১৫০ বছর আগে পথ চলা শুরু, এবার এশিয়াডে সামুরাইয়ের দেশ, জানুন জাপান ক্রিকেটের অজানা ইতিহাস
ব্রিটিশদের বিনোদন হিসাবে শুরু হওয়া ক্রিকেটই জাপানে আজ ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় তৈরি করছে।
ক্রিকেটে জাপানের নাম সচরাচর আসে না। দেশটির প্রধান খেলাগুলির তালিকার প্রথমসারিতে থাকবে সুমো কুস্তি, বেসবল, মার্শাল আর্ট, ফুটবল। অথচ সূর্যোদয়ের দেশে ক্রিকেটের ইতিহাসও বেশ পুরনো। উনিশ শতকের ষাটের দশকে ব্রিটিশদের হাত ধরে জাপানে পা রাখে এই খেলা। ১৮৬৩ সালের জুনে ইয়োকোহামায় ব্রিটিশ বণিকদের সঙ্গে রয়্যাল নেভির ক্রিকেট ম্যাচের কথা নথিতে রয়েছে। তর্কসাপেক্ষে এটিই পূর্ব এশিয়ার দেশটির প্রথম ক্রিকেট ম্যাচ।
আরও পড়ুন:
মেইজি যুগে ((১৮৬৮-১৯১২) জাপান যখন সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে দ্রুত আধুনিকতার পথে এগোচ্ছে, তখনই দেশের বন্দরনগরীগুলিতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় ক্রিকেট। ইয়োকোহামা ও কোবের মতো শহরে মূলত ব্রিটিশ প্রবাসী, বণিক এবং নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত মানুষই খেলতেন। ১৮৬৮-তে ইয়োকোহামা ক্রিকেট ক্লাব গঠনের মধ্য দিয়ে খেলাটি আরও সংগঠিত রূপ পেতে শুরু করে। তবে জাপানি সমাজে ক্রিকেট তখনও ছিল ‘প্রান্তিক’ খেলা।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে আশির দশকে। ১৯৮৪ সালে গঠিত হয় জাপান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (জেসিএ)। লক্ষ্য ছিল, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্রিকেটকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে জাপানের যোগাযোগ তৈরি করা। সেই উদ্যোগের ফলও মেলে পাঁচ বছরের মধ্যে। ১৯৮৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসির অনুমোদিত সদস্যপদ পায় জাপান।
আরও পড়ুন:
আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার পর শুরুটা মোটেই সুখকর হয়নি। ১৯৯৬ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এসিসি ট্রফিতে প্রথমবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামে জাপান। হার দিয়েই অভিযান শুরু করেছিল তারা। ফিজির কাছে ৩৮০ রানের বিশাল ব্যবধানে হার মানতে হয়। ৫০ ওভারে ফিজির দেওয়া ৪৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৮৯ রানে গুটিয়ে যায় জাপান। ১৯৯৮ এবং ২০০০ সালের এসিসি ট্রফিতেও সাফল্য অধরা থাকে।
২০০০ সালের পর এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের পরিসর ছেড়ে জাপান চলে যায় আইসিসির ইস্ট এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের আওতায়। ২০০২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় ইস্ট এশিয়া এইটস প্রতিযোগিতায় রানার্স হয় তারা। ২০০৪ সালে নিজেদের দেশে ইস্ট এশিয়া প্যাসিফিক ক্রিকেট চ্যালেঞ্জ আয়োজন করে জাপান। বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করেছিল তারা।
২০০৫ সালে জাপানের ক্রিকেটে আসে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। আইসিসির সহযোগী সদস্যের মর্যাদা পায় দেশটি। সেই বছর ভানুয়াতুতে আইসিসি ইএপি ক্রিকেট কাপ জিতে নেয় জাপান। ফাইনালে কুক দ্বীপপুঞ্জকে হারিয়ে আসে সেই সাফল্য। দু’বছর পর ২০০৭ সালের ইএপি ক্রিকেট ট্রফিতেও চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। ফলে ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের পঞ্চম ডিভিশনে খেলার সুযোগ মেলে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরও একটি ঐতিহাসিক দিন আসে ২০২২ সালের ৯ অক্টোবর। ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে জাপান। এর আগে ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দল প্রথম বার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করে। এভাবেই সিনিয়র দলের পাশাপাশি বয়সভিত্তিক ক্রিকেটেও জাপান ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে শুরু করে।
আজও জাপানে ক্রিকেট জনপ্রিয়তার বিচারে বেসবল বা ফুটবলের ধারেকাছেও নেই। হাল ছাড়েনি জেসিএ। জাপান ক্রিকেট লিগ, জাপান কাপের মতো প্রতিযোগিতার পাশাপাশি স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে ক্রিকেট ছড়িয়ে দিতে ‘ক্রিকেট ব্লাস্টে’র মতো কর্মসূচি চলছে। ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল থেকে আসা অভিবাসী সম্প্রদায়ের হাত ধরেও বাড়ছে ক্রিকেটের পরিধি। ব্রিটিশদের বিনোদন হিসাবে শুরু হওয়া ক্রিকেটই জাপানে আজ ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় তৈরি করছে।
জাপানের আইচি নাগোয়ায় বসছে এশিয়ান গেমস। ১৯ তারিখ থেকে শুরু ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। ২৪ তারিখ আফগানিস্তানের সঙ্গে অভিযান শুরু করবে জাপান। যদিও উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে সেখানে। তাতে মোটেই সন্তুষ্ট নয় ভারতীয় বোর্ড। ক্রিকেট মাঠগুলোতে কোনও সাজঘর নেই। তাঁবু খাটিয়ে অস্থায়ী সাজঘর তৈরি করা হবে। তাঁবুর ৫০০ মিটার দূরে শৌচালয়। এমন মাঠে হবে এশিয়াডের ম্যাচ।