বিগত পাঁচ বছর ধরে রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রের দায়িত্বে রয়েছেন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও একই আসনে প্রার্থী তিনি। কিন্তু এই পাঁচ বছরে জুড়েছে বহু নতুন ইস্যু। কেন্দ্রীয় এজেন্সির তৎপরতা, বিজেপির প্রতি জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা, এসআইআর! আগামী ৪ তারিখ সরকার তবে কারা গড়বে? সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর মুখোমুখি দেবাশিস কুমার (Debasish Kumar)।
প্রশ্ন: নির্বাচনের (WB Assembly Election 2026) মাঝেই কেন্দ্রীয় এজেন্সি তৎপরতা বাড়িয়েছে। তোমার অফিস, বাড়ি, একাধিক কার্যালয়ে হানা চালিয়েছে। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছ?
উত্তর: কেন্দ্রীয় এজেন্সির অধিকার আছে, তারা আসতেই পারে। আমার তা নিয়ে অমত নেই। আবারও আসুক, ভালো করে তদন্ত করুক। একটাই অনুরোধ, সামনে নির্বাচন। বারবার প্রচারের কাজে বাধা পড়ে যাচ্ছে। তবে যা দুর্ভাগ্যজনক, তা হল ‘সূত্রের খবর’ বলে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, আমার বাড়ি থেকে নাকি প্রচুর জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছে! এই ঘটনা আমাকে ব্যথিত করেছে। ইনকাম ট্যাক্স আধিকারিকরা যা পান, তাঁরা ‘সিজার লিস্ট’ করে দেন। তাই কী পেয়েছেন সে বিষয়ে আমি কী বললাম বা সাংবাদিকরা কী বললেন, গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতক্ষণ না সিজার লিস্ট সামনে আসছে।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: এটাকে কি তুমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখছ?
উত্তর: আমি এত সরলীকরণ করার পক্ষে নই। এটুকু বলতে চাই, যেটা সত্যিকারের তথ্য, সেটাই মানুষ জানুক।
প্রশ্ন: অর্থাৎ যেটা পরিবেশিত হচ্ছে, সবটা সত্য নয়?
উত্তর: একদমই নয়।

প্রশ্ন: বিজেপি কি আত্মবিশ্বাসী নয় বলেই কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই তৎপরতা?
উত্তর: বিজেপি আত্মবিশ্বাসী কি না আমি জানি না, কিন্তু আমি জিতব এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী এবং নিশ্চিত। আমি মানুষের লড়াই বুঝি। মানুষের আশীর্বাদ আমার সঙ্গে আছে। আমার মনে হয়, খুব কম প্রার্থীর মধ্যে আমি একজন, যে পায়ে হেঁটে তারাতলা থেকে যাদবপুর কভার করেছি, অন্তত ৯০% মানুষের বাড়িতে পৌঁছেছি।
প্রশ্ন: যে মামলাটি নিয়ে আয়কর দপ্তর তদন্ত করছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিভিন্ন রকম ন্যারেটিভ দিচ্ছে। আসল ঘটনা কী?
উত্তর: সংবাদমাধ্যম যা প্রকাশ করেছে, সে বিষয়ে আমি আমার আইনজ্ঞর সঙ্গে কথা বলে যা ব্যবস্থা নেওয়ার নিচ্ছি। পাবলিক ডোমেইনে এখনই আমার দিকের ঘটনা বলতে চাই না।
প্রশ্ন: বিজেপি প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্ত তোমার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি কিন্তু তোমাকে পৌরপ্রতিনিধি হিসেবে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন, তাঁর এলাকার কোনও সমস্যায় দরকারে তোমাকে পেয়েছেন। যদিও বিধায়ক হিসেবে ততটা নম্বর দেননি।
উত্তর: কে কাকে কতটা নম্বর দেবে, আমার জানা নেই। বিধায়ক হিসেবে স্বপন দাশগুপ্ত আমার পরিষেবা পাননি, কারণ তিনি যে অঞ্চলে থাকেন, সেই অঞ্চলের বিধায়ক আমি নই। আমার লড়াই কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; সে স্বপন দাশগুপ্ত হোক, আশুতোষ চ্যাটার্জি হোক, অথবা সিপিআইএমএল-এর যিনি প্রার্থী আছেন। লড়াই নীতি এবং আদর্শের, সেই লড়াই-ই আমি লড়ছি।
প্রশ্ন: কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে স্বপন দাশগুপ্তকে কীভাবে দেখছ?
উত্তর: আবারও বলি, স্বপন দাশগুপ্ত একজন ব্যক্তি। তাঁর সঙ্গে আমার কোনও লড়াই নেই। তিনি আমার প্রতিবেশী। লড়াই থাকার প্রশ্নই ওঠে না, এত বছর আমরা পাশাপাশি থেকেছি।
“নির্বাচন তো একটা পরীক্ষা। যে ছাত্র পাঁচ বছর ধরে পড়াশোনা করেছে, তার কাছে পরীক্ষা খুব কঠিন হয় না। যারা এক মাস পড়ে পরীক্ষাটা দেবে, তাদের কাছে কঠিন হতে পারে। আমি নিজেকে খুব মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট বলে মনে করি না, কিন্তু আমি স্টুডিয়াস!”
প্রশ্ন: ২০২১-এ প্রথমবার বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়েছিলে। এবার ২০২৬-এ রাসবিহারীতে। জিতলে কি মন্ত্রী হবে?
উত্তর: মন্ত্রী হওয়া বা না হওয়া তো আমার মর্জির উপর নির্ভর করে না। সিদ্ধান্ত দল নেবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যদি মনে করেন আমাকে মন্ত্রী করা উচিত, তাহলে আমি মন্ত্রী হব, নাহলে হব না।
প্রশ্ন: ধরা যাক মন্ত্রী হলে, কোন দপ্তর পছন্দের?
উত্তর: আমি ‘যদি’র ভিত্তিতে উত্তর দেব না। যদি হই, যেটাই দেবে, আমি খুশি।
প্রশ্ন: রাজ্যজুড়ে এসআইআর-এর বিরাট প্রভাব রয়েছে, সে নিয়ে কী বলবে?
উত্তর: প্রভাব তো রয়েছেই। এসআইআর-এর পরে ভোটার লিস্টে যে ভোটাররা রয়েছেন, তাদের নিয়েই লড়তে হবে, হাহুতাশ করার অপশন নেই।
প্রশ্ন: রাসবিহারী এমন এক ব্যতিক্রমী কেন্দ্র, যেখানে নিকটতম দুই প্রতিপক্ষ একই পাড়ার লোক। ব্যক্তিগত স্তরে কি মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছে?
উত্তর: এখনও পর্যন্ত হয়নি। হওয়ার কথা নয়, আশা করি হবেও না।
প্রশ্ন: তোমার পরবর্তী প্রজন্ম কি রাজনীতিতে আসবে?
উত্তর: সম্পূর্ণ তাদের সিদ্ধান্ত। আমার মেয়ের রাজনীতিতে আগ্রহ নেই, তা বলা যায় না। আমার সঙ্গে কিছু জায়গায় ঘুরেছেও।
প্রশ্ন: আজকের দিনে রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপশব্দের ব্যবহার বেড়েছে। রাজনৈতিক মানচিত্রে সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে কীভাবে দেখো?
উত্তর: আমার মনে হয়, রাজনীতিতে এমন মানুষদের আসা উচিত, যাদের সৌজন্যবোধ আছে। তবে এটাও ঠিক, যেভাবে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু হয়েছে, তাতে সব সময় এই নৈতিকতা বজায় রাখা কঠিন।
প্রশ্ন: বিরোধীরা বলে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক হল সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক। কিন্তু রাসবিহারী বিধানসভায় সংখ্যালঘু ভোট নেই বললেই চলে। দেবাশিস কুমার যে জয় নিয়ে এত আত্মবিশ্বাসী, তা কীভাবে?
উত্তর: এটা তো একটা পরীক্ষা। যে ছাত্র পাঁচ বছর ধরে পড়াশোনা করেছে, তার কাছে পরীক্ষা খুব কঠিন হয় না। আমি নিজেকে খুব মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট বলে মনে করি না, কিন্তু আমি স্টুডিয়াস!
প্রশ্ন: কলকাতায় ১১টি আসনে কী ফলাফল হতে চলেছে?
উত্তর: ১১টিতেই তৃণমূল, বিজেপি শূন্য!
“আমি গোবিন্দপুরের বস্তিতেও যতটা স্বছন্দ-সাবলীল, সাউথ সিটির বহুতল আবাসনের মানুষও আমাকে একইভাবে গ্রহণ করেন। কিছুদিন আগে তাঁদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছি, নিউ আলিপুরের হিন্দিভাষী মানুষ আমাকে হোলি উৎসবেও ডেকেছেন। আবার আমাদের এই বিধানসভায় আদিবাসীরাও আছেন, তাঁরাও তাঁদের উৎসবে আমাকে আমন্ত্রণ জানান।”
প্রশ্ন: রাজনীতিতে তুমি বিপুল কাজ করেছ। গাছের অ্যাম্বুল্যান্স বানিয়েছ, সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছ বলা চলে। আর কী কী কাজ করা বাকি আছে?
উত্তর: কাজ কখনও শেষ হয় না। আমি একটিমাত্র ‘ট্রি অ্যাম্বুল্যান্স’ চালু করেছি, যা পূর্বাঞ্চলে প্রথম এবং ভারতবর্ষে তৃতীয়। রাসবিহারীতে এত গাছ রয়েছে যে একটি অ্যাম্বুল্যান্স যথেষ্ট নয়, আরও বাড়ানো গেলে ভালো হয়। আমাদের এখানে অনেক সিনিয়র সিটিজেন একা থাকেন, তাঁদের নিকট আত্মীয়রা বাইরে থাকেন। হঠাৎ কোনও সমস্যা হলে বা কেউ মারা গেলে, সন্তানদের আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রিয়জনের মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য আমি ‘ডোরস্টেপ মরচুয়ারি’র ব্যবস্থা করেছি, যা বাড়িতে পৌঁছে যাবে এবং আত্মীয়রা না-আসা পর্যন্ত মৃতদেহ বাড়িতেই সংরক্ষণ করা যাবে। এই মুহূর্তে যে-ওয়ার্ডে বসে কথা বলছি, এখানে সমস্তটাই সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনেছি।
রবীন্দ্র সরোবর পরিষ্কার করে চারদিক সাজানো হয়েছে, স্পোর্টস জোন তৈরি হয়েছে, সবুজের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। আমফানে যেসব গাছ পড়ে গিয়েছিল, সেগুলো পুনরুদ্ধার করেছি এবং প্রচুর গাছ পুনরায় রোপণ করেছি। যেখানে ফিল্টার করা পানীয় জল ছিল না, সেখানে সেই ব্যবস্থাও করেছি। বিবেকানন্দ পার্কে একটি স্ট্রিট ফুড হাব গড়ে তোলা হয়েছে। আগে যে ভেন্ডাররা ওখানে বসেই ফুচকা-ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন, তারা এই নতুন ‘হ্যাপেনিং প্লেস’-এ একই কাজ করতে পারবেন।
প্রশ্ন: তোমার বিধানসভা কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান সমস্যা, বর্ষাকালে জল জমা।
উত্তর: একদম সঠিক। প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড, লেক গার্ডেন্স, যোধপুর পার্ক এবং ৮৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জল জমা একটি বড় ইস্যু। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, আনোয়ার শাহ রোডে প্রায় ৮ ফুটের একটি বড় বক্স ড্রেন রয়েছে, যেখানে ১৯৬৪ সালের পর থেকে পলিনিষ্কাশন হয়নি। প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেই পলিনিষ্কাশনের কাজ করিয়েছি। এবং একটি লিফটিং স্টেশন তৈরি করেছি, যাতে এই এলাকায় স্থায়ীভাবে জল জমা বন্ধ করা যায়। যোধপুর পার্ক লেকের সংস্কার করেছি। পানীয় জলের সমস্যাও ছিল, বুস্টার পাম্পিং স্টেশন তৈরি করে সমাধানের চেষ্টা করেছি।
প্রশ্ন: রাসবিহারী কেন্দ্রে বাংলার নিরিখে মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি। একদিকে যেমন সাউথ সিটি রয়েছে, তেমনই প্রচুর বস্তিও রয়েছে।
উত্তর: গোবিন্দপুর, রবীন্দ্রনগর ও ঝল্লামাঠের মতো এলাকায় বস্তি রয়েছে। আবার সাউথ সিটি, সাদার্ন অ্যাভিনিউর মতো বহুতল আবাসন, বিত্তশালী মানুষ আছেন। লেক গার্ডেন্স, যোধপুর পার্ক, নিউ আলিপুরে প্রচুর হিন্দিভাষী মানুষের বসবাস। সব মিলিয়ে রাসবিহারী যেন ‘মিনি ভারতবর্ষ’। আমি গোবিন্দপুরের বস্তিতেও যতটা স্বছন্দ্য-সাবলীল, সাউথ সিটির বহুতল আবাসনের মানুষও আমাকে একইভাবে গ্রহণ করেন। কিছুদিন আগে তাঁদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছি, নিউ আলিপুরের হিন্দিভাষী মানুষ আমাকে হোলি উৎসবেও ডেকেছেন। আবার আমাদের এই বিধানসভায় আদিবাসীরাও আছেন, তাঁরাও তাঁদের উৎসবে আমাকে আমন্ত্রণ জানান। আমি সকলের কাছেই সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
প্রশ্ন: বিজেপির ভোটের যে স্ট্র্যাটেজি, তাতে তাদের মূল টার্গেট বহুতল। তারা বিশ্বাস করে যে বহুতলের ভোট তৃণমূলের দিকে যাবে না।
উত্তর: একদম ভুল ধারণা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বহুতলের অধিকাংশ ভোট আমরাই পাব— বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
সম্পর্ক ভাঙার ভয়ে ‘না’ বলতে পারছেন না বন্ধুকে, আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী আদতে ‘ম্যানিপুলেটর’ নয় তো?
-
‘চিত্রনাট্যটা ফেরত নেওয়া হয়নি’, গল্প চুরি বিতর্কের মাঝে মানস মুকুল পালের নিশানায় প্রসেনজিৎ
-
ব্রাজিলের জয়ের ম্যাচে নজর কাড়ল তাদের বেসক্যাম্পও, কলম্বিয়া পার্ক নিয়ে মুগ্ধ ক্লপও
-
ইউনুস-রাজত্বের দেড় বছর ‘অন্ধকারতম’ অধ্যায়! বাংলাদেশিদের রেকর্ড অর্থ জমা সুইস ব্যাঙ্কে
-
জবরদখল বিশ্বাস ব্রাদার্সের! ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে সুরুচি সংঘের জমি খালির নোটিস এলআইসির
নিবেদিত


