আইপিএল যেন ‘টাকার ডিম পাড়া হাঁস’! ট্রফির মুখ না দেখেও কীভাবে ধনকুবের দিল্লি-পাঞ্জাব?
আইপিএলের ব্যবসায়িক মডেল এমনভাবে সাজানো, যেখানে ট্রফি না জিতেও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বিপুল মুনাফা লাভ করতে পারে।
প্রতিটি দলের বাজারমূল্যই এখন প্রায় ৫০০ কোটির আশপাশে। কোথাও আরও বেশি। প্রশ্ন উঠতেই পারে, মাঠে ফল ভালো না হলেও কীভাবে এমন আর্থিক সাফল্য সম্ভব? উত্তর লুকিয়ে আছে আইপিএলের বিশাল ব্র্যান্ড ভ্যালু, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট বিক্রি, মার্চেন্ডাইজিং এবং বিশ্বজোড়া দর্শকপ্রিয়তায়। তাই এখানে শুধু ট্রফি নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজির আসল জয় অনেক সময় ঘটে বাণিজ্যের মঞ্চেই।
আরও পড়ুন:
১৮টি আসর পেরিয়ে গিয়েছে। একবারও ট্রফি জেতা হয়নি পাঞ্জাব কিংস এবং দিল্লি ক্যাপিটালসের। প্রথমে আসা যাক প্রীতি জিন্টার ফ্র্যাঞ্চাইজির কথায়। গতবছর ফাইনালে উঠেও হারতে হয়েছিল তাদের। তা সত্ত্বেও পাঞ্জাবের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯,৫৬১ কোটি টাকা। দিল্লি ক্যাপিটালসও শিরোপাহীন। তবু বাজারমূল্যে তারা পিছিয়ে নেই। প্রায় ৪৯২০ কোটি।
প্রত্যেক ফ্র্যাঞ্চাইজির জন্য রয়েছে নিশ্চিত আয়ের ব্যবস্থা। প্রতি বছর আনুমানিক ৪৮৪ কোটি টাকা পায় দলগুলি। যে দল পয়েন্ট তালিকার একেবারে তলানিতে, সেও পায়। এর মূল কারণ, বিসিসিআই ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের জন্য ডিজনি স্টার ও ভায়াকম১৮-র সঙ্গে ৪৮,৩৯০ কোটি টাকার বিশাল মিডিয়া রাইটস ডিল করেছে। সেই অর্থের বড় একটা অংশ সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয় দলগুলির মধ্যে।
আরও পড়ুন:
আইপিএলের ব্যবসায়িক মডেলের অন্যতম বড় শক্তি হল ব্যয়ের নির্দিষ্ট সীমা। যেখানে লোকসানের সুযোগ প্রায় নেই। প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি এক মরশুমে ক্রিকেটারদের বেতনের জন্য সর্বোচ্চ ১২০ কোটি টাকা খরচ করতে পারে। এর সঙ্গে যাতায়াত, হোটেল, সাপোর্ট স্টাফ-সহ অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়বাবদ ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকা যোগ করুন। মোট খরচ সাধারণত ১৫০ থেকে ১৭০ কোটি টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
স্পনসররা কেবল ট্রফির জন্য নয়, তারা টাকা ঢালে দর্শকদের মনোরঞ্জিত করার জন্য। এই জায়গাতেই আইপিএলের শক্তি সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে সিএসকে'র অফিসিয়াল স্পন্সর হয়েছে ইতিহাদ এয়ারওয়েজ। ২০২৫ সালে তাদের জার্সির সামনে এই সংস্থার লোগো জায়গা পায়। চলতি মরশুমে ইতিহাদের পাশাপাশি অশোক লেল্যান্ড অফিসিয়াল জার্সি স্পনসর হিসেবে দলে যোগ দেয়।
শুধু শীর্ষ দলই নয়, পয়েন্ট তালিকার তলানিতে থাকা দলগুলোর জার্সিতেও দেখা যায় ১০ থেকে ১২টি ব্র্যান্ড লোগো। যার প্রতিটির মূল্যই কোটি টাকার সমান। গত আইপিএলে বিজ্ঞাপন থেকেই আয় পৌঁছেছিল আনুমানিক ৪,৫০০ কোটি টাকায়। স্কোরবোর্ডে জয়-পরাজয়ের অঙ্ক যেমনই লেখা থাক, আইপিএলের প্রতিটি ম্যাচই যেন বাণিজ্যিক মহোৎসব। পরাজিত দলের জার্সিতে জায়গা পাওয়া কোনও ব্র্যান্ডও অন্তত ৫০ কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়।
টানা ১৭ বছর শিরোপাহীন ছিল আরসিবি। তা সত্ত্বেও ব্যবসায়িক সাফল্যে শীর্ষে ছিল তারা। ২০২৫ সালে প্রথম ট্রফি জয়ের আগেই ২০২৪ সালে তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল্য পৌঁছায় ১২,৬০০ কোটি টাকায়। বেঙ্গালুরুর বিশাল বাজার, বিরাট কোহলির ব্র্যান্ড ইমেজ, স্পনসরশিপ, সোশাল মিডিয়ায় চার কোটি অনুসারী, সেন্ট্রাল পুল পেমেন্টের জোরেই তারা প্রমাণ করেছে ট্রফি না এলেও কীভাবে লক্ষ্মীলাভ করা সম্ভব।
আইপিএল জিতলে অবশ্যই আর্থিক লাভ হয়, তবে তা মোট আয়ের তুলনায় খুব বড় অংশ নয়। শিরোপা জয়ের প্রভাব বার্ষিক আয়ে বাড়তি ৫ শতাংশের বেশি নয়। বাকি ৯৫ শতাংশ আসে মূল ব্যবসা থেকে। আইপিএল চ্যাম্পিয়ন দল পুরস্কার হিসাবে পায় ২০ কোটি টাকা। অথচ যে ফ্র্যাঞ্চাইজির বার্ষিক আয় ৫০০ কোটি টাকা, তাদের মোট আয়ের মাত্র ৪ শতাংশ এই পুরস্কার অর্থ।
উদাহরণ হিসেবে পাঞ্জাব কিংসকে ধরা যায়। ২০২৫ সালে তারা ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে পারেনি। তবু গতবার কেবল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিবিউশন থেকেই তারা পেয়েছিল ২২৯ কোটি টাকা। স্পনসররা সরে যায়নি। ফ্র্যাঞ্চাইজির ভ্যালুয়েশন ছিল আগের মতোই প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকায়, অটুট। অর্থাৎ, ট্রফির মূল্য ২০ কোটি টাকা হতে পারে, কিন্তু ব্যবসার মূল্য দাঁড়িয়ে থাকে হাজার হাজার কোটিতে।
কেন এই মডেল সফল? আইপিএল মূলত এনএফএল ও এমবিএ-র ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করেছে। এই দুই লিগে কোনও দল দেউলিয়া হওয়ার নজির নেই। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ফুটবলে পরিস্থিতি ভিন্ন। বহু ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আর্থিক সংকটে পড়েছে। এফসি বার্সেলোনা টিকে থাকতে ভবিষ্যতের আয়ের অংশ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। ভ্যালেন্সিয়া সিএফ প্রশাসনিক জটিলতার মুখেও পড়েছে।
চমক এখানেই শেষ নয়। ২০২৭ সালের পরবর্তী মিডিয়া রাইটস বর্তমান ৪৮,৩৯০ কোটির চেয়েও বড় হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে দল জিতুক বা হারুক, প্রত্যেক ফ্র্যাঞ্চাইজিই ফুলেফেঁপে উঠছে। সঙ্গে রয়েছে দর্শক উন্মাদনা। এবার উদ্বোধনী সপ্তাহে আইপিএল দেখেছেন ৫১ কোটি ৫০ লক্ষ অনুরাগী। গড়ে ৭২ মিনিট ম্যাচ দেখছেন। এছাড়া স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে ম্যাচ উপভোগের সংখ্যাও বাড়ছে। সবমিলিয়ে একেবারে সময়ে সোহাগা ব্যাপার!