‘যে কোনও ভূমিকায় সমানে লড়ে যাই, আপনি যা চান, আমি ঠিক তাই!’ ‘পাতালঘর’ ছবির এই দুরন্ত গান, তৃণমূল কংগ্রেসের যে-নেতার সঙ্গে মিলেমিশে সমার্থক হয়ে যায়, ক্রিকেটীয় কৌলিন্যে যাঁকে বলা চলে রাহুল দ্রাবিড়ের মতো স্কিপার, তৃণমূলের তর্কাতীতভাবে শ্রেষ্ঠ ‘দেওয়াল’– তিনি নিঃসন্দেহে ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)। তৃণমূলের আমলে যে-ক’টি দুর্নীতি নিয়ে বিষবাষ্প ঘনিয়ে উঠেছে, তার অন্যতম এসএসসি দুর্নীতি। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলযাত্রায়। এদিক-সেদিক থেকে আন্দোলন, রোষ ধেয়ে আসছে। মিডিয়া থেকে আমজনতা– সকলেরই টার্গেট তাঁর দল! সেই মুহূর্তে কে ভার নেবেন শিক্ষামন্ত্রীর? কে নেবেন এই গুরুদায়িত্ব? উত্তর: ব্রাত্য বসু। উত্তরোত্তর যিনি দিশা দেখালেন, পরবর্তীতেও নিশ্চয়ই পথ দেখাবেন বাংলার শিক্ষাঙ্গনকে।
বারেবারেই আক্রমণের শিকার হয়েছে তিনি। কিন্তু থেকেছেন স্থিতধী, শান্ত হয়েই। দেখিয়ে দিয়েছেন রাজনীতি কেবলমাত্র আবেগের বুদ্বুদ নয়, যুক্তির ধাতব পিন সেই আবেগ ফাটিয়ে সত্যিটা বের করে আনতে পারে।
আরও পড়ুন:
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন ব্রাত্য বসু (Bratya Basu)। বুঝতে পারছিলেন বামেদের অন্তর্লীন সমস্যাগুলো– যা হচ্ছে তা ঠিক হচ্ছে না। বামেদের নানা ভুলভ্রান্তি অন্যরাও বলছিল বটে, বলছিল পরিবর্তন জরুরি– কিন্তু সে-অর্থে কার পক্ষ নেওয়া উচিত, তা ব্রাত্য বসু স্পষ্টতই জানিয়েছিলেন। ফলে, তৃণমূল কংগ্রেস যখন থেকে ক্ষমতায় আসে, এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষটিকে কখনও দূরে সরিয়ে রাখেননি মুখ্যমন্ত্রী। এই নিয়ে তিনি চতুর্থবার প্রার্থী, টিকিট পেয়ে দাঁড়িয়েছেন দমদম থেকে। জিতেছেন গত তিনবারই। এবারে প্রার্থী হয়েও তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমোকে। বিনয় সহকারে বলেছেন, আমি শুধু নয়, আমার জায়গায় যে-কেউ দাঁড়ালেই তিনি জিতবেন। দিন কয় আগে প্রার্থী ঘোষণার পর যখন নানা রাজনৈতিক কর্মীরা আশাহত, ক্ষোভ উদগার করছেন, তখন ব্রাত্য বসুর এহেন উক্তি বাংলার রাজনৈতিক আত্মমগ্নতার বাজারে কাঙ্ক্ষিত উদাহরণ হয়ে থেকে যাবে।
একজন ফুলটাইম রাজনীতির লোক হয়েও, শিক্ষামন্ত্রী হয়েও, তিনি নিরন্তর বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা থেকে সরে যাননি। নতুন নাটক তিনি আর পরিচালনা করছেন না বটে, কিন্তু অভিনয় করছেন, সিনেমা বানাচ্ছেন, লিখছেন। ইদানীংকালে তাঁর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলা নাটকের ইতিহাসের অভূতপূর্ব নির্মাণ।
বারেবারেই আক্রমণের শিকার হয়েছে তিনি। কিন্তু থেকেছেন স্থিতধী, শান্ত হয়েই। দেখিয়ে দিয়েছেন রাজনীতি কেবলমাত্র আবেগের বুদ্বুদ নয়, যুক্তির ধাতব পিন সেই আবেগ ফাটিয়ে সত্যিটা বের করে আনতে পারে। আক্রমণের উল্টোদিকে আক্রমণ নয়, বরং ক্ষোভের কেন্দ্রে গিয়ে পরিস্থিতিকে বিচার করার চেষ্টাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে জরুরি করে তুলেছে বঙ্গ-রাজনীতির ইতিহাসে।
এসবের পরও, একজন ফুলটাইম রাজনীতির লোক হয়েও, শিক্ষামন্ত্রী হয়েও, তিনি নিরন্তর বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা থেকে সরে যাননি। নতুন নাটক তিনি আর পরিচালনা করছেন না বটে, কিন্তু অভিনয় করছেন, সিনেমা বানাচ্ছেন, লিখছেন। ইদানীংকালে তাঁর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলা নাটকের ইতিহাসের অভূতপূর্ব নির্মাণ। ‘অদামৃতকথা’ কিংবা ‘দ্যূতক্রীড়ক’ তো বটেই, থিয়েটার নিয়ে চিন্তাভাবনার কথা ধরা পড়েছে তাঁর ‘আমি যে তোমাকে পড়ি আমি যে তোমার কথা বুঝি’তে। ‘থিয়েটার বিষয়ক কবিতা’র বইটিও তাঁর আত্মপরিচয়। ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ নিয়ে যে তর্কবিতর্কর বালি জমেছিল অভিনয়ের সময়ে, সেই সময় থেকে ‘সিনেমার মতো’– তিনি মঞ্চ ছাড়েননি। এখন সরে দাঁড়িয়েছেন মাত্র।
ইদানীংকালে তাঁর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন বাংলা নাটকের ইতিহাসের অভূতপূর্ব নির্মাণ। ‘অদামৃতকথা’ কিংবা ‘দ্যূতক্রীড়ক’ তো বটেই, থিয়েটার নিয়ে চিন্তাভাবনার কথা ধরা পড়েছে তাঁর ‘আমি যে তোমাকে পড়ি আমি যে তোমার কথা বুঝি’তে। ‘থিয়েটার বিষয়ক কবিতা’র বইটিও তাঁর আত্মপরিচয়।
দু’টি আশা আমমানুষ করতেই পারে তাঁর কাছ থেকে। রাজনীতিবিদ ব্রাত্য বসুর কাছ থেকে বাংলা মাধ্যম স্কুলের পরিকাঠামোর উন্নয়ন, যা দু’চার মুহূর্তের কাজ নয়, নিরন্তর, নিষ্পলক অনুধ্যান হয়তো-বা হাল ফেরাতে পারে তার।
দ্বিতীয় আশা, নাটকের ব্রাত্য বসুর কাছে। তিনি মঞ্চে ফিরুন। মঞ্চ-ইতিহাস থেকে মঞ্চ-বর্তমানে। ভুলে গেলে চলে না, তিনি শুধুই একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বাংলা নাটকেরও দুরন্ত স্কিপারও!
নিবেদিত


