২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে পাণ্ডুয়ার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী। ২০২১ পর্যন্ত তালডাংরা কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন। বরাবরই স্পষ্টবক্তা, দলের সপক্ষে যুক্তি সাজিয়ে সর্বদাই সরব। জটিল-সরল নানা প্রশ্নোত্তরে সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এ সমীর চক্রবর্তী (Samir Chakraborty)।
প্রশ্ন: ২০১৬-তে তালডাংরা, ২১-এ ব্রেক, ২৬-এ পাণ্ডুয়া- কেমন লাগছে?
উত্তর: রাজনীতির লোক আমি। ১৯৮৭ সালে, আমার বয়স যখন ২৭, রাজীব গান্ধী আমাকে কলকাতার বিদ্যাসাগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের টিকিট দিয়েছিলেন। সেই যাত্রা শুরু। ১৯৯৬-এ শ্যামপুকুর থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হই, তবে অল্প ব্যবধানে হেরে যাই। এরপরের গল্প ২০১৬-এ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে তালডাংরা আসনের টিকিট দিলেন। বিপক্ষে অমিয় পাত্র, যিনি নাকি বাঁকুড়ার ‘সিপিএম-এর বাঘ’! আমি ১৪,০০০ ভোটে অমিয় পাত্রকে হারিয়ে নির্বাচিত হই। সেই হিসেবে চতুর্থবার প্রার্থী হওয়া, নতুন তো কিছু নয়।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: তবুও পাণ্ডুয়া নতুন জায়গা। এখানকার মানুষের আন্তরিকতা কেমন লাগছে?
উত্তর: পাণ্ডুয়া তথা হুগলির মানুষ অসাধারণ। মনের দিক থেকে এত পরিষ্কার মানুষ খুব কম জায়গায় দেখেছি। ২০১৬-তে বাঁকুড়ায় নির্বাচন লড়ে দেখেছি- গ্রাম বাংলার মানুষ অত্যন্ত স্পষ্টভাষী হয়। তারা নতুন মানুষকে গ্রহণ করে সহজে। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভোটের সময় তাদের প্রতিশ্রুতির নামে ভাঁওতা দিয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী তো সাধারণ মানুষেরও প্রধানমন্ত্রী। তিনি যখন বছরে দু’কোটি বেকারকে চাকরি দেবেন বলে কথা রাখেন না, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা বলে তারপর খালি হাতে ফিরিয়ে দেন, তখন ভারতীয় হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ হয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী যদি ভোট নেওয়ার অছিলায় এমন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, তা বড়ই মর্মান্তিক।
আরও পড়ুন:
“বিজেপি জানে যে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তাকে হারানো সম্ভব নয়। তাঁর উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দেওয়াও সম্ভব নয়। তাই সবথেকে সহজ উপায় বেছে নিয়েছে— ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নামই বাদ দিচ্ছে। আমি বলেছি, দিলিপ ঘোষ-সুকান্ত-শমীকের নাম রেখে সব নামই বাদ দিয়ে দিন না! তাহলে তো নিশ্চিন্তে বিজেপি জিতে যাবে।”
প্রশ্ন: এই নির্বাচনের সবচাইতে বড় ইস্যু এসআইআর। প্রথমে বিজেপি আশ্বস্ত করলেও পরে দেখা গিয়েছে ৬৩ শতাংশ হিন্দু এবং বিপুল সংখ্যক সংখ্যালঘুর নাম বাদ পড়েছে। এই বিষয়টি এবারের নির্বাচনে কত বড় ফ্যাক্টর?
উত্তর: এটা বুমেরাং হয়ে যাবে বিজেপির কাছে, একবার শুধু ভোটবাক্স খুলতে দাও! আমি নিজে প্রত্যন্ত গ্রামে ঘুরছি, পাণ্ডুয়াতে কোনও শহর নেই, মিউনিসিপালিটি নেই। ১৬টা পঞ্চায়েত জুড়েই মানুষের সঙ্গে কথা বলছি। জিজ্ঞেস করলে তারা সরসরি বলছে, বিজেপির নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ। কেউ নির্বাচন কমিশন বলছে না। বিজেপি জানে যে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তাকে হারানো সম্ভব নয়। তাই সবথেকে সহজ উপায় বেছে নিয়েছে— ভোটার তালিকা থেকে মানুষের নামই বাদ দিচ্ছে। আমি জ্ঞানেশ কুমার, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ করি, ক’জন রোহিঙ্গাকে খুঁজে পেয়েছেন, তা জানাতে। ৬৪% হিন্দু যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তারা কি রোহিঙ্গা? অসমে চার-পাঁচ বছর আগে তো এই ঘটনাই ঘটিয়েছিল। ১৯ লক্ষ মানুষকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে ১২ লক্ষই হিন্দু। এরপরেও নিজেদের তারা ‘হিন্দুদের পার্টি’ বলে! তারা তো হিন্দু নিধনের পার্টি! বিজেপি যেভাবে দেশকে বিভাজনের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বিপজ্জনক। আমার আশঙ্কা, নরেন্দ্র মোদি অমিত শাহ যা করছেন, তাতে বাংলাদেশ কিংবা নেপালের মতো জেন-জি আন্দোলন কেবল সময়ের অপেক্ষা। বিজেপি হয়তো দু-একটি নির্বাচন জিতবে, কিন্তু রাজনীতির পাঁচশো বছরের ইতিহাস এমন ৫-১০ বছরকে মনে রাখে না!

প্রশ্ন: বিজেপি বারবার তৃণমূল সরকারের ভাতা দেওয়াকে আক্রমণ করেছে। অথচ অমিত শাহ তাঁর নির্বাচনী ইস্তেহারে ঘোষণা করলেন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার নামের ভাতা। তৃণমূল যেখানে ১৫০০ টাকা দিত, বিজেপি ৩০০০ টাকা দেবে।
উত্তর: এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কাছে তারা পরাজিত, আতঙ্কিত। কয়েকটা উদাহরণ দিই। মহারাষ্ট্রে এই প্রকল্পেরই নাম ‘লাডলি বেহেন’। বিজেপি সেখানে প্রথমে বলেছিল, ২১০০ টাকা দেবে। ভোটের পর মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ বললেন, সরকারের টাকা নেই! সাত মাস আগে দিল্লির নির্বাচন হয়েছে, রেখা গুপ্ত মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। সেখানে এখনও পর্যন্ত ‘লাডলি বেহেন’ প্রকল্পের টাকা দেওয়া শুরু করতে পারল না। বিজেপির ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ আসলে ‘মিথ্যার ভাণ্ডার’। বিহারে তো ১০ হাজার টাকা দিয়ে এখন ঋণের কিস্তি হিসেবে ফেরত চাইছে। এটাই নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহের সঙ্গে মমতা-অভিষেকের তফাৎ।
“ওরা স্বচ্ছ ভোটার তালিকার নামে হিন্দু-মুসলিম-তফশিলি জাতি-রাজবংশী-মতুয়া— নির্বিচারে সবার নাম কেটে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার আসলে অমিত শাহের চাকর, আমি আগেই বলেছি, এখন মানুষ বলছে। মানুষকে আজীবনের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।”
প্রশ্ন: তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজ্যে শিল্প নেই। শিক্ষা-চাকরিক্ষেত্রেও দুর্নীতি। কিন্তু বিজেপির ইস্তেহারে শিক্ষা-শিল্প-চাকরি কিছুরই উল্লেখ নেই। বরং দেখা যাচ্ছে তাদের ইস্তেহারটিও ভাতাসর্বস্ব।
উত্তর: তিন মাস আগে বিহার নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি বলেন, রিল বানাও, ওতে বিরাট রোজগার হয়! মোদি তাহলে প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে রিল বানাচ্ছেন না কেন? গত ১২ বছরে রেল, ডাক বিভাগ বা ব্যাঙ্ক-বিমার মতো বড় ক্ষেত্রগুলোতে বিজেপি কটা চাকরি দিয়েছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা গণি খান চৌধুরী রেলমন্ত্রী থাকাকালীন হাজার হাজার বেকার যুব চাকরি পেয়েছে। হুগলি কেন্দ্রে লকেট চট্টোপাধ্যায় বিজেপির সাংসদ ছিলেন। পাঁচ বছরে একটা টিউবওয়েলও বসাননি! সাংসদ তাঁর এলাকা উন্নয়নের জন্য বছরে পাঁচ কোটি টাকা পান। তাহলে হিসেব অনুযায়ী তিনি কমপক্ষে পঁচিশ কোটি টাকা পেয়েছেন। সেই টাকা কোথায় খরচ হল? শুভেন্দু অধিকারী এসআইআরে নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে বাংলার নাগরিকদের লাঞ্চ-ডিনারের সঙ্গে তুলনা করলেন! ওই উন্মাদ নাকি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হবে!
প্রশ্ন: বাম আর কংগ্রেস এবারে জোট করল না। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে কি এর কোনও প্রভাব পড়বে?
উত্তর: অপ্রাসঙ্গিক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কংগ্রেস ও বাম— দুই-ই শূন্য। এবার তো নির্দলদের নিয়ে প্রশ্ন করবে!
প্রশ্ন: তবুও বাম-কংগ্রেস আলাদা লড়ে যদি, বামের যে ভোট রামে গিয়েছিল তা কি আবার বাম ফিরিয়ে আনতে পারবে?
উত্তর: আমি এসব নিয়ে ভাবছি না। বরং আমি চিন্তা করি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর মানুষের যে আশীর্বাদ রয়েছে, তা কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়, সেই নিয়ে। মানুষ বুঝে গেছে যে সিপিএমকে ভোট দেওয়া মানে ভোট নষ্ট। আমি তো মানুষের দরজায় দরজায় যাচ্ছি, তাঁদের কথা শুনছি। কোথাও জল বা রাস্তার সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করছি। পাণ্ডুয়ার অন্যতম বড় সমস্যা হল, ১০০ দিনের কাজের টাকা কেন্দ্রীয় সরকার অন্যায়ভাবে আটকে রেখেছে। এমনকী সুপ্রিম কোর্ট একে নায্য পাওনা বলার পরেও। বিজেপিকে এর উত্তর মানুষকে দিতেই হবে।
ওরা স্বচ্ছ ভোটার তালিকার নামে হিন্দু-মুসলিম-তফসিলি জাতি-রাজবংশী-মতুয়া— নির্বিচারে সবার নাম কেটে দিয়েছে। কথায় বলে, কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়। কিন্তু সব মানুষকে আজীবনের জন্য বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। বিজেপি বাংলার ভাষা-সংস্কৃতি-কৃষ্টি বোঝে না। ঋষি-মনীষীদের চেনে না। বাংলার মাটি রাজনৈতিক সচেতনতার। ৪ জুন যখন বাক্স খোলা হবে, একটাই প্রতিধ্বনি শোনা যাবে— ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নাও দুর্বৃত্ত’।
প্রশ্ন: সমীর চক্রবর্তীর জয়ের মার্জিন কত হতে পারে?
উত্তর: জয়-পরাজয় মানুষের হাতে, গণদেবতাই শেষ কথা বলে। আমি কেবল তাদের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করছি।
সর্বশেষ খবর
-
‘ফুটবলে কালো দাগ’, আমেরিকায় ফুটবলারদের উপর ‘নির্যাতন’ নিয়ে বিস্ফোরক ইরানের কর্তা
-
পথচারীদের অধিকার রক্ষায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার যুগান্তকারী রায় সুপ্রিম কোর্টের
-
জানলার বাইরে ঝুলন্ত টোল কর্মী, ইসলামপুরে এভাবেই ১২ কিলোমিটার ছুটল গাড়ি
-
জামাইষষ্ঠীর খাওয়াশেষে বুকজ্বালা-অ্যাসিডিটি? অ্যান্টাসিডের দরকার নেই, ঘরোয়া টোটকাতেই ‘ম্যাজিক’
-
পশ্চিমবঙ্গ দিবস ও যোগ দিবসে মহানগরে মোদি, কলকাতায় কোন কোন রাস্তায় যান নিয়ন্ত্রণ?
নিবেদিত


