দিঘা-মন্দারমণি অতীত! কলকাতার কাছে এই ১০ সৈকতে গরমেও মিলবে হিমেল পরশ, যাবেন নাকি?
কলকাতার খুব কাছেই রয়েছে ‘এক দল’ সমুদ্র সৈকত। সে খবর কি আপনি রাখেন? পড়তি গরমে চড়া রোদ আর ঘামের অস্বস্তি থেকে বাঁচতে পকেট ফাঁকা করে আমরা পাহাড়ে দৌড়োই। বাদবাকিরা সেই চেনা দীঘা-পুরী- তাজপুর। কিন্তু যারা সমুদ্র ভালোবাসেন, যারা দিঘা-পুরীর চেনা ভিড় এড়িয়ে একটু নিরিবিলির খোঁজ করছেন, হাতের কাছেই রয়েছে তাদের জন্য সেরা ১০ ঠিকানা। পশ্চিমবঙ্গের উপকূল আর পড়শি ওড়িশা জুড়ে ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু সৈকত। পকেটে টান না ফেলেই এই সপ্তাহান্তে ঘুরে আসতে পারেন এই ‘সোনাখনি’গুলি থেকে। সঙ্গে উপরি পাওনা লাল কাঁকড়া আর ঝাউবনের গান। যাবেন নাকি?
রহস্যময় লাল কাঁকড়া বিচ: দিঘা বা মন্দারমণি তো বহুবার গিয়েছেন, এবার গন্তব্য হোক দক্ষিণ পুরুষোত্তমপুর গ্রাম। মন্দারমণি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে এই বিচে এখনও পর্যটকদের ভিড় সেভাবে আছড়ে পড়েনি। মাইলের পর মাইল বালির চরে এখানে দেখতে পাওয়া যায় লাল কাঁকড়ার দল। এখানকার সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা এক কথায় অতুলনীয়। কলকাতা থেকে দিঘাগামী ট্রেনে চেপে নামুন চাউলখোলা স্টেশনে। সেখান থেকে টোটো করে চলে যান এই নির্জন সৈকতে।
আরও পড়ুন:
নির্জনতার সুর ডুবলাগিরি: ওড়িশার বালেশ্বর জেলার এই সৈকতটি 'বাগদা বিচ' নামেও পরিচিত। ঝাউবনের নিস্তব্ধতা আর পাখির কলকাকলিতে ঘেরা এই জায়গাটি শহরের কোলাহল ভুলিয়ে দেবে। এখানে সমুদ্রের তীরে ক্যাম্পিং করার সুবর্ণ সুযোগ মেলে। রাতে তাবু থেকে সমুদ্রের গর্জন শোনার রোমাঞ্চই আলাদা। হাওড়া থেকে বালেশ্বর গিয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছে যান ডুবলাগিরি। আপনি চাইলে কলকাতা থেকে সরাসরি চার-পাঁচ ঘণ্টার রোড ট্রিপও সেরে ফেলতে পারেন।
তারাদের মেলায় যমুনাসল: আপনি কি উত্তাল ঢেউ আর নির্জনতা পছন্দ করেন? তবে ওড়িশার যমুনাসল আপনার জন্য আদর্শ। এই বিচে ভিড় নেই বললেই চলে। রাতের পরিষ্কার আকাশে তারার মেলা আর সামনে ফেনিল সমুদ্র— এই দৃশ্য ভোলা কঠিন। এখানে আপনি চাইলে স্থানীয়দের সাহায্যে নদীতে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাও নিতে পারেন। হাওড়া বা সাঁতরাগাছি থেকে ট্রেনে বাস্তা স্টেশনে নেমে মাত্র ৩১ কিলোমিটার পথ গাড়িতে গেলেই মিলবে এই সৈকত।
অজানা দ্বীপ বগুরান জলপাই: কাঁথি থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সৈকতটি এক শান্ত স্বর্গোদ্যান। চারিদিকে ঘন ঝাউবন আর মাঝে এক টুকরো তটরেখা। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার রাতে এখানকার সমুদ্রের রূপ দ্বিগুণ হয়ে যায়। তবে এখানেও লাল কাঁকড়ার দেখা মিলতে পারে। বাসে বা গাড়িতে কাঁথি পৌঁছে সেখান থেকে টোটো ধরে পৌঁছে যান বগুরান জলপাই।
আরও পড়ুন:
রোমাঞ্চের হাতছানি লালগঞ্জ: বকখালি বা মৌসুনি তো এখন বেশ পরিচিত, কিন্তু নামখানার কাছে লালগঞ্জ সৈকত এখনও কিছুটা অচেনা। যারা হঠাৎ করে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য ১২০ কিমি দূরের এই বিচ চমৎকার অপশন। শিয়ালদহ থেকে নামখানা লোকালে চেপে স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে টোটো করে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই শান্ত উপকূলে।
ঐতিহাসিক গোপালপুর অন সি: নিছক সমুদ্র স্নান নয়, বরং আভিজাত্য আর ইতিহাসের ছোঁয়ায় ছুটি কাটাতে চাইলে ওড়িশার গোপালপুর সেরা। সোনালি বালি আর নীল জলরাশির এই সৈকতে দূষণ নেই বললেই চলে। এখানকার পুরনো লাইট হাউসটি ১৬৫টি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলে পুরো এলাকার প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। তবে মনে রাখবেন, এখানকার সমুদ্র বেশ গভীর, তাই স্নান না করাই শ্রেয়।
যমজ ভাই বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ: কলকাতা থেকে ১২৫ কিমি দূরে অবস্থিত বকখালি ও ফ্রেজারগঞ্জ যেন যমজ দুই ভাই। এখানে সমুদ্র শান্ত, তাই নিশ্চিন্তে স্নান করা যায়। এই সৈকত এলাকাটি ম্যানগ্রোভ অরণ্য আর উন্মুক্ত চিড়িয়াখানার জন্য বিখ্যাত। কাছেই রয়েছে কুমীর প্রকল্প। বকখালি গেলে হেনরিজ আইল্যান্ড ঘুরে আসতে ভুলবেন না। সেখানে নৌকায় চড়ে জম্বুদ্বীপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সারা জীবন মনে থাকবে।
শঙ্করপুরের দ্বিবিধ রূপ: দিঘার খুব কাছে হলেও শঙ্করপুর একদম আলাদা মেজাজের। এর একপাশে রয়েছে কর্মব্যস্ত মৎস্যবন্দর, যেখানে বড় বড় ট্রলার আর টাটকা মাছের বাজার বসে। অন্যপাশে নিঝুম ঝাউবনে ঘেরা নির্জন সমুদ্র সৈকত। যারা পরিবার নিয়ে শান্তিতে পিকনিক করতে চান, তাঁদের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ জায়গা। দিঘা থেকে মাত্র ১৩ কিমি দূরে অবস্থিত এই বিচে সূর্যাস্তের দৃশ্য অপূর্ব।
ওড়িশার রত্ন তালসারি: বাংলা ও ওড়িশা সীমান্তের এই সৈকতটি গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা এক মায়াবী জায়গা। তালসারি মানেই তাল গাছের সারি, সঙ্গে নারকেল আর ঝাউবনের হাতছানি। এখানে লাল কাঁকড়া আর ম্যানগ্রোভের আধিক্য চোখে পড়ে। শান্ত সমুদ্রের পাড়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। দিঘা থেকে মাত্র ১০ কিমি দূরে অবস্থিত এই জায়গায় চন্দনেশ্বর মন্দির হয়ে পৌঁছানো যায়।
আধ্যাত্মিক সাগরদ্বীপ: গঙ্গা আর বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত সাগরদ্বীপ বা গঙ্গাসাগর। কপিল মুনির মন্দিরের কাছে এই সৈকতটি বেশ পরিষ্কার এবং শান্ত। হালকা রঙের বালির চরে হাঁটতে হাঁটতে মনের শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। কলকাতা থেকে কাকদ্বীপ হয়ে মুড়িগঙ্গা নদী পেরিয়ে কচুবেড়িয়া পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে গাড়ি বা বাসে মূল সৈকত। তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত হলেও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
নির্জনে সপ্তাহান্তের ছুটি: বাঙালির সমুদ্র প্রেমের কোনও সীমানা নেই। দিঘা, মন্দারমণি বা পুরীর ভিড় ঠেলে যারা একটু স্বস্তি চান, তাঁদের জন্য এই অফবিট সৈকতগুলি এক একটা মুক্তাঞ্চল। এই সব জায়গাতেই বাজেট আপনার হাতের নাগালে। নেই বড় শহরের কৃত্রিমতা। আছে কেবল সমুদ্রের গর্জন আর ঝাউবনের শিরশিরানি। গরমে প্যাচপ্যাচে অস্বস্তি ভুলে এই সপ্তাহান্তেই বেরিয়ে পড়ুন। দেখবেন, ঘরের কাছেই লুকিয়ে আছে এক টুকরো বিদেশ।