মহাকাব্যের বিস্তার আসলে অনেক গভীরে। কেবলই আখ্যানের নিক্তিতে তাকে মাপতে যাওয়া যে ভুল, তা কোনও নতুন কথা নয়। মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রাবণকে যেমন করে তুলে ধরেছিল, কর্বুররাজকে তার আগে আমরা সেভাবে পাইনি। রামায়ণের অনেক সংস্করণ রয়েছে, সেখানে কাহিনিকেও নানাভাবে ভেঙেচুরে দেওয়া হয়েছে। তবে মান্য যে কাহিনি-কাঠামো, কেবল সেটারই এক অনন্য ব্যাখ্যা বুঝিয়ে দেয়, সীতা কীভাবে রামায়ণের একেবারে মূল কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
মহাভারতের একেবারে শুরুতেই কুলপতি মহর্ষি সৌতি জানিয়েছিলেন, মহাভারতের কাহিনি এর আগেও অন্যরা বলেছেন। আবার ভবিষ্যতেও অন্যরা বলবেন। একথা কেবল মহাভারত নয়, রামায়ণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আসলে মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্যই যে তাই। যুগে যুগে দেশকাল তাকে নিজের মতো করে গড়ে তুলবে। এই বিভিন্ন সংস্করণগুলির কথা ভাবতে বসলে সত্যিই অবাক হতে হয়। চেনা কাহিনি কীভাবে বদলে বদলে গিয়েছে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির আঁচে! কীরকম পরিবর্তন? একটা উদাহরণ দেওয়া যাক।
আরও পড়ুন:

রামায়ণের এমন সংস্করণের হদিশও মেলে, যেখানে রাবণ সীতার বাবা! জন্মের পরই নিজের শিশুকন্যাকে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন লঙ্কাধিপতি। এমনকী সীতার জন্মকাহিনিও আলাদা। কিন্তু এই লেখায় আমরা তেমন সংস্করণগুলির কথা বলছি না। বলছি রামায়ণের গভীরে নিহিত সীতার আখ্যানের কথা।
আরও পড়ুন:
মহাভারতের একেবারে শুরুতেই কুলপতি মহর্ষি সৌতি জানিয়েছিলেন, মহাভারতের কাহিনি এর আগেও অন্যরা বলেছেন। আবার ভবিষ্যতেও অন্যরা বলবেন। একথা কেবল মহাভারত নয়, রামায়ণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
আদি কবি মহর্ষি বাল্মীকি লিখেছিলেন, ‘কাব্যং রামায়ণং কৃৎস্নং সীতায়াশ্চরিতং মহৎ।’ অর্থাৎ রামায়ণে সীতার জীবনগাথা অতি গৌরবময় ও পবিত্র। বহুবারের চেনা কাহিনি একবার নতুন করে স্মরণ করলেই তা বোঝা যায়। আসলে রাবণের বিনাশের জন্যই নারায়ণের রাম অবতারে ধরণীতে আগমন। এর নেপথ্যে ছিল রাবণের তপস্যা। শিবের থেকে তিনি দশ মাথা ও বিশেষ শক্তি লাভ করেছিলেন। আর ব্রহ্মার কাছে তিনি বর চান কোনও দেব-অসুর-যক্ষ-রাক্ষস-নাগ-গন্ধর্ব-পশু কেউই তাঁকে যেন বধ করতে না পারে। মানুষের কোনও উল্লেখ তিনি করেননি। ব্রহ্মা জানতে চাইলেন, কেন রাবণ মানুষের কথা বলছেন না। জবাবে রাবণ তাঁর তীব্র অহং দেখিয়ে বলে ওঠেন, ”সামান্য মানুষ আমার কীই বা করবে?” এই অহংই ছিল রাক্ষসরাজের ধ্বংসের সূচিমুখ।

রামায়ণের এমন সংস্করণের হদিশও মেলে, যেখানে রাবণ সীতার বাবা! জন্মের পরই নিজের শিশুকন্যাকে মাটিতে পুঁতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন লঙ্কাধিপতি।
‘সামান্য মানুষ’-এর বেশেই বিষ্ণু অধর্মের প্রতীক রাবণকে বধ করতে জন্মগ্রহণ করলেন রাজা দশরথের পরিবারে। কিন্তু এক ‘সাধারণ’-এর সঙ্গে রাবণের মতো মহাযোদ্ধার লড়াই হবে কীভাবে! এই কারণেই লক্ষ্মীর সীতার রূপ ধরে জন্মগ্রহণ। রাবণ যেহেতু ন’টি গ্রহ সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল ছিলেন, তাই সাধারণ মানবীর মতো সীতা জন্ম নিলে তিনি ঠিকই টের পেয়ে যেতেন। সেক্ষেত্রে তিনি তাঁকে হত্যা করলে পরবর্তী আখ্যান জন্ম নিতেই পারত না। তাই সীতা জন্ম নিলেন মাটির কোল থেকে! ফলে রাবণ জানতেও পারলেন না কিছু। বছর ছয়েক বয়সে পরশুরামকে দেখেই তাঁর সামনে হরধনু তুলে ধরেছিলেন ছোট্ট সীতা। যা দেখে ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয় যোদ্ধা জানিয়ে দেন, যে এই ধনুতে গুণ পরাতে পারবে সেই হবে সীতার স্বামী। পরবর্তী সময়ে যে শর্ত পূরণ করে সীতার পাণিপ্রার্থী রাম তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। যখন রামের বনবাসের সময় এল, তিনি কিন্তু সীতাকে বলেছিলেন প্রাসাদেই থেকে যেতে। কেননা বাবা কেবল তাঁকেই বনবাসের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সীতা রাজি হননি। আসলে লক্ষ্মী জানতেন, তিনি অরণ্যে না গেলে এই আখ্যান যে এগতেই পারবে না!
স্বর্ণমৃগের বিষয়টিও ধরা যাক। সোনার হরিণ যে বাস্তবে হয় না তা কি সীতার অজানা ছিল? তবুও সেই হরিণের জন্য আবদার করলেন। রামকে পাঠালেন জঙ্গলের গভীরে। এমনকী লক্ষ্মণকেও রীতিমতো তিরস্কার করেই তিনি জঙ্গলের পথে পাঠান। কেননা তিনি জানতেন, রাবণ তাঁকে হরণ না করলে রাম লঙ্কায় গিয়ে রাবণবধ করবেন না। আবার, অশোকবনে যখন বীর হনুমান এলেন, চাইলে তাঁর সঙ্গেই রামের কাছে পৌঁছে যেতে পারতেন সীতা। এবং সেক্ষেত্রেও আসল উদ্দেশ্য পূরণ হত না। এভাবেই আখ্যানের ‘বিটুইন দ্য লাইনসে’ লুকিয়ে রয়েছেন সীতা! সমগ্র মহাকাব্যের ঘটনাক্রমের মূল চালিকাশক্তি তিনিই।
আদি কবি মহর্ষি বাল্মীকি লিখেছিলেন, ‘কাব্যং রামায়ণং কৃৎস্নং সীতায়াশ্চরিতং মহৎ।’ অর্থাৎ রামায়ণে সীতার জীবনগাথা অতি গৌরবময় ও পবিত্র। বহুবারের চেনা কাহিনি একবার নতুন করে স্মরণ করলেই তা বোঝা যায়।
সীতা ত্যাগ ও তিতিক্ষার এক চিরকালীন প্রতীক। চরিত্র বিশ্লেষণ করতে বসলেও নতজানু হতে হয় সত্যের এমন অপরূপ মূর্তি দেখে। শ্রীরামের ধর্ম, সত্য, ন্যায় ও আদর্শ আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। এরই সমান্তরালে রয়েছেন সীতা। তাঁর ধৈর্য ও সততাও আমাদের মুগ্ধ করে। উদ্দীপনা জোগায়। মহাকাব্যের আসল প্রাপ্তি এটাই। চরিত্রগুলির শক্তি যেমন এক বড় প্রাপ্তি, তেমনই আখ্যানের নেপথ্যে থাকা নীতিশিক্ষাও। আর এই দুইয়েরই নিক্তিতেই সীতা হয়ে ওঠেন এক মহতী আদর্শ।
সর্বশেষ খবর
-
কালিম্পংয়ে বসে চিকেনস নেকের তথ্য পাচার! পুলিশের জালে আফগান যুবক, বড় নির্দেশ পুলিশের
-
৩০০ কোটি পেরিয়ে বেনজির সাফল্য, দেখা করে টিম ‘হনুমান অংশ’কে শুভেচ্ছা দেবেন্দ্র ফড়নবিশের
-
‘সব সীমা ছাড়িয়েছে’, দিল্লিতে কিশোরীর ধর্ষণ ও খুনে অমিত শাহকে নিশানা রাহুল-প্রিয়াঙ্কার
-
আইফোন হাতাতে খুন স্কুলপড়ুয়া! জঙ্গলে উদ্ধার দেহ, নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশে
-
টিটাগড়ে আলুর গোডাউনে বোমাবাজি! ‘যে কোনও সময় প্রাণ যেতে পারে’, দুষ্কৃতী তাণ্ডবে সিঁটিয়ে ব্যবসায়ীরা