২২ গজের ‘ঈশ্বর’ মাঠের বাইরেও ‘মসিহা’! নিঃশব্দে করেন মানবসেবা, রইল অন্য শচীনের কাহিনি
মাঠের বাইরে সামাজিক জীবনেও তিনি এক অসামান্য মানুষ। বিপণ্ণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন সব সময়।
শুক্রবার শচীন পা দিলেন তিপ্পান্নয়। জন্মদিনে শুভেচ্ছায় ভেসে যাচ্ছেন লিটল মাস্টার! অবসরের এত বছর পরেও এই ক্যারিশমা অভাবনীয়। কিন্তু শচীন কি কেবলই বাইশ গজের 'ঈশ্বর'? ঘনিষ্ঠ মানুষেরা জানেন মাঠের বাইরে সামাজিক জীবনেও তিনি এক অসামান্য মানুষ। সমাজের বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে একজন নিবেদিত সমাজসেবী হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। জন্মদিনে রইল সেই অন্য শচীনের গল্প।
আরও পড়ুন:
২০১৩ সালের ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন শচীন তেণ্ডুলকর। এরপর থেকেই মন দেন সমাজসেবায়। যদিও তার আগেও ক্রিকেট কেরিয়ারের ব্যস্ততম সময়ে বন্ধু থেকে আত্মীয়, সকলের বিপদে, সমস্যায় যতটা পেরেছেন পাশে থেকেছেন লিটল মাস্টার। কিংবদন্তি ক্রিকেটার হয়েও স্রেফ খেলা নয়, দেশের যে কোনও বিপর্যয়ে নিজের সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। ২৬/১১-র পর করা শতরান উৎসর্গ করেছিলেন নিহতদের উদ্দেশে।
শচীনের অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিলেন দ্বারকানাথ সন্সগিরি। বিখ্যাত মারাঠি লেখক-সাংবাদিক মানুষটি ক্যানসার আক্রান্ত হন। সেবছর লিটল মাস্টার ৫০ বছরের জন্মদিন। প্রথমে জন্মদিনের জমকালো আয়োজনে তেমন সায় ছিল না তাঁর। কিন্তু সন্সগিরির অসুখের কথা জানার পর রাজি হয়ে যান। কারণ তিনি ঠিক করে নিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানে যা লাভ হবে, পুরোটাই তিনি তুলে দেবেন কর্কট রোগাক্রান্ত বন্ধুর চিকিৎসায়।
এরকম উদাহরণ অনেক রয়েছে। তবে সব সময়ই শচীন চেয়েছেন বিষয়টি গোপন রাখতে। ফলাও করে সকলকে সমাজসেবার কথা জানিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর কাছে 'অশ্লীলতা'। সন্সগিরির ব্যাপারটিও গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তা প্রকাশ্যে চলে আসে শচীনের যাবতীয় চেষ্টা সত্ত্বেও। সন্সগিরির প্রসঙ্গে মনে পড়ে যাবে তাঁর অসুস্থ বাল্যবন্ধু বিনোদ কাম্বলির কথাও। তাঁর দাবি ছিল, শচীন তাঁর জন্য যথেষ্ট করেননি!
আরও পড়ুন:
পরে অবশ্য কাম্বলি স্বীকার করেন, একটা বিরক্তি বোধ থেকেই তিনি এমন মন্তব্য করে বসেছিলেন। জানিয়ে দেন, ২০১৩ সালে হওয়া তাঁর দু'টি অস্ত্রোপচার-সহ আরও নানা প্রয়োজনে সবচেয়ে আগে যিনি এসে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি শচীন। বাল্যবন্ধুর জন্য যথাসাধ্য করেছেন মাস্টার ব্লাস্টার। এমনকী, সম্প্রতি অসুস্থ কাম্বলির পাশে দাঁড়াতে তৈরি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও তিনি থেকেছেন। যখন যতটা পেরেছেন কাম্বলির জন্য করে গিয়েছেন।
বন্ধু-আত্মীয়স্বজন তো বটেই। শচীনের মানবদরদী হৃদয়ের পরিচয় পেয়েছেন অপরিচিতরাও। ২০১৯ সালে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী ড. অঞ্জলি তেণ্ডুলকর প্রতিষ্ঠা করেন শচীন তেন্ডুলকর ফাউন্ডেশন। শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, অপুষ্টি দূর করা এবং উন্নত চিকিৎসায় সহায়তা যে সংগঠনের উদ্দেশ্য। প্রতিভাবান কিন্তু আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া খেলোয়াড়দের পাশেও দাঁড়ান শচীনরা।
সাংসদ থাকাকালীন তিনি 'সংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা'র অধীনে দু'টি গ্রাম দত্তক নিয়েছিলেন। সেখানে পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ সংযোগ, জল সরবরাহের মতো নানা পদক্ষেপ করেছিলেন। 'আপনালয়' নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমেও বহু শিশুর দেখাশোনার ভার নিয়েছেন। কোভিডের সময় বিপুল অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন 'ভারতরত্ন' ক্রিকেটার। শ্রীলঙ্কা ও নেপালে গিয়েও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন সেই সময়।
২০১৩ সালে ইউনিসেফের আঞ্চলিক শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নিযুক্ত হন শচীন। শিশুদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির উন্নতির জন্য লড়াই করে গিয়েছেন তিনি। এদিকে মেয়েদের পুষ্টি, শিক্ষা এবং লিঙ্গ সমতা নিয়েও বারবার সরব হয়েছে। এবারের জন্মদিনের আগেও একদা নকশাল অধ্যুষিত বস্তারে শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলোয় সময় কাটান 'মাস্টার ব্লাস্টার'।