তিনি একাধারে চিত্র পরিচালক, অভিনেতা, প্রোডিউসার, রাজনীতিবিদ। ২০২১ বিধানসভা ভোটে বারাকপুর থেকে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন লড়ে বিধায়ক হন। এবারও বারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী। বিপক্ষে বিজেপির কৌস্তভ বাগচী। সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রাজ চক্রবর্তী (Raj Chakraborty)।
প্রশ্ন: বারাকপুরে দল আবারও আপনাকে প্রার্থী করেছে। প্রচারে মানুষের উচ্ছ্বাস। আপনি কতটা আশাবাদী?
উত্তর: কেবল আশাবাদী না বলে বরং মার্জিন কত হবে, সে প্রশ্ন করো। আগেরবারের তুলনায় তিন গুণ বাড়বে, এটুকু নিশ্চিত। বাচ্চা-বুড়ো সবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এমনকী একটা ছোট বাচ্চাও কেঁদে বলছে, “রাজদা ডাকেনি”- তার কাছেও ছুটে যেতে হয়েছে। আমি মনে করি, একজন জনপ্রতিনিধির কাছে কাজের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ অনেক সময়েই মুখে বলতে চায়। সেই সব কাজ হয়তো করা সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যাটা বোঝার চেষ্টা তো করা উচিত। ছোট থেকেই আমি যেচে গিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি। সেটা কেবল আমার নির্বাচনী এলাকায় নয়, সবক্ষেত্রেই।
আরও পড়ুন:
“নিন্দুকেরা তো নিন্দা করবেই, আমি বিরোধী হলেও তাই করতাম। আমার প্রশংসা করবে, এমন দম কি কোনও বিরোধীর আছে? রাজ চক্রবর্তী সপ্তাহে ৪-৫ দিন বারাকপুরে আসেন। তিনি যদি মন দিয়ে কাজ না করতেন, তবে রাস্তায় বেরোলে মানুষের এই উচ্ছ্বাস দেখা যেত না।”
প্রশ্ন: আপনার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির কৌস্তভ বাগচী। ‘দিবাস্বপ্ন’, ‘চুল গজানো’র মতো মজাদার বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। আপনার অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী বামপ্রার্থী সুমন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না, দুই প্রার্থী এই নিয়েই মেতে আছেন। আপনার মতামত কী?
উত্তর: ইলেকশনের সময় এমন বাগবিতণ্ডা হয়েই থাকে। মিডিয়াও একটু কনফ্লিট পছন্দ করে। মিডিয়ার জন্যই করি আমরা! সিপিআইএমকে নিয়ে আমি কখনওই কথা বলি না। কৌস্তভকে নিয়ে যেটা বলি, সবটাই মিডিয়ার জন্য। আমার মনে হয়, ও-ও তাই। সব টিমই এ সময়ে একটু গা গরম করতে চায়। আমি জ্ঞানত কাউকে আঘাত করা পছন্দ করি না। আমি এন্টারটেনমেন্ট জগতের মানুষ, কৌস্তভও সবসময় মিডিয়ার সামনে থাকে, তাই ও জানে কোনটা বলা উচিত আর কোনটা নয়।
প্রশ্ন: নিন্দুকেরা বলেন, বিধায়ক রাজকে এলাকায় তেমন দেখা যায় না। তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন।
উত্তর: নিন্দুকেরা তো নিন্দা করবেই, আমি বিরোধী হলেও তাই করতাম। আমার প্রশংসা করবে, এমন দম কি কোনও বিরোধীর আছে? রাজ চক্রবর্তী (Raj Chakraborty) সপ্তাহে ৪-৫ দিন বারাকপুরে আসেন। তিনি যদি মন দিয়ে কাজ না করতেন, তবে রাস্তায় বেরলে মানুষের এই উচ্ছ্বাস দেখা যেত না। ওটা বিরোধীদের একটা ফর্মুলা। ইলেকশনের সময় এসব নাটকবাজি করলে হবে? পাঁচ বছর ধরে আসোনি কেন? এখানে প্রত্যেকটা মানুষ জানে যে আমি যদি কোনও একটা কাজের জন্য বলি, সেটা না হওয়া অবধি তার কানের পোকা বের করে দিই! আমি শো-অফ করি না। এখন বিরোধীদের দেখানোর জন্য ভিডিও করতে হচ্ছে। না হলে আমি চাই, মানুষ আমাকে কাজ দিয়েই চিনুক।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৩৬৫ দিন মানুষের জন্য কাজ করেন। সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ তাঁর জন্যই ভালো আছে। যেদিন তিনি থাকবেন না, সেদিন বাংলা বুঝতে পারবে যে বাংলার গর্ব-কৃষ্টি-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সব শেষ হয়ে গেল। মেয়েদের সুরক্ষা থাকবে না। তোমার তৃণমূল পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু বিজেপি তার বিকল্প হতে পারে না। বিজেপি এমন একটি অহংকারী ও স্বৈরাচারী দল, যারা দেশের সংবিধান বদলে দিতে চায়। সারা দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একজন নেত্রী যিনি বিজেপির সঙ্গে এইভাবে লড়াই করছে। তাই তো বিজেপি ওঁকে শেষ করতে চায়। জানে, এঁকে শেষ করতে পারলে ওদের দিকে আঙুল তোলার মতো ক্ষমতা আর কারও নেই। বাকিরা ইডি-সিবিআইয়ের ভয়ে ঘরে ঢুকে যাবে। বিজেপির প্রার্থী এখানকার ক’জন মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন? মহিলাদের অসম্মান করেছেন। আজ গ্যাসের দামের এই অবস্থা। আমাকে মানুষ বলল, উনুনে রান্না হচ্ছে। বিজেপির প্রার্থী যখন বাড়িতে বাড়িতে যাবে, তখন উচিত এ প্রশ্ন করা যে কেন মানুষকে এসআইআর-এর লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে? সমস্ত কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কেন নাম কেটে দেওয়া হয়েছে? কেন সঠিক প্রসেস মেনে এক বছর ধরে এসআইআর হল না? অন্তত ছ’মাস ধরে হত। তুমি সব পেতে পারো, বাংলা পাবে না। বাংলায় মা দুর্গা, কালী, রাম, হনুমানজী সকলের পুজো হয়। আমাদের মধ্যে হিন্দুত্ব আছে, কিন্তু আমরা কোনওদিনই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করিনি।
“মানুষ জন্মেই ক্রিমিনাল হয় না। আমাদের মতো পলিটিশিয়ানরাই জোর করে বাচ্চাদের হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিয়েছে। কোনও অপরাধী পুলিশের হাতে ধরা পড়লে, আমি কখনওই তাকে ছাড়ানোর জন্য সুপারিশ করি না। অন্য দলের লোকেরা হয়তো করে। অপরাধীরা জানে অন্যায় করলে রাজদা তাদের পাশে দাঁড়াবে না।”
প্রশ্ন: বারাকপুর ও টিটাগড় একসময় অপরাধের জন্য পরিচিত ছিল। বিধায়ক হিসেবে কি সেখানে শান্তি ফেরাতে পেরেছেন?
উত্তর: অবশ্যই এরকম অবস্থা একসময় ছিল। কিন্তু আজকের ডেটা নিলে বুঝবে, অপরাধ একশোটার জায়গায় পাঁচটা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনেকটা স্থিতিশীল। আমাদের কঠোর নীতি— ‘নো ক্রাইম, নো ক্রিমিনাল’। কেউ অন্যায় করলে তাকে পরিষ্কার বলা হয়, “ভাই, তুমি ওই পথ ছেড়ে দাও, ভালো পথে এসো, পাশে আছি।” মানুষ জন্মেই ক্রিমিনাল হয় না। তাকে জোর করে ওই পরিবেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। আমাদের মতো পলিটিশিয়ানরাই জোর করে বাচ্চাদের হাতে বন্দুক ধরিয়ে দিয়েছে। তবে কোনও অপরাধী পুলিশের হাতে ধরা পড়লে, আমি কখনওই তাকে ছাড়ানোর জন্য সুপারিশ করি না। অন্য দলের লোকেরা হয়তো করে। অপরাধীরা জানে অন্যায় করলে রাজদা তাদের পাশে দাঁড়াবে না। তাছাড়া, আমরা অপরাধীদের সংশোধনের সুযোগ দিতে চাই।
প্রশ্ন: এবারের নির্বাচনে কোনও প্রার্থী ঘুঁটে দিচ্ছেন, কেউ দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার মশলা বেটে দিচ্ছেন। আগে নির্বাচনী প্রচার মানে ছিল জোরালো বক্তৃতা। সেই বুদ্ধিমত্ত্বা হারিয়ে যাচ্ছে?
উত্তর: জানি না, যারা করছে তারা কেন করছে। আমাকে ঘুঁটে দিতে হয়নি। আমি মানুষের কাছে সরাসরি গিয়েছি। বক্তব্য রাখার দরকার হলে তাও করেছি। কোনও অন্যায় করলে মানুষকে বলি, “আমাকে বকুন, আমি বকা খেতেও রাজি আছি।” এ ধরনের প্রচার আসলে বিজেপির লোকেরাই করছে কারণ সারা বছর তাদের দেখা যায়নি। তাই ঘুঁটে দিয়ে, রুটি বেলে, কাজ দেখিয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছে।
প্রশ্ন: ২১-এর তুলনায় এবারের লড়াই কি বেশি শক্ত? অর্জুন সিং কি কোনও ফ্যাক্টর হবেন?
উত্তর: বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিং পাশের নোয়াপাড়া কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে উনি ১০০% হারবেন। সাধারণ মানুষ আর ও ধরনের রাজনীতি চায় না। বর্তমানে আমার লড়াইটা কেবল জয়ের জন্য নয়, বরং জয়ের ব্যবধান বা মার্জিন কতটা বাড়ানো যায়— সেটা দেখা। এখানে প্রচুর হিন্দিভাষী মানুষ আছেন। টিটাগড়কে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ বলা হয়। আমার কাছে এটাই বড় চ্যালেঞ্জ- আমি এক ভোটে হলেও জিতব।
প্রশ্ন: শমীক, দিলীপ, শুভেন্দু— কোন বিরোধীকে পছন্দ?
উত্তর: শমীক ভট্টাচার্য খুব ইন্টেলিজেন্ট, ওঁর কথা আমি শুনি। তবে ইদানীং নিজেকে অন্যভাবে প্রমাণ করতে গিয়ে আসল অস্তিত্ব হারাচ্ছেন। দিলীপ ঘোষ টিপিক্যাল বিজেপি পলিটিশিয়ানদের মতোই। উনি আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত। ওঁর কথা ভীষণ রুক্ষ, মাধুর্য কম। শুভেন্দু অধিকারীকে একটা সময় আমার খুব ভালো লাগত, কিন্তু আজকের মানুষটার সঙ্গে তাঁর আকাশ পাতাল তফাৎ। ভীষণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক কথা বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর ফোকাস করেন। বামপন্থীদের মধ্যেও অনেকে রয়েছেন, যাদের বক্তব্য আমি শুনি। সৃজন ভট্টাচার্যের বক্তব্য ভালো লাগে। দীপ্সিতা, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যও। মীনাক্ষীর দু-একটি বিতর্কিত মন্তব্য বাদ দিলে, শুনতে মন্দ লাগে না।
নিবেদিত


