‘সব কি পসন্দ’ ছিল নিরমা, একটা ভুলেই ছত্রকায় ১৭ হাজার কোটির ডিটারজেন্ট সাম্রাজ্য!
একসময় ডিটারজেন্ট বাজারের ৬০ শতাংশই ছিল তাদের দখলে।
শুরুটা ১৯৬৯ সালে। কার্সনভাই প্যাটেল ছিলেন একজন রসায়নবিদ। তিনি বাড়িতেই তৈরি করে ফেলেন ডিটারডেন্ট পাউডার। নিজের এক বছরের ছোট্ট মেয়ে নিরুপমার ডাকনাম নিরমার নামেই হলুদ সেই পাউডারের নামকরণ করেন। দাম ছিল সাড়ে তিন টাকা কেজি। সেই সময় বাজার কাঁপানো সার্ফের দাম ছিল তেরো টাকা প্রতি কেজি। অর্থাৎ কেজি পিছু সাড়ে নয় বা এগারো টাকা বেশি!
আরও পড়ুন:
সার্ফ যতই বাজার দখল করে থাকুক, বলা হয় তা নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্রদের নাগালের বাইরে ছিল। তাঁরা যে হলুদ সাবান দিয়ে কাপড় কাচতেন তা ‘মন্দের ভালো’ হলেও ‘জেদি’ দাগ দূর করা তার কম্মো ছিল না। ফলে তাঁরা যে অপেক্ষাকৃত সস্তা নিরমার দিকেই ঝুঁকবেন সেটাই ছিল স্বাভাবিক। আর এটাই ছিল কার্সনভাইয়ের মাস্টারস্ট্রোক। রাতারাতি আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ল নিরমার খ্যাতি।
নিরমার খ্যাতি আরও বাড়ে কার্সনভাই প্যাকেজিং নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করার পর। যেহেতু মেয়ের নামেই ব্যবসার ব্র্যান্ড, তাই প্যাকেটের গায়ে নিজের ছোট্ট মেয়ের ফ্রক পরিহিত ছবিকেই বেছে নেন তিনি। এরপর অল ইন্ডিয়া রেডিওয় বেজে উঠল জিঙ্গল ‘নিরমা নিরমা ওয়াশিং পাউডার নিরমা…’। এই গানের কথাও নিরমার জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পিছনে বড়সড় ভূমিকা নিয়েছিল। ‘থোড়া সা পাউডার অউর ঝাগ ঢের সারা’। অর্থাৎ অল্প পাউডারের অনেক অনেক ফেনার...
১৯৮২ সালে প্রথমবার টিভিতেও দেখা গেল নিরমার বিজ্ঞাপন। জিঙ্গল কিন্তু একই। সঙ্গে পর্দায় ফ্রক পরিহিত বালিকার বাতাসের ভিতরে ঘুরপাকের দৃশ্য। একইভাবে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে গেল এই বিজ্ঞাপনও। ১৯৮৫ সালে প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কেট ছিল নিরমারই মুঠোয়। দেশের এক নম্বর ডিটারজেন্ট তখন কার্সনভাইয়ের তৈরি ওয়াশিং পাউডার। কিন্তু… একটি ভুলেই ছারখার হয়ে গেল নিরমার সেই ডিটারজেন্ট সাম্রাজ্য।
আরও পড়ুন:
আসলে নতুন করে 'লড়াইয়ে' নেমেছিল সার্ফ। তারা পরিকল্পনা করল ‘হুইলে’র। এই ওয়াশিং পাউডারটির দাম নিরমার মতোই। কিন্তু নিরমায় যা ছিল না এতে সেগুলো ছিল। যেমন সুগন্ধ, হাত জ্বালা না করা কিংবা কাচা কাপড় শুকিয়ে যাওয়ার পরের নরম ভাব। ১৯৯০ আসতে না আসতেই নিরমার ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলতে শুরু করে দিল হুইল। দেশের দ্বিতীয় সবচেয়ে বিক্রি হওয়া ওয়াশিং পাউডার হয়ে।
বাজারে এল ‘ঘড়ি’ ডিটারজেন্ট পাউডার। কোনও বড় বড় দাবি নয়, যার সাফ কথা ছিল ‘পহেলে ইস্তেমাল করে ফির বিশওয়াস করে।’ অর্থাৎ নিজেরা ব্যবহার করে দেখে নিন, বিজ্ঞাপনী বুলিতে খামোখা বিশ্বাস করার দরকার নেই। দাম সামান্য বেশি, তবু কানপুরের সংস্থা আরএসপিএলের তৈরি সেই ডিটারজেন্ট বাজারে এসেই ঝড় তুলে দিল। অন্যদিকে দ্য প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের ‘এরিয়েল’ও বাজারে এসে গেল।
অথচ এমন ঝড়ের মধ্যে কার্সন ছিলেন নিস্পৃহ। প্যাকেজিং বা বিজ্ঞাপন বদলে কোনও চমক দেওয়ার তেমন কোনও চেষ্টাই করেননি। ফলে যত সময় গিয়েছে, ততই গুরুত্ব হারিয়েছে ওই ওয়াশিং পাউডার। আজও সে রয়েছে বটে। কিন্তু অতীত দিনের সেই একচ্ছত্রাধিপত্যের লেশমাত্রও নেই। অন্যান্য ক্ষেত্রে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারলেও ওয়াশিং পাউডারের সাম্রাজ্য খোয়াতে হয়েছিল ওই একটি ভুলেই।