বঙ্গ রাজনীতির ময়দানে তিনি প্রার্থী নন। তাঁর পরিচিতি চিকিৎসক হিসেবেই। তবে ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা বারেবারেই জন্ম দিয়েছে জল্পনার। কখনও শোনা গিয়েছে, টিকিট পেতে চলেছেন তিনি। কখনও ‘বাম’ ছেড়ে ‘রামে’ যাওয়ায় সইতে হয়েছে কটাক্ষ। সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ডাক্তার নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Narayan Banerjee)।
প্রশ্ন: আপনি কি চিকিৎসা করার আগে রোগীকে বলেন, ‘এই স্লোগান দিলে তবেই ডিসকাউন্ট পাবেন’? আমি যদি ‘জয় শ্রীরাম’ বা ‘জয় বাংলা’ বলি, তাহলে কি আপনার ভিজিট মাফ করবেন?
উত্তর: না, আমি যখন রোগী দেখি, তখন একটাই পরিচয়— আমি ডাক্তার। রোগী দেখার পরের যে ফাঁকা সময়, তখন আমি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করি। হিন্দু-মুসলিম হোক, অথবা বাম-সিপিএম-বিজেপি— বিভিন্ন দলের মানুষই আমার কাছে চিকিৎসার জন্য আসেন, আমি সবার সঙ্গেই একইরকম ব্যবহার করি। তবে পেশেন্টদের সঙ্গে আমি গল্প করি, তাদের আর্থিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করি। যখন আমি স্টেথোস্কোপ নিয়ে ডাক্তার হিসেবে বসি, তখন আমার কাছে ‘জয় শ্রীরাম’ অথবা ‘জয় বাংলা’র কোনও মূল্য নেই।
আরও পড়ুন:
“আমি মনে করি, সবাইকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে। বামেদের এখন সেই শক্তি নেই যে তারা ৪০% ভোট কাটতে পারবে। কিন্তু বিজেপি তা করতে সক্ষম। তাই এই মুহূর্তে তৃণমূলকে সরাতে চাইলে, সমস্ত স্তরের নাগরিককেই আমি অনুরোধ করব— পদ্মফুলে ভোট দিন। এই লড়াইয়ে মোকাবিলা করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে বামপন্থীদের নেই।”
প্রশ্ন: আপনি বামপন্থায় বিশ্বাসী। হঠাৎ করে বাম থেকে রামের দলে হয়ে যাওয়া কেন?
উত্তর: আমি কট্টরভাবে তৃণমূল বিরোধী। আমি চাই না গত ১৫ বছরে যে দুর্নীতি হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরেও তা চলুক। বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু বর্তমানে বামেদের ভূমিকা কেবলমাত্র ভোট কাটা! যেমন গত বছর বরানগর উপনির্বাচনের কথা যদি বলি, সায়ন্তিকা ভট্টাচার্য বড় মার্জিনে জিতেছেন। সেখানে বিজেপির ভোট বামেরা কেটেছে বলেই সায়ন্তিকা জিততে পেরেছেন। আমি মনে করি, সবাইকে তৃণমূলের বিরুদ্ধে একজোট হতে হবে। বামেদের এখন সেই শক্তি নেই যে তারা ৪০% ভোট কাটতে পারবে। কিন্তু বিজেপি তা করতে সক্ষম। তাই এই মুহূর্তে তৃণমূলকে সরাতে চাইলে, সমস্ত স্তরের নাগরিককেই আমি অনুরোধ করব— পদ্মফুলে ভোট দিন। এই লড়াইয়ে মোকাবিলা করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে বামপন্থীদের নেই।

প্রশ্ন: বামপন্থীরা কি বিকল্প শক্তি হিসেবে উঠে আসতে পারে না?
উত্তর: গতবার আমি সিপিএমকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। রাজ্যে দুর্নীতি, এসএসসি স্ক্যামের মতো এতগুলো বড় ইস্যু রয়েছে। আজ যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধিতায় থাকতেন, তাহলে হয়তো বাংলা বন্ধ করে দিতেন। অথচ যখন ২৬ হাজার মানুষের পাওয়া চাকরি চলে গেল, সেখানে বামেরা কোথায়? তারা তো রাস্তায় অবরোধ করছে না। কেবল ফেসবুকে বিপ্লব করতেই ব্যস্ত। সে জন্য আমার মোহভঙ্গ হয়েছে। নতুন প্রজন্মের বামপন্থীদের আমি সম্ভাবনাময় মনে করি, কিন্তু তাদের কিছুটা সময় লাগবে। সর্বস্তরের শক্তিশালী প্রতিবাদ গড়ে তুলতে গেলে, বামপন্থীদের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকেই শিখতে হবে, কীভাবে বিরোধিতা করতে হয়।
প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রীর ব্রিগেড সভায় প্রথম সারিতে উপস্থিত ছিলেন। এরপর বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হয়, এবং আমাদের সূত্রের খবর অনুযায়ী আপনার কাছেও প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব এসেছিল। কেন প্রার্থী হলেন না?
উত্তর: আমাকে বহুবার প্রার্থী হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। লোকসভা ইলেকশনের সময়, দমদম লোকসভা কেন্দ্রে বামফ্রন্ট আমাকে না জানিয়েই প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। সেটা ভুল ছিল, বিজেপি তেমন করেনি। আমি অত্যন্ত মার্জিতভাবে চিঠি লিখে জানিয়েছি যে আমি ডাক্তার। এবং এই মুহূর্তে ডাক্তারিই করতে চাই কেবল। রাজনীতি থেকে আলাদা করে আমার কিছু পাওয়ার নেই।
প্রশ্ন: যদি বিজেপি ক্ষমতায় আসে, আপনি কাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান?
উত্তর: সেটা দলই ঠিক করবে। তবে আমি চাই, এমন একজন বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী হন যিনি ভালো বাংলা বলতে পারেন, জ্ঞানী এবং কটু কথা বলেন না।
“উড়িষ্যা বা অসমেও তো বিজেপির সরকার আছে, সেখানে কোথাও হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। পুরীতে গেলে মানুষ উড়িয়াতেই কথা বলে, অসমে অসমিয়া, মহারাষ্ট্রে মারাঠি। এই মিথ্যে প্রচার চালান হচ্ছে, যাতে বাঙালির সিম্প্যাথি তৃণমূলের ওপর পরে।”
প্রশ্ন: আপনি একজন আদ্যোপান্ত বাঙালি। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর নানা ইস্যু নিয়ে তৃণমূল বারবার প্রশ্ন তুলছে। কীভাবে ব্যালেন্স করবেন? আপনার দিকেও তো নানা প্রশ্ন আসে নিশ্চয়ই।
উত্তর: ওড়িশা বা অসমেও তো বিজেপির সরকার আছে, সেখানে কোথাও হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। পুরীতে গেলে মানুষ উড়িয়াতেই কথা বলে, অসমে অসমিয়া, মহারাষ্ট্রে মারাঠি। এই মিথ্যে প্রচার চালানো হচ্ছে, যাতে বাঙালির সিম্প্যাথি তৃণমূলের উপর পরে। আজকে পূর্বপ্রান্তে যারা আছে, তারাও পশ্চিমপ্রান্তের মতোই শত্রু। পূর্বপ্রান্ত সিল করতে হবে, কিন্তু সবচেয়ে বড় মুশকিল, এই পূর্ব প্রান্ত থেকে প্রচুর ইনফিল্ট্রেশন হয়। এবং মুসলিমদের ক্ষেত্রে ধরেই নেওয়া হয় যে তারা ভোটার। তাদের উন্নতির দিকে তাকানো হয় না। তা করলে, মাদ্রাসাগুলোর পেছনে ৫৩০০কোটি টাকা ব্যয় করতে হত না। যখন আমি মিস্টার কুণাল ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম, সবাই ধরে নিল আমার নিজস্ব কোনও স্বার্থ আছে। বিশেষ করে বামেদের কিছু সাপোর্টার কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তন করতে হয়। নাহলে পিছিয়ে পড়তে হয়।
প্রশ্ন: ধরা যাক, নতুন সরকারের পক্ষ থেকে আপনাকে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হল। রাজি হবেন?
উত্তর: আমার মনে হয়, একজন শিক্ষিত মুখ্যমন্ত্রী প্রয়োজন। তবে বিজেপি প্রার্থী অথবা সদস্য না হলে তো আর মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাপাসিটি দরকার, আমার সেসব নেই। আমি ডাক্তার হিসেবে ভালো হতে পারি, কিন্তু প্রশাসনে সফল হবই, এমন বলা যায় না। আমি মানুষকে সহজে বিশ্বাস করি, তারপর ঠকি। তবে স্বাস্থ্য দপ্তর সংক্রান্ত কোনও দায়িত্ব পেলে, বিনা পারিশ্রমিকে হলেও করতে পারব। কারণ স্বাস্থ্যবিভাগের দুর্বলতাগুলো আমার জানা।
প্রশ্ন: অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব এলে আপনি রাজি হবেন? আগামিদিন সম্পর্কে বড় কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছেন কি?
উত্তর: এখনও তেমন কোনও কথা হয়নি। মন্ত্রী পদ অনেক বেশি দায়িত্বের। বরং উপদেষ্টা হওয়া যেতে পারে। বিজেপি সর্বভারতীয় স্তরে অত্যন্ত বড় একটি দল। আমাকে যে দায়িত্বে রাখলে সুবিধে, ওঁরা তা ভেবেই সিদ্ধান্ত নেবেন। এমন কোনও কাজ দেওয়া হবে না, যা আমি করতে পারব না।
নিবেদিত


