রাসবিহারী বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী, প্রাক্তন রাজ্যসভার সাংসদ। বিজেপির ‘বাঙালি বাবু’ বললেই যাঁদের নাম উঠে আসে, তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিপক্ষ কতটা বলীয়ান? এসআইআর কতখানি গুরুত্বপূর্ণ? রইল সংবাদ প্রতিদিন ডট ইন-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে স্বপন দাশগুপ্ত (Swapan Dasgupta)।
প্রশ্ন: আপনি রাসবিহারীতে থাকেন, সেখানেই ভোটে লড়ছেন। বিভিন্ন ইস্যু রয়েছে এই কেন্দ্রে, মানুষের নাম বাদ গিয়েছে, স্থানীয় কিছু বিষয় রয়েছে। প্রচারে ঘুরে কী বুঝছেন ?
উত্তর: রাস্তাঘাটে ঘুরে একটা জিনিস বুঝলাম, এসআইআর মিডিয়ার তৈরি করা ইস্যু। চার থেকে পাঁচজন খালি বলেছে আমাদের নাম বাদ গিয়েছে। এছাড়া কোনওরকম বিষয় আমি শুনিনি। খালি বলেছে, আমরা যদি কিছু করতে পারি। কিন্তু, কোনও কমপ্লেন নেই মানুষের। দ্বিতীয়ত, রাসবিহারী এমন এক কেন্দ্র যেখানে স্থানীয় বিষয়গুলোর থেকে রাজ্যে যা যা সমস্যা, তারই একটা প্রভাব পড়ে। এই কেন্দ্রেই কিন্তু রাজ্যের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়। তাই মানুষের আশা, চিন্তা-ভাবনায় গোটা রাজ্যের একটা প্রভাব আছে।
আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: আপনি ’২১-এ তারকেশ্বরে রামেন্দু সিংহ রায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ছাব্বিশে আপনার প্রতিপক্ষ দেবাশিস কুমার। একুশের তুলনায় বিপক্ষ অনেকটাই কঠিন হয়ে গেল না?
উত্তর: সব প্রতিপক্ষই কঠিন হয়। আমি মনে করি, সেফ সিট বলে কিছু নেই। আমি দলের নির্দেশে একুশে তারকেশ্বরে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু সেই জায়গাটা আমার কাছে ছিল অজানা। তারপরেও আমি ৭ থেকে ৪২ শতাংশে ভোট তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে রাসবিহারী একদম আলাদা। আমার কাছে এটা হোম গ্রাউন্ড। আমাদের পরিবারের সঙ্গে এই এলাকার সম্পর্ক অনেকদিনের।
“আগে কংগ্রেস, পরে তৃণমূল, এই কেন্দ্রকে নিজেদের গড় বলে মনে করত, এখন সেটা জমিদারিতে পরিণত হয়েছে। আর সেটাকে ছেদ করে দেওয়াটাও আমাদের কর্তব্য। তাই আমি মনে করি, ওরা ভাল ইনিংস খেলেছে, এবার ইটস টাইম টু রিটায়ার।”
প্রশ্ন: একদম। দুজনেই পাশাপাশি থাকেন।
উত্তর: হ্যাঁ। এটা একেবারেই ঘরের মাঠ আমার কাছে। তাই, আমার কাছে এই প্রচার একদম অন্যরকম। এছাড়াও, আগে কংগ্রেস, পরে তৃণমূল, এই কেন্দ্রকে নিজেদের গড় বলে মনে করত, এখন সেটা জমিদারিতে পরিণত হয়েছে। আর সেটাকে ছেদ করে দেওয়াটাও আমাদের কর্তব্য। তাই আমি মনে করি, ওরা ভাল ইনিংস খেলেছে, এবার ইটস টাইম টু রিটায়ার।
প্রশ্ন: আপনি মনে করেন, রাসবিহারীর মানুষ দেবাশিস কুমারকে ভোট দেবে না?
উত্তর: আমি দেবাশিস কুমারকে নিয়ে বলছি না। তৃণমূলকে নিয়ে বলছি। ব্যাক্তিগতভাবে কোনও প্রার্থী নিয়ে বলব না। কেউ তাঁকে ভাল মনে করতে পারে, কেউ খারাপ। ঠিক তেমনভাবেই আমাকেও কেউ পছন্দ করতে পারে, কেউ অপছন্দ।
প্রশ্ন: এই সাক্ষাৎকার যখন আপনি দিচ্ছেন, তখন আপনার বিপক্ষের প্রার্থী দেবাশিস কুমারের বাড়িতে আয়কর হানা চলছে।
উত্তর: তাই বুঝি!
প্রশ্ন: আপনি জানেন না?
উত্তর: আমি কী করে জানব? আমি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে স্নান করে, তোমাকে ইন্টারভিউ দিচ্ছি। খবরের কাগজ পড়ার সময় পাইনি আমি।
প্রশ্ন: আপনি না জানলে বলে দিই, ওঁর বাড়ি, নির্বাচনী কার্যালয়, অফিসে আয়কর হানা হচ্ছে। এবং গত ১৫ দিনে, একাধিকবার দেবাশিস কুমারকে ইডি ডেকেছে। হঠাৎ নির্বাচনের আগেই কেন এই তৎপরতা?
উত্তর: ইডি কেন ডেকেছে, আমি জানি না। তারা যা যা নিয়ে কাজ করে, সেই পৃথিবীটা আমার কাছে একেবারেই অজানা। আমি যে-জগৎ নিয়ে আছি, আদর্শ, রাজনীতি, পলিসি, ইত্যাদি। এদিক-ওদিক থেকে শুনি, লোকজন বলে-টলে। তাই, কেন ইডি দেবাশিস কুমারকে ডেকেছে, এটা আমায় জিজ্ঞেস করা একেবারে অর্থহীন। আমি জানি, আমি জিতলে আমার প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু তৃণমূল একে প্রতিহিংসার রাজনীতি বলছে!
উত্তর: আমি জানি না। সত্যি! দু-একবার দেখা হয়েছে আমাদের প্রচারের মাঝে। সৌজন্য বিনিময় করেছি। পাশেই বাড়ি আমাদের দু’জনের। কাউন্সিলার হিসেবে ভাল কেজ করেছেন এলাকায়। কিন্তু, এটা বিধানসভা নির্বাচন, এখানে গত পনেরো বছরের রিপোর্ট কার্ড শাসকদলকে মানুষের কাছে দিতে হবে। সেই ভিত্তিতে ভোট হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের যে, ভোটের ফ্যাক্টর এখন মাছ খাওয়া, জামাকাপড় পরা, ইত্যাদি। মূল ইস্যু থেকে সরে গিয়ে আমরা ছোটখাটো ইস্যু নিয়ে বেশি মাতামাতি করছি।
প্রশ্ন: ‘মাছ খেতে দেব না’, বিহারের ঘোষণা কি আপনাদের বিব্রত করেছে ?
উত্তর: কে বলেছে, মাছ খেতে দেয় না? এটা ফেক নিউজ। চারিদিকে এখন ফেক নিউজ। বিহারের মানুষ প্রচুর মাছ খায়। নির্দেশিকায় ছিল, খালি লাইসেন্সড দোকান থেকে মাছ পাওয়া যাবে। বিহারের বাবুদের মাছ খেতে না দিলে, ঝেঁটিয়ে বের করে দেবে।
প্রশ্ন: বাংলা বললে বাংলাদেশি তকমা পাওয়া যায়। এই দেশে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়ার জন্য জেলে যেতে হয়েছিল!
উত্তর: দেখো, কোথায় কোন ইডিয়ট কী করেছে, সেটা বিষয় হতে পারে না। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বাঙালি আর বাংলাদেশি আলাদা। একসময় এক ছিল। কিন্তু, আমার প্রচুর বাংলাদেশি বন্ধু আছে। আমার আওয়ামী লিগের অনেক বন্ধু এখন কলকাতায় আছে। কিন্তু ওরা তো ভোটার হতে চায় না। আমরা এপারের লোক যেভাবে কথা বলি, বাংলাদেশের লোক তো সেভাবে কথা বলে না।
প্রশ্ন: কিন্তু মুর্শিদাবাদের লোক তো অনেকটা একভাবেই কথা বলে?
উত্তর: কোথাও একভাবে কথা বলে। কিন্তু কোথাও কোথাও ভিন্নতাও আছে। মেদিনীপুরে মানুষ যেভাবে কথা বলে, কলকাতার মানুষ সেভাবে কথা বলে না। ‘আমার সোনার বাংলা’ রবীন্দ্রসঙ্গীত। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ‘জয় বাংলা’ তো মুজিবের সময় থেকে বাংলাদেশে বলা হয়।
“সংসদে যাওয়ার একটা বড় সুবিধে হল সংসদীয় ভাষাটা শেখা যায়। সভ্য ভাষায় কীভাবে আক্রমণ করতে হয়, সেটা শেখা যায়। বাজপেয়ী, অরুণ জেটলিরা আমার গুরু। তাঁরা আমায় জেন্টলম্যান হতে শিখিয়েছেন। ‘রামগরুড়ের ছানা’র বেশি কিছ বলি না।”
প্রশ্ন: আপনার কোনওদিন মনে হয়নি, বিজেপির দিল্লির নেতাদেরকে আরেকটু বাংলা সম্পর্কে বোঝাই, জানাই?
উত্তর: দেখো, আমরা সবাই রোজ নতুন নতুন জিনিস শিখি। আমিও উত্তরপ্রদেশে গিয়ে কত কিছু নতুন শিখি। বাংলার সাহিত্য, খাওয়া-দাওয়া, মনিষী, এইসব নিয়ে জানতে হবে। আরেকটু সেনসিটিভ হতে হবে। কিন্তু সবাই কি হয়?
প্রশ্ন: আপনি সাংবাদিক ছিলেন, তারপরে রাজনীতিতে এসেছেন। বর্তমান রাজনীতিতে যে বিভাজন, অপশব্দ, ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, যে নিম্নরুচির আক্রমণ হচ্ছে, সেটাকে কীভাবে দেখেন?
উত্তর: আমি ওই ভাষা কোনওদিন ব্যবহার করিনি। দেখো, সংসদে যাওয়ার একটা বড় সুবিধে হল সংসদীয় ভাষাটা শেখা যায়। সভ্য ভাষায় কীভাবে আক্রমণ করতে হয়, সেটা শেখা যায়। বাজপেয়ী, অরুণ জেটলিরা আমার গুরু। তাঁরা আমায় জেন্টলম্যান হতে শিখিয়েছেন। ‘রামগরুড়ের ছানা’র বেশি কিছু বলি না।
প্রশ্ন: বিজেপি বলছে তাঁরা সরকার গড়বে। আপনাকে পাশে নিয়েই অমিত শাহ বলেছেন, ১৭০ আসন পাবে পদ্মশিবির। সাংগঠনিকভাবে বিজেপি শক্তিশালী সরকার গড়ার জন্যে?
উত্তর: সংগঠনে আমাদের দুর্বলতা আছে, সেটা আমি অস্বীকার করব না। এটার কারণ, ভোট পরবর্তী হিংসার কারণে সামনে থেকে বিজেপির হয়ে লড়ার লোক কম। সকলেই বলে, পিছন থেকে আছি। সামনে আসতে চায় না। এই কালচার কিন্তু তৃণমূল আনেনি। বাম আমল থেকেই শুরু হয়েছে। আমাদের জনসমর্থন আছে, কিন্তু সংগঠন দুর্বল।
প্রশ্ন: এসআইআরে প্রায় ৬৩% হিন্দুর নাম বাদ গিয়েছে। বিজেপি বলেছিল, একজন হিন্দুর নামও বাদ যাবে না। একটু তাড়াহুড়ো হয়ে গেল না?
উত্তর: এই তো বলেছিল, সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিতেই এসআইআর করা হয়েছে। হঠাৎ করে এ কী হল?
প্রশ্ন: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে পুশব্যাক করা হয়েছে, তারপর আবার তাঁরা দেশে ফিরে এসেছেন।
উত্তর: ঠিক। এসেছে। এসআইআর আর অনুপ্রবেশ এক নয়। অনেকে থাকেন, বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, কিন্তু তাঁরা ভোটার নন। একদিন না একদিন তো এসআইআর করতেই হত। নাহলে বিকেল চারটে নাগাদ কিছু ভূত আবার ভোট দিতে আসত।
প্রশ্ন: রাজ্যসভা, নাকি মানুষের কাছে গিয়ে গিয়ে ভোট চাওয়া? কোনটায় আপনি বেশি স্বচ্ছন্দ?
উত্তর: দু’টোই পারি। দল যখন যেমন দায়িত্ব দেয়। অলরাউন্ডার হতে পারি। লাস্টম্যান হলেও ক্রিজে ব্যাট করার অভিজ্ঞতা রাখতে হয়। নিজের হোমগ্রাউন্ডে খেলাটাও আলাদা একটা চার্ম।
প্রশ্ন: জিতলে, আপনিও কি সৌরভ গাঙ্গুলির মতো জামা ঘোরাবেন?
উত্তর: সেটার সম্ভাবনা কম। কিন্তু কিছু বিষয় থাকে, বিধায়কের কাছে মানুষ যায়, পরিষেবা পায়, অফিস ইত্যাদি থাকে, সেখান থেকে মানুষ যাতে উপকৃত হয়।
প্রশ্ন: রাসবিহারীর মানুষ বলে, দেবাশিস কুমারকে বাড়ির ইতু পুজোতে ডাকলেও পাওয়া যায়, তিনি আসেন। আর আপনি বলছেন বিধায়ককে পাওয়া যায় না?
উত্তর: ভালো কথা।
প্রশ্ন: আপনার কোনওদিন দরকার পড়েছিল আপনার বিধায়ককে?
উত্তর: আমার বাড়ির সামনে ময়লা ছিল। দুর্গন্ধ হচ্ছিল। তখন আমি বলি। পৌরপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি কাজ করে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: এই গরমে সারাদিন প্রচার, মিটিং মিছিল। কেমনভাবে নিজেকে সুস্থ রাখছেন?
উত্তর: সারাদিন ঘুরতে হচ্ছে। বেশ ভালো লাগছে। বুস্ট আপ হচ্ছি। রাসবিহারীর মানুষের এই ভালোবাসা আমাকে চার্জড আপ করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন: অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনি এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার, আপনার আইটি সেলের প্রধানের কথায়, বাংলাদেশি ভাষায় দিয়েছেন।
উত্তর: যে বলেছে, সে একটা আস্ত গবেট।
প্রশ্ন: আপনি অমিত মালব্যকে গবেট বললেন?
উত্তর: অমিত মালব্যর বাংলা ভাষা নিয়ে বলার কোনও অথরিটি নেই। নিশ্চয়ই এআই বা কোনও ইন্টার্ন এই কাজ করেছে। ওকে মিসলিড করেছে। এই এআই শেষ করে দেবে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
দিল্লিতে ককরোচ পার্টির বিক্ষোভে উপস্থিত সোনম ওয়াংচুক, কী বার্তা ‘র্যাঞ্চো’র?
-
পুরবোর্ড টিকলে পরবর্তী মেয়র কে? রবিতে তৃণমূল ভবনে বৈঠক ডাকলেন মমতা
-
কাজু-আমন্ড অতীত, এই চেনা ফলের বীজই ‘সুপারফুড’!
-
বাবুঘাটে তলিয়ে গেলেন আরজিকর কাণ্ডের প্রতিবাদী, ডাক্তারি পড়ুয়ার মৃত্যু ঘিরে রহস্য
-
ভাঙড় বিস্ফোরণের ‘মূলচক্রী’, শওকতকে ১৪ দিনের এনআইএ হেফাজতে পাঠাল আদালত
নিবেদিত


