ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী থাকতে চলেছে গোটা দেশ। এই প্রথমবার রাজ্যসভা পেতে চলেছে সমকামী সাংসদ। বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীকে (Menaka Guruswamy) প্রার্থী হিসাবে বেছে নিয়েছে তৃণমূল। আর এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের শাসক শিবিরের হাত ধরেই ভারতীয় রাজনীতিতে হতে চলেছে নয়া ইতিহাস রচনা।
ন্যাশনাল ল স্কুল, হার্ভাড এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন।
আরও পড়ুন:
শুক্রবার রাতে এক্স হ্যান্ডেলে আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য প্রার্থী তালিকায় বিরাট চমক দিয়েছে তৃণমূল। সেখানে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবেই রয়েছে মেনকার নাম। তৃণমূলের অন্দরে একাংশের মত, সাম্প্রতিককালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সদ্যই সমকামী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে নেদারল্যান্ড। অতীতে আইসল্যান্ড, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড এবং সার্বিয়ার মতো দেশ রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষদের পেয়েছে। কিন্তু সেই অর্থে এশিয়ার দেশগুলিতে এমন নজির তো নেই-ই, তাঁদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণও কম। ভারতের মতো সবচেয়ে গণতন্ত্রেও সে রকম উদাহরণ এতদিন ছিল না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতার কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বদলের বার্তা দিল বঙ্গের শাসকদল।
সন্দেহ নেই, এই বার্তার নিশানায় রয়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি। কারণ, এ বিষয়ে তাদের সামাজিক অবস্থান অনেকটাই ‘রক্ষণশীল’। নানা সময়ে তাদের সেই ছুৎমার্গ প্রকাশ্যেও এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূল নেতৃত্ব আদতে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন, তাঁরা কোনও রকম ‘গোঁড়ামি’তে বিশ্বাসী নন। তৃণমূলের এই ‘বলিষ্ঠ’ অবস্থানের নির্যাস হল— সামাজিক পরিচয় সকলেরই প্রাপ্য। সেখানে ধর্ম বা জাতি বা লিঙ্গ কোনও প্রতিকূলতা তৈরি করতে পারে না।
ঘটনাচক্রে, মেনকার বাবা মোহন গুরুস্বামী বিজেপিরই প্রাক্তন কোঁসুলি। অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহার বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে যশবন্ত নিজেও তৃণমূলে যোগ দেন।
ভারতের ইতিহাসে যুগান্তকারী দিন ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। সে দিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ৩৭৭ ধারা বাতিল হয়। এর আগে এই ধারায় ‘সমকামী প্রেম’ অপরাধ বলে গণ্য হত। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলে, দু’জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হওয়া সমকামী ক্রিয়াকলাপকে অপরাধ বলা যাবে না। যৌন সংখ্যালঘু মানুষেরা যে বহুকাল ধরে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের বৈষম্যের শিকার তা স্বীকার করে শীর্ষ আদালত বলে, যৌন সংখ্যালঘু মানুষেরা সমাজে সম মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অধিকারী। সমকামিতাকে আইনি অপরাধের আওতা থেকে মুক্ত করতে ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন মেনকা। ঘোষিত ভাবেই তিনি ‘এলজিবিটি’ অংশের প্রতিনিধি। ৩৭৭ ধারা বাতিলের ‘সুপ্রিম’ রায়কে ব্যক্তিগত জয় বলে উল্লেখও করেছিলেন মেনকা।
তৃণমূলের একটি অংশের মত, যে কোনও সমাজের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে তার প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের উপর। ভারতের সামাজিক মূল্যবোধে সমকামিতার চর্যা নিন্দনীয় ও অস্বাভাবিক বলে মনে করা হয়, তাই আইনের চোখে তা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। কেন্দ্রের বর্তমান সরকারও সে ব্যাপারে বিশেষ সচেষ্ট হয়নি। তাই মেনকার মতো একজন প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষকে সংসদে এনে এ বিষয়েও বার্তা দেওয়া যাবে।
পারিবারিক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা যা-ই হোক না কেন, বরাবর স্বাধীনভাবেই জীবনপথে এগিয়ে গিয়েছেন মেনকা। ছোট থেকেই ছাত্রী হিসাবে অত্যন্ত উজ্জ্বল মেনকা। ন্যাশনাল ল স্কুল, হার্ভাড এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে জোরাল সওয়াল করেছেন মেনকা।

- ছত্তিশগড়ের মাওবাদী দমনে তৈরি ‘সলওয়া জুড়ুমে’র বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।
- মণিপুরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা হত্যার অভিযোগে ‘অ্যামিকাস কিউরি’ হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
- অগস্ত ওয়েস্টল্যান্ড ভিভিআইপি কপ্টার দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত প্রাক্তন বায়ুসেনা প্রধান এসপি ত্যাগীর আইনজীবী ছিলেন মেনকা।
সম্প্রতি তিনি তৃণমূলের করা আইপ্যাক মামলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হয়ে সুর চড়িয়েছিলেন। শুনানিতে অ্যাডিশনাল সলিসিটার জেনারেল এসভি রাজুর সঙ্গে বাকবিতণ্ডাতেও জড়িয়েছিলেন। যা নিয়ে চর্চা কম হয়নি। বিশিষ্ট আইনজীবী মেনকা অত্যন্ত পরিচিত মুখ।

সেই মেনকাকেই রাজ্যসভায় মনোনয়ন দিয়েছে তৃণমূল। জয়ী হলে তিনিই হবেন প্রথম সমকামী সাংসদ। তৃণমূলের এহেন সিদ্ধান্ত যে ভারতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।