Advertisement
Advertisement
Samik Bhattacharya

‘বাঙালির প্রধান খাদ্য গোমাংস’, বাঙালি বনাম বাংলাদেশি বিতর্কে বিস্ফোরক শমীক

শমীক ভট্টাচার্য মনে করেন, অমিত মালব্য বাংলাকে 'বাংলাদেশী' ভাষা বলে দাগিয়ে দেননি কখনওই। যা হয়েছে, তা কমিউনেকিশন গ্যাপ।

Advertisement
অরিঞ্জয় বোস
অরিঞ্জয় বোস

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ২০:৪২

link
অরিঞ্জয় বোস
অরিঞ্জয় বোস

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ২০:৪২

options
link
‘বাঙালির প্রধান খাদ্য  গোমাংস’, বাঙালি বনাম বাংলাদেশি বিতর্কে বিস্ফোরক শমীক zoom

বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya)। ছাব্বিশের ভোটযুদ্ধে বঙ্গ বিজেপির সারথী তিনিই । স্বভাবিকভাবেই  খবর-শিকারীদের স্পটলাইট। এবার এসআইআর ইস্যু থেকে হিন্দু-মুসলমান বিবাদ পর্যন্ত নানা কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিলেন। সঞ্চিত রইল সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সাহসি সাক্ষাৎকারে।

প্রশ্ন: সকলেই জানে, আপনি কবিতা ভালোবাসেন। ভোটযুদ্ধের আবহে প্রথম কোন কবিতা মাথায় আসছে?
উত্তর: ‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি’। চারিদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ, ছোটখাটো সংঘর্ষ, অনুমতি পাওয়া সংক্রান্ত জটিলতা, প্রতিনিয়ত কর্মসূচি পরিবর্তন— পরিস্থিতি যেন এক যন্ত্রণার কবিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যথা আছে, আত্মস্থ করার উপায় নেই।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

প্রশ্ন: জাতীয় রাজনীতিতে সিপিএম-এর ‘কেরল লাইন’ ও ‘বেঙ্গল লাইন’ নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছে। আপনি কি সেভাবেই বিজেপির ‘রাম লাইনের’ পাশাপাশি ‘কালী লাইন’ সৃষ্টি করেছেন? যে-দলের স্লোগানই ‘জয় শ্রীরাম’ ছিল, সেখানে আপনি সভাপতি হওয়ার পর অভিমুখ মা কালীর দিকে ঘুরে গিয়েছে।
উত্তর: বাঙালি কালীঘাট বা দক্ষিণেশ্বরের মা কালীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বাংলায় যে-প্রান্ত থেকেই পর্যটকরা কলকাতায় আসুক, একবার অন্তত কালীঘাট দর্শন করে। যদিও বর্তমানে কালীঘাটের মা কালীও আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্নীতির বোঝা নিতে পারছেন না। আমরা চাই না, মা কালীর বিসর্জনের শোভাযাত্রায় আক্রমণ হোক। পুলিশের জিপে আগুন লাগুক। প্রত্যেকে নিজের ধর্মাচারণ স্বাধীনভাবে করবে— যে রোজা রাখে সে রাখবে, যে নামাজ পড়ে সে পড়বে, আর যে পুষ্পাঞ্জলি দেয় সে দেবে। দুর্গাপূজার বিসর্জন আর মহরমের মিছিল একই সময়ে একই রাস্তা দিয়ে সমান্তরালভাবে যাবে— এটাই বিজেপির প্রচেষ্টা আর বাংলার প্রকৃত সংস্কৃতি।

প্রশ্ন: আপনি রাজ্য সভাপতি হওয়ার পর একাধিকবার জাতীয়তাবাদী মুক্তমনা মুসলমানদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অথচ দলেরই বিরোধী দলনেতা বলছেন, বিজেপি কেবল সনাতনীদের দল। যেদিন মুসলমানেরা আমাদের ভোট দেবে, সেদিন মুসলমানদের কথা ভাবব।
উত্তর: বিরোধী দলনেতা একটি নির্দিষ্ট আঙ্গিক থেকে বলেছেন। গত পাঁচ বছরে তিনি বারবার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কোনও সংঘর্ষকে অ্যাড্রেস করতে হলে সশরীরে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে কিছু মুসলমানকে খেপিয়ে, লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। কোনও মানুষ যা বলছেন, কোন প্রেক্ষিতে বলছেন, তা খতিয়ে দেখতে হবে। মুসলিম এলাকায় গেলেই বিজেপির গাড়ি ভাঙচুর করা হয়… আমার ক্ষেত্রেও হয়েছে। কোনও মিটিং-মিছিল ছিল না। অকারণেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে ভাঙচুর করা হল। তিনি কখনোই বলেননি যে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সঙ্গে বিজেপির বিরোধ আছে।

“আমাদের রাজ্যকে যদি অন্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়, বুঝতে পারা যাবে যে এ রাজ্যে মুসলমানরা আর্থ-সামাজিকভাবে অনেক বেশি পিছিয়ে। সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ সংখ্যালঘু নেতাদের সন্তানরা দামি স্কুলে পড়ছে। ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খানের ছেলেমেয়েরা কোন মাদ্রাসায় পড়েছে?”

বিজেপির অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রীও এ নিয়ে কথা বলেছেন। আমাদের রাজ্যকে যদি অন্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়, বুঝতে পারা যাবে যে এ রাজ্যে মুসলমানরা আর্থ-সামাজিকভাবে অনেক বেশি পিছিয়ে। সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ সংখ্যালঘু নেতাদের সন্তানরা দামি স্কুলে পড়ছে। ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খানের ছেলেমেয়েরা কোন মাদ্রাসায় পড়েছে? একটিও উদাহরণ দেখাতে পারবে না কারণ, নেই! জাতীয় জনজীবনের মূলস্রোত থেকে সাধারণ মুসলিম সমাজকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। তাদের বোঝানো হচ্ছে এপিজে আবদুল কালামের পথে নয়, আফজল গুরুর পথে এসো! বিজেপি এর পরিপন্থী। এবার উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শব্দচয়ন এবং শরীরী ভাষা একেবারেই বক্তার ব্যক্তিগত বিষয়।

প্রশ্ন: বিজেপির ২৯৪জনের প্রার্থীতালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কি তবে একজনও যোগ্য জাতীয়তাবাদী মুক্তমনা মুসলমান পাওয়া গেল না?
উত্তর: অবশ্যই যোগ্য ব্যক্তি আছেন। কিন্তু ২০২১ সালের অভিজ্ঞতা মনে রাখতে হবে। সে সময় যে মুসলিম ভাই-বোনেরা দাপটের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিজেপি করেছিলেন, তাঁদের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ হয়েছিল। আমরা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারিনি। মুসলিমপ্রধান এলাকায় আমাদের সাংগঠনিক শক্তি এখনও সীমিত, এ কথা তো বাস্তব। তাই কাউকে প্রার্থী করে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে চাইনি। আমার প্রচারে গেলেই দেখতে পাবেন মুসলমানরা কি উৎসাহের সঙ্গে বিজেপির হয়ে কাজ করছে। বিজেপির সঙ্গে মুসলমানরা নেই— এটা ভুল ধারণা। সংখ্যায় কম হলেও আছেন।

প্রশ্ন: পুরোপুরি ‘বাঙালি পার্টি’ হয়ে উঠতে কি বিজেপির আর একটু সময় লাগবে?
উত্তর: অবশ্যই সময় লাগবে। বছর দুয়েক আগে মুখ্যমন্ত্রী এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন, আমাদের রাজ্য সরকারের সচীবরা এবং কয়েকজন ভাষাবিদ গবেষণা করে বের করেছেন যে, বাংলা ভাষা আড়াই হাজার বছরের পুরনো। এ নিয়ে গবেষণালব্ধ বইও তাঁরা লিখেছিলেন। আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মেধাবী ব্যক্তিও সেখানে ছিলেন। আমরা অধীর আগ্রহে সেই বইগুলোর অপেক্ষায় রয়েছি। যতক্ষণ না ওই বই আমরা পড়তে পারছি, অথবা ‘কবিতাবিতান’, ‘কথাঞ্জলি’-র রস আত্মস্থ করতে পারছি, ততক্ষণ পর্যন্ত তৃণমূলের চোখে ঠিক বাঙালি হয়ে উঠতে পারছি না।

প্রশ্ন: তৃণমূলের কথা বাদ দিয়েও যদি বলি, বিজেপির হোর্ডিংয়ে কিছুদিন আগেই আমরা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ শব্দবন্ধ দেখেছি।
উত্তর: নির্বাচনের সময় অনেকে অনেক কিছু লিখে ফেলে। ও তো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ‘অনুপ্রবেশকারী’-র আগে ‘অবৈধ’ যারা লিখেছে, ভুল করেছে।

West Bengal Assembly Election: Exclusive Interview with Samik Bhattacharya

প্রশ্ন: আপনার সর্বভারতীয় আইটি সেলের প্রধান বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলেছেন।
উত্তর: এমন কিছু ঘটেনি! বোঝার ভুল হয়েছে। অমিত মালব্য যা লিখেছেন, আর তা অনুবাদ করে যা মানে দাঁড় করানো হয়েছিল, দুটোর মধ্যে কমিউনিকেশন গ্যাপ হয়েছিল। তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে সব বাংলাভাষী আসলে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি নন। তুমি বলবে বাঙালির প্রিয় খাদ্য মাছ, প্রিয় উৎসব দুর্গাপুজো। আমি বলবো, না! বাঙালির প্রিয় উৎসব ঈদ আর প্রিয় খাদ্য গোমাংস। বাংলাদেশের বইতে তা-ই লেখা হয়। কারণ সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, সবচাইতে বেশি বাঙালি ধর্মে মুসলমান। বাঙালি হিন্দু সেখানে মাইনরিটি। নীরদ সি চৌধুরী বলেছিলেন, ভাষার জন্য বাংলাদেশ তৈরি হয়নি।দুই মোল্লাতন্ত্রের লড়াই ছিল যে কে ক্ষমতায় বসবে।
প্রশ্ন: রাজ্যসভার সাংসদ ও রাজ্য সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও সংসদে আপনার আসন সবার পিছনে। বিরোধীরা বলে আপনি বাঙালি বলেই বিজেপির কাছে গুরুত্ব পাচ্ছেন না।
উত্তর: বড় ক্লাসে নতুন ঢুকলে ব্যাকবেঞ্চেই বসতে হয়। যখন রাজ্যসভার সদস্য হই, স্বাভাবিকভাবেই যে-চেয়ার খালি ছিল, সেখানে বসেছি। আমাকে এখন ১১৬ নম্বর থেকে সরিয়ে ২৮ নম্বর আসনে দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ একদম সামনের দিকে। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখলে এখন আমাকেও টিভির পর্দায় দেখা যাবে! তৃণমূল আমার জন্য এত চিন্তা করছে দেখে আমি কৃতজ্ঞ।

প্রশ্ন: বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর পূর্তি নিয়ে যে-আলোচনা, সেখানে প্রধানমন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বঙ্কিমদা’ বলেন। বিতর্ক তৈরি হল। মাতঙ্গিনী-সূর্য সেনের নামের ভুল উচ্চারণ হল।
উত্তর: ‘দা’ কীভাবে ব্যবহার হয়, একজন অবাঙালির পক্ষে বোঝা সহজ নয়। কিন্তু বন্দে মাতরমকে খণ্ডিত করেছে কংগ্রেস, এই কলকাতার মাটিতেই। এর পক্ষে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মত ছিল না, চিঠিতেই তার প্রমাণ রয়েছে। ১৯৩৭ সালের ২৬-২৭ ডিসেম্বর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বন্দে মাতরম গাওয়া যাবে না। মহম্মদ আলী জিন্না বলেছিলেন, এই গান এক বিশেষ মতাদর্শকে বহন করছে। কোনও সভায় যদি কংগ্রেস এই সঙ্গীত ব্যবহার করে, মুসলিম লিগ সেখানে পৌছবে না। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কার্শিয়াং থেকে চিঠি লিখলেন রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে। বন্দে মাতরমের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেন। নেহরুও এই সঙ্গীত গ্রহণ করা চলে না, এই মর্মে চিঠি লিখলেন। এমন নয় যে এ সমস্ত কথা বিজেপির বানানো।

সেই সময় হিন্দু মহাসভা ইন্দোর, গোয়ালিয়র, বেনারস, লখনৌ, দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই— সব জায়গায় প্ল্যাকার্ড হাতে র‍্যালি করছে, যেখানে লেখা ‘ডু নট কম্প্রোমাইজ বন্দে মাতরম অ্যাট দ্য অলটার অফ কমিউনাল বাইগটরি’। এরপর বিজেপির সরকার দিল্লিতে এল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী মদনলাল খুরানা প্রত্যেকটি সরকারি স্কুলে বন্দে মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক করলেন। কংগ্রেস রাস্তায় নামল। ওদের অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট ছিল, বিজেপি শিশুমনকে বিষাক্ত করে দেওয়ার সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টা করছে। তখনকার কংগ্রেস নেতা, আজ যিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রত্ন, সেই সৌগত রায়ও একে সাম্প্রদায়িক সঙ্গীত বললেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেছিলেন যে, তাঁর ভাবতে অবাক লাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভাবান ব্যক্তি কীভাবে এই গান বা ‘আনন্দমঠ’-এর মতো উপন্যাস লিখেছেন!

অর্থাৎ, বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম যা ভারতের যে কোনও আন্দোলনে প্রাণের স্পন্দন এনে দিয়েছিল, তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিজেপি! আর যারা বিজেপি-কে বাঙালির পার্টি হয়ে আসার কথা বলছে, তারাই তো বাঙালির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। এই যে আজ তুমি-আমি মাছভাত কিংবা দুর্গাপুজোর কথা বলতে পারছি, এটা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, এন সি চ্যাটার্‌জি, যদুনাথ সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, রানী জ্যোতির্ময়ী, শিবেন্দু শেখর রায়— এদের অবদানের জন্যই।

“আমরা বিনাপয়সায় বিদ্যুৎ দেব। বাঙালিরা বাইরে গিয়ে অসুস্থ হলে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কাজ করবে? তার জন্য তো ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর কার্ড চাই। ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের সপ্তম বেতন কমিশনের প্রক্রিয়া শুরু করব। আমাদের কোনও গোপন এজেন্ডা নেই। কংগ্রেসের বড় নেতারা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, পূরণ করতে পারেননি। আমরা তা করে দেখাব।”

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ বন্দে মাতরমের কেবল প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। পুরো গানটি বিতর্কে এল কেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ এমন কোনও প্রস্তাব করেননি। এবং রবীন্দ্রনাথের দেওয়া সুর বঙ্কিম গ্রহণ করেছিলেন, এমনও কোনও ঐতিহাসিক প্রামাণ্য তথ্য নেই। ইতিহাস বলে, চুঁচুড়ার গঙ্গার ঘাটে বসে প্রথম যিনি এই গানে সুর দেন, তিনি যদুভট্ট। রবীন্দ্রভারতীর যে-ঘরটিতে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমের মিটিং হয়েছিল, তা এখন শাসকদলের অফিস হয়ে গিয়েছে। সরলা দেবী চৌধুরানী এই গানটি সম্পূর্ণ গেয়েছিলেন। তৃণমূল ভিত্তিহীন তথ্য তুলে ধরে ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করছে।
প্রশ্ন: ২০২৬-এর বিজেপির প্রার্থী তালিকায় নব্য সদস্যদের চাইতে আদি বিজেপি কর্মীরাই প্রাধান্য পেয়েছে। ২০২১-এর থেকে কি ২৬-এ শিক্ষা নেওয়া হল?
উত্তর: প্রতিটি নির্বাচন থেকেই প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল শিক্ষা নেয়। জয়ী হলেও, পরাজিত হলেও। যারা সংসদীয় রাজনীতিতে বিশ্বাস করে, বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে অংশগ্রহণ করে, প্রত্যেক নির্বাচন তাদের কাছে শিক্ষা। ২১-এ পরিবর্তন দরকার বুঝে অনেক মানুষ তৃণমূল থেকে আমাদের দলে এসেছিলেন। কিছুজন ফিরে গিয়েছেন। বাকিরা দলে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছেন। এমনকী পুরনোদের থেকেও ভালো কাজ করছেন। আমি সভাপতি হয়েই বলেছিলাম, যার হাতে বিজেপির পতাকা, সে-ই বিজেপি। যাকে বিজেপি বলে একালার মানুষ চেনে, পদহীন অবস্থাতেও যার গ্রহণযোগ্যতা থাকে, যার কাছ থেকে মানুষ বিজেপি সম্পর্কে জানতে চায়, বিজেপির সমালোচনা করে, সে-ই নেতা।

প্রশ্ন: পানিহাটির বিজেপি প্রার্থী আর জি করের নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথের নাম এবারে ‘হেভিওয়েট’-দের মধ্যে উঠে আসছে।
উত্তর: হেভিওয়েট নয়, তিনি নিজেই যেন প্রতীকী প্রতিবাদ। তিনি আমাদের কাছে এসে বলেছিলেন ‘নির্বাচনে তৃণমূলকে হারাতে চাই। প্রার্থী হতে চাই। আমি আমার মেয়েকে হারিয়েছি, আর কারও যেন এমন না ঘটে।’ প্রবীণ তৃণমূল নেতারাও আমাকে বলেছেন যে জীবদ্দশায় আর জি কর আন্দোলনের মতো বিপ্লব তাঁরা দেখেননি। বামপন্থীরাও বলেছেন। শুধু তো মেয়েটির জন্য এমন আন্দোলন হয়েছে, তা নয়। তৃণমূলের প্রতি মানুষের যে ঘৃণা, তা-ই জনরোষ হয়ে বেরিয়ে এসেছি। এরপর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যখন মেসিকে দেখতে গিয়ে যুবসমাজ হতাশ হয়েছে, তখন সেই ক্ষোভ আরও বেড়েছে। স্টেডিয়াম জুড়ে লক্ষাধিক মানুষ ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করেছে। মানুষের টাকা তো ফেরত এল না।

প্রশ্ন: ২০২৪ থেকে একাধিকবার চেষ্টা করে ২০২৬-এর এপ্রিল পর্যন্তও রত্না দেবনাথ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।
উত্তর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকে। তিনি তাঁর একমাত্র সন্তানকে হারিয়েছেন; ওঁর ব্যক্তিগত আবেগ নিয়ে রাজনীতি করা ঠিক নয়।
প্রশ্ন: ভোটের মুখে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতি-সক্রিয়তা নিয়ে কী বলবেন?
উত্তর: এজেন্সি কখন কাকে ডাকবে, তা ইডি-সিবিআই-এর বিষয়। বিরোধী দলনেতাকে শতাধিকবার আদালতে যেতে হয়েছে সভার অনুমতির জন্য। সুকান্ত মজুমদার আক্রান্ত হয়েছেন। আমিও তৃণমূলের আক্রমণের শিকার হয়েছি। একবার চাকদার মোড়ে আমার গাড়ি ঘিরে ধরল, মহিলারা ঝাঁটাপেটা করল! পড়ে বুঝলাম, তারা মুকুল রায় ভেবে ভুল করেছে। এই রাজ্যে একেবারেই নিরাপত্তা নেই।

প্রশ্ন: বিজেপি তৃণমূলকে ‘ভাতা-সর্বস্ব’ বলেছে। অভিযোগ করেছে, রাজ্যে শিল্প-বাণিজ্য নেই। কিন্তু অমিত শাহ যে-সংকল্পপত্র ঘোষণা করলেন, তাতেও তো ভাতার ছড়াছড়ি।
উত্তর: বিজেপি বলেছে এই সরকার ‘খেলা-বেলা-মোচ্ছবের সরকার’। বলেছে, সরকার ভাতা দেওয়া ছাড়া আর কিছু করেনি। পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজ বলেছে, ভাতা নয় ভাত চাই! এই প্রেক্ষিতে আমরা সংকল্পপত্র তৈরি করেছি। শিল্পায়ন আর উন্নয়নের সমার্থক হল বিজেপি। তাদের বক্তব্য, ভারী শিল্প ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নেই। সরকারকে জমিনীতি বদল করতে হবে। কৃষি-শিল্পের সহবাস নয়। শিল্পে কৃষির অংশিদারিত্ব দিতে হবে। প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকার ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর নামে খুবই সামান্য টাকা দিচ্ছে। আমরা বলেছি, এই মূল্য বাড়াতে হবে। এভাবে তো রাজ্য লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যাবে! একটা গ্র্যাজুয়েট ছেলে রোজ বেরিয়ে ৫০ টাকা পাবে?

আমরা বিনাপয়সায় বিদ্যুৎ দেব। বাঙালিরাই সবথেকে বেশি বেড়াতে যায়। বাইরে গিয়ে অসুস্থ হলে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কাজ করবে? তার জন্য তো ‘আয়ুষ্মান ভারত’-এর কার্ড চাই। আমরা বলেছি ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের সপ্তম বেতন কমিশনের প্রক্রিয়া শুরু করব। আমাদের কোনও গোপন এজেন্ডা নেই। কংগ্রেসের বড় নেতারা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন, পূরণ করতে পারেননি। আমরা তা করে দেখাব। মুখ্যমন্ত্রীর জন্য আলিপুরদুয়ারের আলুচাষিরা আত্মহত্যা করছে। বর্ধমানে ধান উৎপাদন কমছে। কোথায় ‘এগিয়ে বাংলা’? অথচ মুখ্যমন্ত্রী এই মর্মে হোর্‌ডিং লাগিয়েছেন যে কৃষকের আয় তিনগুণ বেড়েছে। এদিকে এই রাজ্যের কৃষক অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে যাচ্ছে! বেঙ্গালুরুর সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলা কারণ বছরের পর বছর বাঙালিরা সেখানে গিয়ে জড় হয়েছে।

 

এই রাজ্যে সামগ্রিক অবক্ষয় হয়েছে। পৃথিবী এগোচ্ছে, আগের যুগ আর নেই যে আমরা স্তালিন-ট্রটস্কির দ্বন্দ্ব নিয়ে তর্ক করব! মানুষ স্টাইলে বাঁচতে চায়, তত্ত্বকথা কেউ শুনবে না। গোটা রাজ্যই বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে। এখানে মেধা পরিযায়ী, পুঁজি পরিযায়ী, শ্রমিক পরিযায়ী। সিপিএমের আমলে বাণিজ্যবিরোধী সরকার ছিল। আর এখনকার সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে যারা ‘বেঙ্গল মিনস বিজনেস’-এর স্লোগান দেয়, তাদের ব্যালেন্স শিট দেখলে জানবে সকলেই বাইরের রাজ্যে বিনিয়োগ করছে। সিপিএম যে শিল্পায়ন এনে যেতে পারেনি, আমরা তা করে দেখাব। এ রাজ্যে রোহিঙ্গারা রয়েছে, তাদের বহিষ্কারের পদক্ষেপ করা হয়নি।

প্রশ্ন: বামেদের ভোট বৃদ্ধি কি বিজেপির জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে?
উত্তর: এমন কোনও ব্যাপার নেই। আমি আবেদন করছি বামেদের কাছে, যারা তৃণমূলের অমৃত রস পান করেননি তাদের কাছে, কংগ্রেসিদের কাছে— এই ভোট পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ না হতে দেওয়ার ভোট। পরবর্তী প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার ভোট। পশ্চিমবঙ্গ না বিক্রি হয়ে যাওয়ার ভোট। এই ভোটে অন্তত বিজেপির পতাকা বাড়ির মাথায় তুলুন। আর যদি রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতায় বিশ্বাসী হন, তাহলে বাম হাতে ভোটে করুন। কিন্তু তৃণমূলকে সরান।

প্রশ্ন: সাক্ষাৎকারের সূচনা কবিতা দিয়ে হয়েছিল, শেষ সেভাবেই করতে চাই। নির্বাচনের পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি কোনও কবিতা শোনাতেন…।
উত্তর: দুটি লাইনে বলতে পারি— ‘তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি,/ অন্যায় হবে না, নাও ছুটি’।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.