তিনি বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী। ২০১১ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সে দায়িত্ব সামলেছেন। আবারও পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে যাওয়ার পর ২০২১ সাল থেকে সামলেছেন গুরুভার। ফলত সইতে হয়েছে শিক্ষক দুর্নীতির কাঁটাও। এছাড়াও তাঁর পরিচয় অধ্যাপক, লেখক, নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তিনি দমদম কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী। সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)।
প্রশ্ন: কেমন আছেন?
উত্তর: ভালোই আছি, প্রচারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। পার্টির প্রেস কনফারেন্স চলছে। পডকাস্ট-লেখালেখি তো আছেই।
প্রশ্ন: বিরোধীদের আক্রমণের প্রধান হাতিয়ার এখন শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি। তীর সবার আগে আপনার দিকেই।
উত্তর: বিরোধীরা যে বলে, একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যামপোস্ট! আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তুলনায় বাকিরা এতটাই গৌণ যে, মানুষের ভালোবাসা ও আক্রমণ দুই-ই তাঁকে ঘিরেই থাকে। আমার মতে, শিক্ষা নিয়ে যে সমস্যা, তার সমাধান অনেকখানি হয়েছে। গন্ডগোল হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা যত না পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কারণে, তার চাইতে বেশি কোনও ব্যক্তিবিশেষের কারণে। তাঁর কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু উদ্ধার হয়েছিল, কিন্তু তার সঙ্গে তো আদৌ শিক্ষা দুর্নীতির যোগসূত্র রয়েছে কি না সেটা এখনও প্রমাণিত নয়। সবচাইতে বড় মুশকিল হয়েছিল, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের অর্ডারে ২৬,০০০-এর চাকরি চলে যাওয়া। সুপ্রিম কোর্টই আবার একজিট গেট দিয়ে রেখেছিল আমাদের। যদি পরীক্ষাটা ঠিক করে নিতে পারি, তাহলে আবার সবাই চাকরি ফেরত পাবে। সেই প্রসেস প্রায় শেষ। এবং প্রায় সকলে চাকরি ফেরত পাচ্ছেন। যে অনিশ্চয়তা বা আশঙ্কা এতগুলো পরিবারে তৈরি হয়েছিল, সেটা মুখ্যমন্ত্রীর বদান্যতায় কাটছে। চাকরি যাওয়া নিয়ে এত কথা বলেন সকলে, চাকরি ফেরত পাওয়া নিয়ে কেন নীরব? ছেলেমেয়েদের পিছনে কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীই থেকেছেন।
আরও পড়ুন:

প্রশ্ন: এবারে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে দল টিকিট দেয়নি। কখনও কি মনে হয়, প্রাক্তন সতীর্থের জন্য কোনওভাবে দল কিংবা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে?
উত্তর: কাকে টিকিট দেবে না দেবে, দল ঠিক করবে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল জেলে যাওয়ার পরে আতিশি মারলেনা দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি কি বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন? অথবা মণীশ সিসোদিয়ার পর যিনি দিল্লির শিক্ষাদপ্তর দেখেছিলেন, তাঁর কি বিড়ম্বনা হয়েছিল? এখনও তো আমার মনে হয়, এর পিছনে কোনও চক্রান্ত রয়েছে। কেন না দেখা গিয়েছে, বিজেপি যাদের বিরুদ্ধে ইডি বা সিবিআই দিয়েছে, তাদের মধ্যে অর্ধেকেই বিজেপিতে যোগ দিয়েছে। আমরা হিমশৈলের উপরিভাগ দেখতে পাচ্ছি। দেশ থেকে বিজেপির ১৫ বছরের ‘রঙ্গাবিল্লা রেজিম’ চলে গেলে আরও অনেক কিছু উঠে আসবে। দ্বিতীয়ত, দেশে এক ধরনের গনগনে প্রতিহিংসার রাজনীতির জন্ম দিয়েছে বিজেপি। কংগ্রেস সম্পর্কে কথা বলতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে টেনে আনেন। নেহরু ১৯৬৪ সালে মারা গিয়েছেন, নেহরুর ভূত এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে। বিজেপির যাওয়া আসন্ন। তাদের স্ক্যাম ধরা পড়ার মুখে।
প্রশ্ন: অর্থাৎ অরবিন্দ কেজরিওয়াল যেভাবে বেকসুর খালাস হয়েছিল, তেমনই আদালত পার্থ চট্টোপাধ্যায়কেও বেকসুর খালাস করতে পারে?
উত্তর: আদালত কী বলবে, সেটা আদালতের ব্যাপার। এক্ষেত্রে আর্থিক দুর্নীতি হোক বা অন্য কিছু, বিষয়টা পলিটিক্যাল। এখানে আমাদের বিড়ম্বনায় ফেলাই বিরোধীদের কাজ, আমাদের কাজ সে বিড়াম্বনা সরিয়ে ফেলা। দপ্তরের প্রত্যেক মন্ত্রীরই দায়িত্ব, তাঁর কাজ দিয়ে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখা।
“আর্থিক দুর্নীতি হোক বা অন্য কিছু, বিষয়টা পলিটিক্যাল। এখানে আমাদের বিড়ম্বনায় ফেলাই বিরোধীদের কাজ, আমাদের কাজ সে বিড়াম্বনা সরিয়ে ফেলা। দপ্তরের প্রত্যেক মন্ত্রীরই দায়িত্ব, তাঁর কাজ দিয়ে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখা।”
প্রশ্ন: দমদমের প্রচারে দেখলাম, আপনার বিরোধীরা বলছে যে নিকাশীর সমস্যা আছে। জল জমছে। রাস্তাঘাট ঠিক নেই। ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) ফের জিতলে এসবের সমাধান হবে?
উত্তর: আমাদের বেশিরভাগ রাস্তাই ঠিকঠাক। পিকে গুহ রোডের একটা অংশ অনেকদিন ধরে খারাপ ছিল। ভোটের বেশ কিছুদিন আগে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করে ১৩ কোটি টাকা এনেছি। রাস্তার কাজ প্রায় শেষ, নিকাশির সমস্যা প্রায় নেই। দমদমবাসীরও মনে আছে যে, বাম আমলে দু’ঘণ্টার বৃষ্টিতে কীরকম জল জমত। এখনও জল জমে, কিন্তু সে সময়ে নামত সাতদিন পরে। এখন পরের দিনই নেমে যায়।
প্রশ্ন: আপনার দুই প্রতিপক্ষ- বিজেপির অরিজিৎ বক্সী এবং বামপ্রার্থী ময়ূখ বিশ্বাস। কেউ কঠিন লড়াই দেবে বলে মনে হয়?
উত্তর: তাঁরা নিজেদের দলের সিম্বল নিয়ে লড়তে এসেছেন। আমার কাজ, এতদিন আমি কী পেরেছি তা জানানো। ওদের কাজ, আমি/আমরা কী পারিনি, তা তুলে ধরা। ওঁরা দু’জনেই নতুন, কমবয়সি। অনেক এনার্জি নিয়ে ভোটে লড়বেন। আমি ওঁদের শুভেচ্ছা জানাব। আর দমদমবাসী ভোটের ক্ষেত্রে যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ই হবে। ওঁরা আমাকে নিয়ে পার্সোনালি কিছু বলতে পারে। হলে আমি সেভাবে জবাব দেব।
প্রশ্ন: আজকাল রাজনৈতিক মতানৈক্য ছাপিয়ে ব্যক্তিগত কুৎসা, অশালীন ব্যবহার, ব্যক্তিআক্রমণ স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নেতারাই তো সমাজের মুখ। তরুণ প্রজন্ম যদি ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আসতে চায়, তারা কি এই পরিবেশ দেখে অনুৎসাহিত হবে?
উত্তর: রাজনীতি সবসময় নীতি-নৈতিকতা মানে না। ব্যক্তির রুচি এখানে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। কে কতটা নৈতিক হবে, সেটা তার ব্যক্তিগত দিক। বাংলায় যখন নির্বাচন ছিল না, কলকাতার নাগরিক ট্র্যাডিশনে সংস্কৃতির দুই ধারক-বাহক ছিল। তরজা ও খেউড়। রাবীন্দ্রিক ব্রাহ্ম সংস্কৃতি তরজা ও খেউড়ের উপর এক ধরনের পলেস্তারা চাপিয়েছিল। যখন ব্রাহ্ম সমাজ তৈরি হচ্ছে, রামমোহন থেকে দেবেন্দ্রনাথ হয়ে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত, সেটা এক ধরনের শীলিত সুভদ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। কিন্তু খেউড় এবং তরজার একটা ইতিহাস আছে। মেইনস্ট্রিম বই যেমন বিক্রি হচ্ছে, বটতলার বইও রগরগিয়ে বিক্রি হচ্ছে। এখন ইউটিউব বা পোর্টাল খুললে দেখা যাবে, সেখানে ভিউ বেশি যেখানে কুৎসা হচ্ছে। তাহলে যে কুৎসা করছে তার দায় বেশি, নাকি যে কুৎসা শুনতে চায় তার দোষ? আমি দু’জনের কাউকেই দোষ দেব না। আবার যে আধুনিক প্রজন্মের কথা বলছেন, ওরা শুনে মজা পায়, খিল্লি করে। কিন্তু জানে যে, কতটা কৌতুক হিসেবে নেব আর কতটা ফেলে দেব। অনেকে বলে জেন-জি-র আবেগ নেই- মিথ্যা কথা। আমাদের প্রজন্মে আবেগের আতিশয্য ছিল। এদের আবেগ পরিমিত।
প্রশ্ন: বামপ্রার্থী ময়ূখ বিশ্বাস ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এক পরিচিত মুখ, সর্বভারতীয় স্তরে বিশেষ পদে ছিলেন। ময়ূখ বিশ্বাস বিজেপির ভোট কেটে আপনার সুবিধা করতে পারেন, এমন মনে হয়? বামের যে ভোট রামে গিয়েছিল, সেটা যদি আবার বামে ফেরে, আখেরে লাভ তো তৃণমূলের!
উত্তর: আমি সিপিআইএমের দৃষ্টি দিয়ে ভোটার দেখি না। আমার কাছে ভোটার পরিবর্তনশীল। গত ১৫ বছর ধরে দমদমের ভোটের প্যাটার্ন দেখে বুঝেছি, এখানকার মানুষ অত্যন্ত সচেতন। এই সচেতনতার সঙ্গে শ্রেণীর সম্পর্ক নেই। আমাদের এলাকায় প্রায় ৪৯ হাজার মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান, তার মানে তো এই নয় যে সবাই আমাকে ভোট দেবেন। তবে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে, তার নিরিখে দমদমে তৃণমূল প্রার্থীর জেতা উচিত। প্রার্থী হিসেবে আমি আশাবাদী। আমার কাজ ঘুরে ঘুরে প্রচার করা, চেষ্টা করা বিরোধীদলের প্রার্থীদের সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য না করা। আর কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখা। কাউন্সিলররা অভিজ্ঞ, রাজনৈতিকভাবে সচেতন। দমদমে তৃণমূল প্রার্থীর দুশ্চিন্তার কোনও কারণ আছে বলে মনে করি না।
প্রশ্ন: রাজনীতিবিদ ব্রাত্য বসু কোন সত্বাটিকে এগিয়ে রাখেন— অধ্যাপক, লেখক, নাকি নাট্যকার ব্রাত্য বসু?
উত্তর: রাজনীতিবিদ ব্রাত্য বসু (Bratya Basu) বলবে, এই তিনটেই বেকার! এগুলো দিয়ে কী যায় আসে রাজনীতির? যে সময়টা লেখালেখিতে দিচ্ছ, সেই সময়টা দমদমে ঘুরে নিকাশি ব্যবস্থায় কী সমস্যা, তা টর্চ ফেলে দেখো! আমাদের মত যারা ল্যাটারাল এন্ট্রি করে পলিটিক্সে, তাদের সমস্যা হচ্ছে, বাড়তি খাতির-মর্যাদার প্রত্যাশা করা। আমলাতন্ত্রের বেশিরভাগই রাজনীতিতে এসে সফল হতে পারে না কারণ সে আজীবন ‘স্যার’ শুনে এসেছে। সে যখন এলাকায় গিয়ে ‘দাদা’ শুনছে, তার এতদিনকার চাকুরিজীবনের আরাম এবং প্রাতিষ্ঠানিক বর্ম নিমেষে ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে! হয়তো আমরা যারা অন্য ক্ষেত্র থেকে রাজনীতিতে এসেছি, কখনও ভাবি মানুষ বলবে, “দাদা, আপনাকে কাল সিনেমায় দেখলাম, কী দারুণ ড্যান্স করলেন নায়িকার সাথে!” কিন্তু এর সঙ্গে আমার রাজনীতির কি সম্পর্ক? এ তো কাম্য নয়। পলিটিক্যাল কোশেন্ট-ই একমাত্র বিবেচ্য। আমার নেত্রী দিল্লিতে এমপিদের যে যে পয়েন্টে লড়তে বলছেন তা আমি অনুধাবন করছি কি-না, আমার নেত্রী/নেতা রাজ্যস্তরে বিজেপি বা বামের বিরুদ্ধে এবং আমাদের উন্নয়নের স্বপক্ষে যে কথাগুলোতে আন্ডারলাইন করতে বলছেন, সেটা আমি ঠিকঠাকভাবে বুঝতে পারব কি-না— এগুলো রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখা উচিত। মানুষজন কিছু বেআইনি অনুরোধও করেন, সেগুলো বলতে হয়, ভেবে দেখছি। আগে হলে বলতাম, পারব না। পনেরো বছরে এইটা শিখেছি।
“রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুতে সরকারকেও কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন, আমি দেখেছি। আমাদের থিয়েটারের একজন গরিমাময় অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী। ১৯৭৭ সালে গঙ্গায় শুট করতে গিয়ে জলে ডুবে মারা যান। সেই সময় বামফ্রন্ট সরকার এসেছে, তাদের কি কোনও দায় আছে?”
প্রশ্ন: আপনি টলিউড ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে এতটা সম্পৃক্ত বলেই প্রশ্ন করছি, সদ্য রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে অত্যন্ত ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে পোস্ট করেছেন।
উত্তর: আমার খুবই অসুবিধা হয়েছে, কারণ ওর শেষ পডকাস্টটাও আমার সঙ্গে করেছে। তার দুদিন পরে আমাকে বলেছে, “ব্রাত্যদা, আমি ‘অশালীন’ সিনেমাটা করব। কী শর্ত?” আমি বললাম, শর্ত আবার কী? রাহুল, তুমি চাইছ, এটাই আনন্দ! বলল, “না, আমি তোমাকে স্ক্রিপ্ট লিখে পাঠাব।” আমি বললাম, কিচ্ছু পাঠাবে না, আমাকে গুরুত্বই দেবে না। ওটা তোমার স্ক্রিপ্ট। ওইটা শেষ কথোপকথন আমাদের। পডকাস্টের সময়ই বলেছিল, “আমাকে বাইরে যেতে হবে, সামনে শুট আছে, আউটডোর।” সমুদ্রধার, তা আমি জানতাম না। আমি সেদিন প্রচার করছি আমার এলাকায়, মোবাইল সাইলেন্ট ছিল। দেখি, অজস্র ফোন আসছে, মেসেজ ঢুকছে। আমি বুঝতে পারিনি। বেরিয়েই প্রথম মেসেজ দেখি, এক বন্ধু লিখেছে, “এই খবরটা কি ঠিক?”
প্রশ্ন: আউটডোর শুটিংয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আদতে কতটা নিরাপত্তা থাকে? নায়ক নিজের ইচ্ছেমতো কতদূর যেতে পারে?
উত্তর: প্রথমত, যে কোনও প্রফেশনেই একটা ঝুঁকি থাকে। আপনার কাগজের যে সাংবাদিককে কোনও যুদ্ধ-দুর্ঘটনার কভারেজে পাঠাচ্ছ, বা নির্বাচনের দিন পাঠাচ্ছ, সেই ছেলেটি বা মেয়েটি জানে না কোনখানে গোলযোগ বাধতে পারে এবং কখন সে আক্রান্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সেদিন যদি পুলিশ পারমিশন থাকত এবং ড্রোন শর্ট না নেওয়া হত, তাহলে কি এক্সিডেন্টটা ঘটত না? সমুদ্রে শট দেওয়া হয়তো বাংলা সিনেমায় এর আগে অন্তত পঞ্চাশ হাজার বার হয়েছে! এতবারের পর এইরকম একটা ঘটনা একবার ঘটল। এর ফলে কি পরে আর শুট হবে না? এই ঘটনা মানুষের মনে যত ফিকে হতে শুরু করবে, তত এই প্রতিরক্ষার বলয়গুলো ঢিলে হবে। রাহুলের প্রকৃতি আমি যতটা বুঝেছি, ও কখনওই ডিরেক্টরকে বলবে না যে, “না, ওই শটটা আমি দেব না।” ডিরেক্টরও হয়তো ওই মুহূর্তে ভেবেছেন এটা হলে শটটা ভালো হবে। কিন্তু নিয়তির পদধ্বনি ঠিক ওইখানেই বালির উপর শোনা গেল। রাহুলের মতো এইরকম একটা সেন্সিটিভ, ডেলিকেট, চিন্তাশীল অ্যাক্টরকে আমরা হারালাম।
তৃতীয়ত, সরকারকেও কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন, আমি দেখেছি। আমাদের থিয়েটারের একজন গরিমাময় অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তী। ১৯৭৭ সালে গঙ্গায় শুট করতে গিয়ে জলে ডুবে মারা যান। সেই সময় বামফ্রন্ট সরকার এসেছে, তাদের কি কোনও দায় আছে? আমি বলছি, না, দায় নেই। কেয়াদিও মানসিকভাবে ওই ধরনের লোক ছিলেন। গয়না বন্ধক দিয়ে থিয়েটারে এসেছেন। শাহরুখ খান বলেছিল যে, কেরিয়ারের গোড়ার দিকে তাকে দোতলা বাড়ির ছাদ থেকে ঝাঁপ মারতে বললে, সে হয়তো ঝাঁপ মারত। ‘কুলি’র পর অমিতাভ বচ্চন বেশিরভাগ অ্যাকশন শট নিজে দিতে চাননি এবং সেই অবস্থাও তাঁর ছিল না। কিন্তু তার আগে ‘শোলে’র সবকটা ফাইট শট উনি নিজে দিয়েছেন— যে কোনও সময় পুনিত ইসারের মতো ঘটনা ঘটতে পারত। ঘটেনি, ‘কুলি’তেই ঘটল। অবশ্যই এ নিয়ে তদন্ত-কাটাছেঁড়া-আলোচনা হোক, কিন্তু সেটা যেন একটা গণ্ডির মধ্যে হয়।
প্রশ্ন: ইউটিউবে ‘হুব্বা’ দেখেছেন? কেবল লাইকসংখ্যাই ২৭ হাজার! ব্রাত্য বসুর মার্জিন কি এবারে ২৭ হাজারের বেশি হবে?
উত্তর: ফাটাফাটি প্রশ্ন! গতবার ২৭,০০০ ছিল। তবে আমি গণৎকার নই। এসআইআর-এর ফলে বিজেপি আমার এলাকায় কত ভোটার বাদ দিল, জানি না। বোধহয় সাড়ে তিন-চার হাজার বাদ গিয়েছে। মার্জিন কত হবে তা নিয়ে চিন্তিত নই, ভোটে জিতলেই আমার চলবে। কারণ, যখন লিখতাম, সবসময় কি মার্জিন মানতাম? শব্দসংখ্যাও মানতাম না।
প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন, এই যে শিক্ষা দুর্নীতি, বিরোধীরা আরও বড় আকারে সামনে আনছে। এত মানুষের চাকরি গেল, চারদিকে কান্নাকাটি, এত মানুষের চোখের জল— তা দেখে কি ব্রাত্য বসুর চোখের কোণ কখনও ভিজে ওঠে?
উত্তর: আমার সত্যিই তো অসুবিধা হয়েছে! আমার দুঃখ হয় কি না, তার থেকেও বড় কথা, হয়তো প্রশ্ন করতে চাইলেন, রাজনীতিবিদের দুঃখ হয় কি না। এই যে ভাষা-সন্ত্রাস, ভায়োলেন্স, চিৎকার, কদর্যতা, এর পেছনে আসলে একটা ডিপরুটেড বেদনা এবং হতাশাবোধ আছে। যে যত হতাশ বা নিঃসঙ্গ, তার সেই হতাশাবোধ থেকে এক ধরনের উদগ্রতা বের হয়। হতাশাবোধকে সে কনসোল করতে পারে না। আমার মনে হয়, রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার হতাশা বা দুঃখবোধ কম। যখন লেখালেখি করি তখন এই বেদনাগুলো আমি লেখার দিকে চালান করে দেওয়ার চেষ্টা করি। যার ফলে অনেক সময় আমার লেখা ভায়োলেন্টও হয় হয়তো। কিন্তু ওটা এক ধরনের ‘ক্যাথারসিস’-এর কাজ করে। মানুষ হিসেবে আমার মধ্যেও স্বাভাবিক প্রবৃত্তি আছে—রাগ, ক্রোধ, দুঃখ, অভিমান, গনগনে ঈর্ষা। শিল্পের কাজ যখন করি, তখন এই রিপুগুলোকে বের করে দিতে পারি। আমার ক্ষেত্রে লেখালেখি ওষুধের কাজ করে।
নিবেদিত


