোনা করতে, লিখতে। বোঝার চেষ্টা করেন আমার পেশাকে, যেটা আগে ছিল না। ওটা নতুন অভিজ্ঞতা আমার। আমি সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব, ওঁদের গর্বিত করার জন্য। আশা রাখি ওঁদের আবার গর্বিত করতে পারব। যদি না পারি আবার শিখব, ট্রাই করব। বাবা, আমাকে এটাই বুঝিয়েছে, ‘যদি তুই কোনওদিন জিততে না পারিস, মন খারাপ করবি না। শিখে আসিস।’ সেই কথা মাথায় রেখেই এগোতে চাই। সব সময় তো পুরস্কার মানেই অ্যাচিভমেন্ট, বা অ্যাচিভমেন্ট মানেই পুরস্কার নয়। নিজেকে শিখতে হবে। যদি ভারতীয় সিনেমা নিয়ে আমি সিরিয়াস হতে চাই। আর যদি সিরিয়াস না হই– একটার পর একটা সিনেমা বানিয়ে যাও, হল-এ রিলিজ করে যাও। কিন্তু আমার লক্ষ্য সেটা নয়, লক্ষ্য হল ভারতীয় সিনেমাকে আরও ভালোভাবে বোঝা। এত বড় বড় পরিচালকদের থেকে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। যেমন– জোয়া আখতার, কিরণ রাও, মীরা নায়ার ম্যাম, নন্দিতা দাশের কথাও বলব। তাঁরা যেমন ইন্ডিয়ান সিনেমা নিয়ে অনেক সচেতন, তাঁরা অনেকটা দায়িত্ব নিয়েছেন। আমার মনে হয় আমারও সেই সময়টা এসেছে। এই মানুষগুলো থেকে একটু শিখি, বোঝার চেষ্টা করি ইন্ডিয়ান সিনেমাকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আমি খুবই কনস্ট্রাক্টিভ ওয়েতে ব্যাপারটা ভাবছি। অনেক কিছু শেখার আছে। আই অ্যাম ফরএভার আ স্টুডেন্ট অফ সিনেমা।
আমার কাছে কলকাতা মানে বিপ্লব, পড়াশোনা, সাহিত্য। সেটাই খুব ভালো লাগে।
পুরুলিয়া হয়ে কি কলকাতায় আসবেন?
ইয়েস, হোয়াই নট। আমি কলকাতায় জীবনের কম সময়ই কাটিয়েছি। কিন্তু যতখানি কাটিয়েছি, সব যাদবপুর ইউনিভার্সিটি, এসআরএফটিআই চত্বরেই অনেক সুন্দর সময় কাটিয়েছি। দু’মাস ওখানে ছিলাম অনির্বাণ মাইতি স্যরের থেকে কিছু জিনিস শেখার জন্য। আমার কাছে কলকাতা মানে, বিপ্লব। আমি কলকাতায় যতবার গিয়েছি, সে একটা দিনের জন্য হলেও, নিজের বুকের মধ্যে বিপ্লব নিয়ে ফিরেছি। আমার কাছে কলকাতা মানে বিপ্লব, পড়াশোনা, সাহিত্য। সেটাই খুব ভালো লাগে।

দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বড় মঞ্চে আমরা দেশকে রিপ্রেজন্ট করেছি। আশা করি সরকার বিষয়টায় মান্যতা দেবেন। শিল্প-সংস্কৃতি-সিনেমার প্রতি তাদের ভালোবাসা নিশ্চিত ভাবেই আছে।
‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ এখনও সেন্সরে আটকে। আপনি আশাবাদী?
‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ সেন্সরে আটকে আছে এটা বলব না। ছবিটি রিভিউ করছে। সব বিভাগেই তো কিছু নিয়মকানুন আছে। আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে দেশের সংবিধানের প্রতি। যথেষ্ট আশাবাদী সেন্সর বোর্ড নিয়ে, এনএফডিসি এবং ভারত সরকার নিয়েও। আমি নিশ্চিত যদি তাদের রিভিউ হয়ে যায়, তারা ভালোবাসা, বন্ধুত্বের বন্ডিং খুঁজে পাবে। ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ শুধু এগুলো নিয়েই কথা বলেছে। আমি এক্সাইটেড যে, ছবিটা নিজেদের দেশেও দেখা যাবে। কারণ, আমাদের দেশকে আমরা রিপ্রেজেন্ট করেছি ভেনিসে। ছবিটা প্রতিযোগিতা বিভাগে ছিল। তা নিয়ে গর্বিত। এই বছরেও ‘লাভার্স ইন দ্য ব্লু নাইট’ একমাত্র ভারতীয় ছবি ছিল এই বিভাগে। তাই মনে করি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বড় মঞ্চে আমরা দেশকে রিপ্রেজন্ট করেছি। আশা করি সরকার বিষয়টায় মান্যতা দেবেন। শিল্প-সংস্কৃতি-সিনেমার প্রতি তাদের ভালোবাসা নিশ্চিত ভাবেই আছে। আমার ছবিটা শুধুই ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের কথা বলে। তাই সেন্সর বোর্ডে আটকে থাকার বিষয় নয়, সেন্সর বোর্ড নিশ্চয় ফার মোর ওয়াইজ অ্যান্ড ইন্টেলেকচুয়াল ইন টার্মস অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং বেসিক থিম অফ দ্য ফিল্ম।
বাংলা ছবির প্ল্যানটা কতদূর ?
বাংলা সিনেমাটার কথা একদমই বলতে পারব না। প্রযোজক আমাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলেন ঠিকই। প্রাথমিক স্তরে হ্যাঁ বলেছিলাম। চুক্তি হয়নি। কনট্র্যাক্টের জন্য অপেক্ষা করতে বলেছিলাম প্রযোজককে, খবরের আগে। এখন ব্যাপারটা থেকে একটু দূরে রেখেছি নিজেকে। ঠিক জানি না হবে কি না। যদি হয়, ভালো। আমার প্রথম বাংলা সিনেমা কী হবে অলরেডি ভেবে ফেলেছি। যদি কেউ আগ্রহী হয়, এগিয়ে আসতে পারে। এবং আলোচনা হতে পারে। তবে বেশ আগে যা খবর হয়েছে মনে হয় না হবে। প্রযোজকের সঙ্গে আর কোনও কথা হয়নি।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
জন্মদিনে সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদনের সূচনা প্রধানমন্ত্রীর, বললেন, ‘বিশ্বমঞ্চে ভারতের ক্ষমতা দেখিয়েছে ব্রিকস’
-
রেলের অ্যাপে লোকাল ট্রেনের টিকিট কাটতে সমস্যা মা-বাবার? এবার কেটে দিতে পারবেন আপনিই
-
নবান্নে ইতি, মহালয়াতেই রাইটার্সে ফিরবেন শুভেন্দু! শুরুতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গী ৬ মন্ত্রী
-
‘গম্ভীর, অহেতুক দল বদল করো না’, ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিয়ে প্রাক্তন সতীর্থকে পরামর্শ যুবরাজের
-
‘সনাতনী’ ঘুড়িতে ছয়লাপ বাজার, বিশ্বকর্মা পুজোয় আকাশের দখলও পদ্মের!